রাজধানীর ইসিবি চত্বরে নিউগিনি প্রপার্টিজে রাতের আঁধারে হামলা-ভাঙচুর, লুটপাট ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। শনিবার রাত ১০টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত চলে এ তাণ্ডব। এ সময় জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওসহ পুরো হাউজিং এলাকায় তাণ্ডব চালানো হয়। সন্ত্রাসীরা নগদ টাকা, মোবাইল ফোনসহ গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়। হামলাকারীরা পাঁচটি পিকআপে করে এসে গুলি করতে করতে হাউজিংয়ের ভেতরে প্রবেশ করে। প্রথমে হাউজিংটি তিনদিক থেকে সন্ত্রাসীরা ঘিরে ফেলে। কারও হাতে ছিল পিস্তল, কারও হাতে দেশীয় অস্ত্র। এরপর একে একে ৬ থেকে ৭টি স্থাপনায় ভাঙচুর ও লুটপাট করে তারা। এ ঘটনায় প্রকল্প পরিচালক ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত ১৫০ থেকে ২০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। মামলায় প্রায় ১ কোটি ৪২ লাখ ৮০ হাজার টাকার মালামাল ভাঙচুর এবং নগদ টাকাসহ ১ কোটি ৫০ লাখ ৪৩ হাজার টাকার মূল্যবান সরঞ্জাম ও নির্মাণসামগ্রী লুটের অভিযোগ আনা হয়েছে। এ মামলায় এখন পর্যন্ত প্রধান আসামিসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মিরপুর ১০ নম্বরে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে রাতের আঁধারে গুঁড়িয়ে দেয়ার একদিন পর ইসিবি এলাকার ঘটনায় তোলপাড় চলছে। ঘটনাস্থলটি প্রধানমন্ত্রীর নিজের নির্বাচনী এলাকার মধ্যে পড়েছে।
গতকাল সরজমিন দেখা যায়, নিউগিনি প্রপার্টিজে ৫টি পয়েন্ট রয়েছে। বের হওয়ার জন্য তিনদিকে তিনটি গেট রয়েছে। গেটগুলো ভাঙা। কিছু শ্রমিক এসব ঠিক করছিলেন। প্রধান গেটে ১০ থেকে ১২টি গুলির চিহ্ন রয়েছে। প্রধান গেট পার হয়ে একটু সামনের দিকেই সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও। স্টুডিওটি তছনছ করা হয়েছে। মেঝেতে পড়ে আছে ভাঙা সোফা, কাঁচের টুকরা, বাদ্যযন্ত্র ও বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্র। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট শুরু হয়। হামলাকারীরা ৩ দিক থেকেই ভেতরে প্রবেশ করে। প্রথমে প্রবেশমুখের একটি বাড়ির ফ্ল্যাটে ঢুকে তারা লুটপাট করে। সেখান থেকে তারা মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জিনিস নিয়ে যায়। একপর্যায়ে সন্ত্রাসীরা সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের টাকা ও মোবাইল ফোন লুট করে। এ ছাড়াও, পাশের বিল্ডিংয়ে কর্মরত এক বাবুর্চির পেটে পিস্তল ধরে মোবাইল নিয়ে যায়। ১ম পয়েন্টের সামনের একটি বাসায় ঢুকে মোবাইল ফোন নিয়ে চলে যায়। তারা নিউগিনি প্রপার্টিজের অফিসেও ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। সন্ত্রাসীরা একটি ভল্ট ভেঙে ৭৫ লাখ টাকা নিয়ে যায় বলে দাবি করেন সেখানকার কর্মকর্তারা। এই তাণ্ডব চলে রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ আসে। তখন পুলিশ ও হামলাকারীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
নিউগিনি প্রপার্টিজের কর্মকর্তা মো. পল্লব আলী মানবজমিনকে বলেন, হামলাকারীরা পাঁচটি পিকআপে করে এসেছিল। তাদের হাতে ছিল আগ্নেয়াস্ত্র। তারা গুলি করতে করতে হাউজিংয়ের ভেতরে প্রবেশ করে। প্রবেশমুখের একটি বাড়ির ফ্ল্যাটে ঢুকে তারা লুটপাট করে। সেখান থেকে তারা মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জিনিস নিয়ে যায়। নির্মাণশ্রমিকদের মারধর করে তাদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র নিয়ে যায় হামলাকারীরা। নিউগিনি প্রপার্টিজের অফিসেও হামলা করা হয়। এরপর হামলাকারীরা সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে গিয়ে হামলা-ভাঙচুর-লুটপাট চালায়। প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিক সেলিম মানবজমিনকে বলেন, ‘রাত ১০টার দিকে রুমে ঘুমানোর জন্য যাই। হুট করে বাইরে গুলির শব্দ পাই। তখন রুমে ১০-১২ জন ছিলাম। এক-দু’জন করে বের হয়ে দেখি অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছে। এদিক দিয়ে লোক আসছে, ওদিক দিয়ে লোক আসছে। এসব দেখে রুমে ঢুকি। পরে কয়েকজন রুমে ঢুকে আমার পকেট সার্চ করে। এরপর বলে, ‘যা আছে বের করে দে’। আমি ফোন রেখে ভয়ে চলে যাই। তারা চলে যাওয়ার পর রুমে ঢুকে দেখি আমার হাজিরার টাকাটাও নিয়ে গেছে।’
বাবুর্চি মো. আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, আমি ওই সময় রুম থেকে বের হই। একজন আমার পেটে পিস্তল ধরে বলে, ‘তুই ভিডিও করছিস কেন? তোর মোবাইল বের কর।’ এই বলে তারা আমার মোবাইল নিয়ে যায়। নয়ন নামে আরেক শ্রমিক মানবজমিনকে বলেন, ঘটনার সময় আমরা সিকিউরিটি গার্ডের বসার জায়গায় ছিলাম। এ সময় ওইদিক থেকে ১৫-২০ জনের মতো আসে। সামনে ৪-৫ জনের কাছে পিস্তল ছিল। পরে যারা ছিল তাদের কাছে রামদা আর লাঠি ছিল। তারা আমাদের রুম থেকে ১৬টি ফোন, চার্জার, টাকা পয়সা সব নিয়ে যায়। ওই রাতে বিল পেয়েছিলাম আমরা। বিলের টাকা পয়সা সব নিয়ে গেছে। মনিরুল ইসলাম বলেন, আমার একটা বাটন মোবাইল নিয়ে গেছে। রাতে ১ হাজার ৫০০ টাকা পেয়েছিলাম। সেটাও নিয়ে গেছে। ওমর ফারুক বলেন, আমার একটি মোবাইল ও ২ হাজার ২০০ টাকা নিয়ে গেছে। মোহাম্মদ সেতু ইসলাম বলেন, আমার একটি ফোন ও ১ হাজার ৫০০ টাকা নিয়ে গেছে। সেখানে কর্মরত সিকিউরিটি গার্ড মোহাম্মদ সেলিম মানবজমিনকে বলেন, আমাদের ৫টি পয়েন্টে ৫ জন গার্ড থাকে। রাতেও ছিল। যখন হামলাকারীরা আসে তখন আমাদের সব পয়েন্টের গার্ডদের মারধর করে সরিয়ে দেয়া হয়। এরপর যাকে যেখানে পেরেছে মারধর করেছে। যা পেয়েছে লুটপাট করে নিয়ে গেছে।
১৩ জনের নামে মামলা: এ ঘটনায় প্রকল্পের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া বাদী হয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন। মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন- শাহরিয়ার মাহমুদ (৬০), মো. আবুল কাশেম (৫৬), মো. বাবুল হোসেন (৪৯), মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী (৬৭), মো. শাহিনুজ্জামান (৪৭), মো. মতিউর রহমান (৪৮), মো. মজিবুর রহমান (৪৭), নূরুল ইসলাম (৫১), মিজানুর রহমান (৫৯), এম কে আজাদ (৫৪), মো. মামুন (৩২), মো. আসলাম (২৪), মুন্না (২৯)। এ ছাড়াও অজ্ঞাতনামা ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, পূর্ব শত্রুতার জেরে শাহরিয়ার মাহমুদ নামে এক ব্যক্তির হুকুমে দেড় শতাধিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী শটগান, রিভলবার, চাপাতি ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রকল্পটিতে প্রবেশ করে। এ সময় তারা প্রায় ৫০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে আতঙ্ক তৈরি করে। হামলাকারীরা প্রকল্পের সাইট ইঞ্জিনিয়ার মো. পারভেজ (২৮)কে মাথায় রিভলবার দিয়ে আঘাত ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করে। তাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে সৈয়দ নজরুল ইসলাম (৪৪) নামে এক সিকিউরিটি গার্ডকেও বেধড়ক মারধর করা হয়। আরও উল্লেখ করা হয়, হামলাকারীরা প্রকল্পের প্রধান ফটক ও অফিসকক্ষ ভাঙচুর করে লকার থেকে নগদ ২৫ লাখ টাকা, ২৩ টন রড, বৈদ্যুতিক তার, ওয়াটার পাম্পসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে। একই ভবনে ভাড়া নেয়া সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউন ফিশ’ স্টুডিওতেও ভাঙচুর চালানো হয়। সেখান থেকে ১০০ ইঞ্চি দু’টি টিভি, সার্ভার সেটআপ, হাই-অ্যান্ড এডিটিং কম্পিউটার, পেশাদার ক্যামেরা ও লেন্স, ম্যাকবুক, প্লে-স্টেশনসহ বিপুল পরিমাণ লাইটিং ও সাউন্ড সরঞ্জাম লুট করা হয়। এ প্রসঙ্গে ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন মানবজমিনকে বলেন, মামলা হয়েছে। আমরা তদন্ত করছি।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তারা হলেন- প্রধান আসামি শাহরিয়া মাহমুদ, মো. মামুন, মো. আসলাম ও মুন্না। মামুনের বাড়ি হচ্ছে গফুরগাঁও। সে ভাষানটেক বস্তিতে থাকে। আসলামের বাড়ি হচ্ছে টাঙ্গাইল। সে থাকে ইসিবি’র মজুমদারের মোড় এলাকায় অটো চালায়। মুন্নার বাড়ি বরগুনার পাথরঘাটায়। সে ভাষানটেক বস্তিতে থাকে। পুলিশ জানায়, হামলার খবর পেয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে হামলাকালীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ শটগানের ৫ রাউন্ড গুলি চালায়। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে ধারালো ছোরাসহ মো. মামুন ও মো. আসলাম নামে দু’জনকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে। পরে তাদের তথ্যের ভিত্তিতে সহযোগী মুন্না (২৯) নামে আরেকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ পাঁচটি পিস্তলের গুলির খোসাও উদ্ধার করেছে। গতকাল অভিযান চালিয়ে প্রধান আসামি শাহরিয়ার মাহমুদকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এর আগে শনিবার রাতে সালমান মুক্তাদির নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এই ভাঙচুরের ঘটনা নিয়ে ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওতে স্টুডিও দেখিয়ে তিনি বলেন, একটু আগে এখানে অ্যাটাক হয়েছিল। এই পুরো অ্যাটাকে আমাদের স্টুডিও ডেস্ট্রয়েড হয়ে গেছে। স্টুডিওতে ক্লায়েন্টদের অনেক ফুটেজ ও শুটিংয়ের উপকরণ ছিল। সেগুলো হারিয়ে যাওয়ায় আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি কাজের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। চলমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এমন একটা দেশ, যে দেশে যদি আপনি কিছু করতে চান কিন্তু আপনি তোষামোদি না করেন, আপনার কোনো ব্যাকআপ না থাকে, আপনি কোনো পার্টিকে ফলো না করেন, আপনি যদি সিকিউরিটি টাকা-পয়সা না থাকে দিস ইজ হোয়াট হ্যাপেন্স টু ইউ, সো। তিনি আরও বলেন, পায়ের নিচের মাটি শক্ত না থাকলে বাংলাদেশে কিছু করা উচিত না, এটাকে আমি কিন্তু খুব ডিসকারেজ করি। পায়ের নিচে মাটি শক্ত আছে বলে আমি হেসে-খেলে এই ভিডিও করে আজকে আমি বিদায় নিতে পারবো। হামলার বিষয়ে সালমান বলেন, বিএনপি’র লোকজন যারা এ হামলা করছে, এটা তোমাদের চাঁদাবাজি আমার স্বপ্ন নিয়ে যেতে পারবে না। তোমরা স্বপ্ন দেখতে পারো না। তোমরা যত চুরি, চাঁদাবাজি করো এর থেকে বড় আর কিছু করতে পারবে না। দিস ইজ ইওর লেভেল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আপনি একদম টেনশন করবেন না। আপনার জন্য ভিডিওটা না, বাংলাদেশি মানুষের জন্য ভিডিও বাংলাদেশ।
এ দাবি প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিএনপি চাঁদাবাজ দল, এই ঢালাও অভিযোগের কোনো মানে নেই। ডিসপিউটেড ল্যান্ড নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বা দখল-বেদখলের ঘটনা হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ রুহুল কবীর খান মানবজমিনকে বলেন, এটি মূলত জমি দখল নিয়ে দু’পক্ষের দ্বন্দ্ব। একপক্ষ শনিবার রাতে রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে সন্ত্রাসী ভাড়া করে এনে নিউগিনি প্রপার্টিজে হামলা চালায়। এ ঘটনায় ১৩ জনের নামে মামলা হয়েছে। অজ্ঞাত ২০০ থেকে ২৫০ জন আসামি রয়েছেন। আমরা ইতিমধ্যে প্রধান আসামিসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছি। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তার করতে কাজ করছে পুলিশ। এ ছাড়াও অজ্ঞাত আসামিদের আইডেন্টিফাই করা হচ্ছে। আশা করি, সকল অপরাধীকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।
