শেখ হাসিনা কি দেশে ফিরবেন? নাকি ভারতেই থেকে যাবেন? প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে। কিন্তু বাস্তবে এটি এখন ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা।
দুই বছরের বেশি সময় ধরে ভারতে অবস্থান করছেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ তার প্রত্যর্পণ চেয়েছে। আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের কাছেও যোগাযোগ করা হয়েছে। আদালতের রায় হয়েছে। ঢাকার পক্ষ থেকে কূটনৈতিক চাপও অব্যাহত আছে। অথচ দিল্লির উত্তর এখনো সেই কূটনীতিকদের চেনা ভাষায় বিষয়টি ‘প্রচলিত প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনা করা হচ্ছে’। অর্থাৎ দরজা খোলাও হয়নি, বন্ধও হয়নি। এই অবস্থাটিই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি করছে।
কারণ শেখ হাসিনার বিষয়টি এখন আর কেবল বিচারিক বিষয় নয়। এটি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষমতার সমীকরণ। এটি দিল্লির পুরনো মিত্রকে নিয়ে নতুন ঢাকার অবস্থান। এটি ভারতের আঞ্চলিক নিরাপত্তা-চিন্তা বনাম বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বিচারিক দাবি। এবং সবচেয়ে বড় কথা, এটি নির্ধারণ করতে পারে, দুই দেশের সম্পর্ক ব্যক্তি-কেন্দ্রিক থাকবে, নাকি রাষ্ট্র-কেন্দ্রিক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করবে। দিল্লির জন্য হিসাবটা সহজ নয়।
শেখ হাসিনা ভারতের কাছে শুধুই একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন। দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক সম্পর্ক, নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে তার সরকারের সঙ্গে ভারতের যে সমীকরণ তৈরি হয়েছিল, সেটি দিল্লি নিশ্চয়ই ভুলে যায়নি। ফলে তাকে প্রত্যর্পণ করা মানে শুধু একজন ব্যক্তিকে একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়া নয়; এর রাজনৈতিক বার্তাও অনেক বড়। কিন্তু এখানেই ভারতের সামনে আরেকটি বাস্তবতা, বাংলাদেশ বদলে গেছে।
নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ঢাকা এখন পুরনো সম্পর্কের শর্তে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক চালাতে আগ্রহী নয়। বরং সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতায় দেখা যাচ্ছে, দুই দেশই সম্পর্কের নতুন ভিত্তি খুঁজছে। ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর ধারাবাহিক বৈঠক, ঢাকার বার্তা নিয়ে দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আলোচনা, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ, সব মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে, ভারতও নতুন বাস্তবতাকে উপেক্ষা করছে না।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই নতুন সম্পর্কের দরজায় শেখ হাসিনার প্রশ্নটি কতদিন দাঁড়িয়ে থাকবে? বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আবেগের হলেও রাষ্ট্রের জন্য আবেগ দিয়ে কূটনীতি চালানো যায় না। ঢাকার এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবিকে রাজনৈতিক স্লোগান থেকে একটি শক্তিশালী আইনি ও কূটনৈতিক অবস্থানে পরিণত করা।
শুধু ‘ফেরত চাই’ বললেই হবে না। দিল্লি জানতে চাইবে অভিযোগ কী, বিচারিক প্রক্রিয়া কতটা বিশ্বাসযোগ্য, আসামির অধিকার কীভাবে নিশ্চিত হবে, নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, রায়ের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার কী থাকবে এবং প্রত্যর্পণের পর তার সঙ্গে রাষ্ট্রের আচরণ কী হবে। এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর যত শক্তিশালী হবে, বাংলাদেশের অবস্থান তত শক্তিশালী হবে।
এখানে সরকারের সাম্প্রতিক বক্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ। বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে নিরাপত্তা দেওয়া হবে এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা হবে। রাজনৈতিকভাবে এটি একটি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ফিরে আসুন, আদালতে দাঁড়ান, বিচার মোকাবিলা করুন। কিন্তু এই বক্তব্যকে বাস্তব পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হতে হবে।
কারণ নিরাপত্তা শুধু ঘোষণা দিয়ে নিশ্চিত হয় না। বিচারিক অধিকার শুধু সংবাদ সম্মেলনে বললেই প্রতিষ্ঠিত হয় না। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করবে বাস্তবে এসব কতটা নিশ্চিত করা যায় তার ওপর।
আর এখানেই সরকারের সামনে বড় দায়িত্ব। শেখ হাসিনার বিচার যদি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা, স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের পরীক্ষা হয়, তাহলে সেই পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ বিষয়টি শুধু শেখ হাসিনাকে ফেরানোর নয়। বিষয়টি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতারও।
আরেকটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না ইন্টারপোলের নোটিশ কোনো জাদুর কাঠি নয়। কোনো আন্তর্জাতিক পুলিশি যোগাযোগ নিজে থেকেই একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রকে কাউকে হস্তান্তরে বাধ্য করে না। একইভাবে কূটনৈতিক চিঠির সংখ্যা বাড়লেই প্রত্যর্পণ নিশ্চিত হয় না।
তাই এখন ঢাকার সামনে দুটি পথ। এক. জনমতের আবেগকে রাজনৈতিক চাপ হিসেবে ব্যবহার করা। দুই. অথবা নীরবে, ধারাবাহিকভাবে আইনি, কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সমর্থনের ভিত্তি শক্ত করা। দ্বিতীয় পথটিই বেশি কার্যকর।
কারণ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে যদি শুধু শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের প্রশ্নে আটকে দেওয়া হয়, তাহলে ক্ষতি দুই দেশেরই। পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ, নিরাপত্তা, অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রয়েছে। একটি ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ বলেই অন্য সব রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে তার কাছে জিম্মি করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যর্পণের দাবি নরম করতে হবে।বরং উল্টোটা। বাংলাদেশকে এমনভাবে দাবি তুলতে হবে, যাতে দিল্লির পক্ষে সেটিকে কেবল রাজনৈতিক আবেগ বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ না থাকে।
আর ভারতের কাছেও প্রশ্নটি এড়ানোর সুযোগ ক্রমেই কমছে। দিল্লি যদি সত্যিই নতুন বাংলাদেশের সঙ্গে ‘গঠনমূলক ও জনগণকেন্দ্রিক’ সম্পর্ক চায়, তাহলে তাকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো ব্যক্তির সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের বিকল্প হতে পারে না।
এখানেই ভারতের নীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ভারত কি পুরনো রাজনৈতিক সম্পর্কের দায়কে অগ্রাধিকার দেবে, নাকি নতুন বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় সম্পর্ককে? দিল্লি যদি শেখ হাসিনাকে দীর্ঘদিন ভারতে রাখে, সেটিও একটি রাজনৈতিক বার্তা হবে। আর যদি তাকে বাংলাদেশে ফেরত দেয়, সেটিও হবে বড় রাজনৈতিক বার্তা।
অর্থাৎ সিদ্ধান্ত যেদিকেই যাক, তার ভূ-রাজনৈতিক মূল্য আছে। এই কারণেই এখন ‘হাসিনা কবে ফিরবেন’ প্রশ্নের চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, দিল্লি বাংলাদেশের সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক চায়?একটি সম্পর্ক, যেখানে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে পুরনো ঘনিষ্ঠতা ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ওপর ছায়া ফেলবে?
নাকি একটি সম্পর্ক, যেখানে সরকার বদলালেও রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক অটুট থাকবে? বাংলাদেশের দিক থেকেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য।
ঢাকা কি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে কেবল অতীতের হিসাব-নিকাশে দেখবে, নাকি নিজের স্বার্থকে সামনে রেখে নতুন ভারসাম্য তৈরি করবে?
তারেক রহমানকে দিল্লির আমন্ত্রণ, ভারতের হাইকমিশনারের ধারাবাহিক বৈঠক এবং দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনার মধ্য দিয়ে একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশকে আবেগ নয়, কৌশল দিয়ে এগোতে হবে। কারণ কূটনীতিতে সব দাবি একসঙ্গে আদায় হয় না। আবার সব দাবি ছেড়েও দিতে হয় না।
একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার সামরিক বা অর্থনৈতিক ক্ষমতায় নয়। তার শক্তি তার অবস্থানের ধারাবাহিকতায়, আইনি ভিত্তিতে এবং আলোচনার টেবিলে নিজের স্বার্থ রক্ষার সক্ষমতায়।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নেও বাংলাদেশের সেটিই প্রমাণ করার সময়। অন্যদিকে, ভারতের জন্যও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় যত এগোবে, বিষয়টি তত বেশি রাজনৈতিক হয়ে উঠবে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে একজন সাবেক সরকারপ্রধানকে আশ্রয় দেওয়া এবং একই সময়ে নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা এই দুই বাস্তবতাকে অনন্তকাল পাশাপাশি রাখা কঠিন।
ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চাইলে দিল্লিকে একসময় কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। সেই সিদ্ধান্ত আজ না হোক, কাল আসবে। প্রশ্ন শুধু কোন শর্তে? শেখ হাসিনা কি রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের পথ খুঁজবেন? নাকি বাংলাদেশের আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে প্রত্যর্পণের পথেই ফিরবেন? নাকি আরও দীর্ঘ সময় ভারতের মাটিতে থেকে এই প্রশ্নটিকে ঝুলিয়ে রাখবেন?
এ মুহূর্তে নিশ্চিত উত্তর নেই। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ এখন আর শুধু শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ নয়। এটি বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার পরীক্ষা। এটি ভারতের প্রতিবেশী নীতির পরীক্ষা। এটি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের পুনর্গঠনের পরীক্ষা। এবং শেষ পর্যন্ত এটি একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তরও দেবে, দুই দেশের সম্পর্ক কি কোনো একজন রাজনৈতিক ব্যক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে, নাকি রাষ্ট্রের স্বার্থ ও জনগণের সম্পর্কই হবে সেই সম্পর্কের নতুন ভিত্তি?
দিল্লির সামনে এখন সেই প্রশ্নই সবচেয়ে বড়। আর ঢাকার সামনে চ্যালেঞ্জ আরও স্পষ্ট, শেখ হাসিনাকে ফেরানোর দাবি যেন শুধু রাজনৈতিক বক্তৃতায় না থাকে; সেটিকে এমন একটি আইনি ও কূটনৈতিক অবস্থানে নিতে হবে, যেখান থেকে দিল্লির পক্ষে অনির্দিষ্টকাল ‘বিষয়টি পর্যালোচনায় আছে’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
কারণ প্রত্যর্পণ শুধু চিঠিতে হয় না। প্রত্যর্পণ আদায় করতে হয় রাষ্ট্রীয় কৌশলে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]
