হাসিনাকে ঘিরে দিল্লির দ্বিধা: ব্যক্তিনির্ভর কূটনীতি থেকে বেরোতে পারবে কি ভারত?

হাসিনাকে ঘিরে দিল্লির দ্বিধা: ব্যক্তিনির্ভর কূটনীতি থেকে বেরোতে পারবে কি ভারত?

ফন্ট সাইজ:

কূটনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রু নেই, স্থায়ী থাকে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ। বহুল ব্যবহৃত এই কথাটি ভারত ও বাংলাদেশের বর্তমান সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। একসময় শেখ হাসিনার সরকারকে নয়াদিল্লি দক্ষিণ এশিয়ায় তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করত। নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ, বাণিজ্য এবং ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ প্রতিষ্ঠায় তার সরকারের ভূমিকা দুই দেশের সম্পর্ককে নজিরবিহীন ঘনিষ্ঠতায় নিয়ে গিয়েছিল। অথচ সেই শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানই এখন ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যকার সম্পর্ক পুনর্গঠনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা হারিয়ে ভারতে চলে যাওয়ার দুই বছর পর শেখ হাসিনা নয়াদিল্লি থেকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছা জানিয়েছেন। বাংলাদেশের সরকার এতে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। অন্যদিকে ভারত বলেছে, ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন কিংবা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে দেশটির সরকারের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। ভারত একই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ আইনি প্রক্রিয়ার আলোকে পর্যালোচনার কথা জানিয়েছে। ঘটনাটি দেখিয়ে দিয়েছে, একজন সাবেক সরকারপ্রধানকে মানবিক ও নিরাপত্তাজনিত কারণে আশ্রয় দেওয়া এবং তাকে রাজনৈতিক তৎপরতার সুযোগ দেওয়ার মধ্যে কূটনৈতিকভাবে কত সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, সেটি এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। কিন্তু রাজনীতিতে কোনো ঘোষণার গুরুত্ব কেবল তার বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করে না। কখনো কখনো একটি সম্ভাবনাই রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে পুনর্বিন্যাস করতে পারে। ডিসেম্বরের সময়সীমা আওয়ামী লীগের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নেতা ও সমর্থকদের সামনে নতুন একটি মনস্তাত্ত্বিক কেন্দ্র তৈরি করেছে। একই সঙ্গে তার বিরোধীদের জন্যও এটি একটি অভিন্ন প্রতিপক্ষকে সামনে নিয়ে এসেছে।

এখানেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বড় সংকটটি দৃশ্যমান হয়। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শিকড় দেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে এখনো রয়েছে। কিন্তু দলটির রাজনৈতিক পরিচয় এত দীর্ঘ সময় ধরে শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে যে, তাকে বাদ দিয়ে দলটির ভবিষ্যৎ কল্পনা করা কঠিন। আবার তাকে সামনে রেখে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের চেষ্টা করাও দলটির জন্য সমান বিপজ্জনক। কারণ ২০২৪ সালের আন্দোলন দমন, প্রাণহানি, কর্তৃত্ববাদ, নির্বাচনব্যবস্থা দুর্বল করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অভিযোগ থেকে দলটি এখনো নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি।

আওয়ামী লীগের সামনে তাই শুধু রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার প্রশ্ন নেই; বিশ্বাসযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হওয়ার প্রশ্নও আছে। দলটি যদি মনে করে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনই তার পুনরুজ্জীবনের একমাত্র পথ, তাহলে নতুন প্রজন্মের ক্ষোভ এবং ২০২৪ সালের অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করা হবে। আবার বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক অস্তিত্ব সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হলেও তা দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা আনবে না। রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হওয়া উচিত জনগণের রায়, আইনের শাসন এবং জবাবদিহির মাধ্যমে; প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা অথবা প্রতিশোধের রাজনীতির মাধ্যমে নয়।

বর্তমান বিএনপি সরকারের জন্য শেখ হাসিনার ফেরার সম্ভাবনা একই সঙ্গে আইনি, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত পরীক্ষা। তিনি দেশে ফিরলে আদালতের রায় এবং সরকারের ঘোষিত অবস্থান অনুযায়ী তাকে গ্রেপ্তার করার চাপ থাকবে। কিন্তু সেই গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা সংগঠিত হলে বিক্ষোভ, পাল্টা বিক্ষোভ এবং সহিংসতার আশঙ্কাও সৃষ্টি হতে পারে। সরকার যদি আইন প্রয়োগে দ্বিধা দেখায়, তাহলে তার কর্তৃত্ব ও বিচারিক অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আবার বিচারিক প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে দেখা হলে দেশের বিভাজন আরও গভীর হবে।

এই জটিলতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মাত্রাটি ভারতের সামনে। নয়াদিল্লি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে একটি নির্দিষ্ট দল ও নেতৃত্বের সঙ্গে প্রায় একাকার করে ফেলেছিল। শেখ হাসিনার আমলে ভারত অনেক গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা পেয়েছে। বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ, সীমান্ত নিরাপত্তা, ট্রানজিট, বিদ্যুৎ বাণিজ্য এবং উত্তর পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল। ফলে শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা কেবল আবেগ বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর দাঁড়ানো ছিল না; এর পেছনে শক্তিশালী কৌশলগত হিসাব ছিল।

কিন্তু একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আর একটি সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক এক বিষয় নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন মেনে নিয়ে নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে হলে ভারতকে দৃশ্যমানভাবেই এই পার্থক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া ভারতের নিজস্ব সিদ্ধান্ত হতে পারে, কিন্তু ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করার মতো বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পেলে ঢাকায় সন্দেহ সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। তখন মানবিক আশ্রয় এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়।

নয়াদিল্লি হয়তো মনে করতে পারে, শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা ভবিষ্যতের জন্য একটি কৌশলগত বিকল্প। কিন্তু এই হিসাবের বিপরীত দিকও রয়েছে। তাকে রাজনৈতিক সম্পদ হিসেবে ধরে রাখার চেষ্টা করলে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ভারতবিরোধী মনোভাব আরও শক্তিশালী হতে পারে। ভারতের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ তখন রক্ষিত হওয়ার পরিবর্তে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ প্রতিবেশী দেশের জনগণের একটি বড় অংশ যদি মনে করে নয়াদিল্লি তাদের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেনি, তাহলে যেকোনো দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগই সন্দেহের মুখে পড়বে।

ভারতের নতুন হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। এই বক্তব্যে বাস্তববাদী কূটনীতির ইঙ্গিত রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান, সীমান্ত, নদী, বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের কারণে বাংলাদেশ ও ভারত পরস্পরকে এড়িয়ে চলতে পারে না। তাই সম্পর্ককে শুধু শেখ হাসিনার আশ্রয় অথবা প্রত্যর্পণের প্রশ্নে আটকে রাখা কোনো পক্ষের জন্যই লাভজনক নয়। ⁠

দুই দেশের সামনে আরও বড় ও বাস্তব সমস্যা অপেক্ষা করছে। গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ নবায়ন, তিস্তার পানি বণ্টন, সীমান্তে প্রাণহানি, বাণিজ্যের ভারসাম্যহীনতা, অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য এবং আন্তদেশীয় যোগাযোগের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে ভারত, চীন ও অন্যান্য শক্তির প্রতিযোগিতা বাড়ছে। বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত যোগাযোগ সম্প্রসারণ করলে ভারত স্বাভাবিকভাবেই তা পর্যবেক্ষণ করবে। কিন্তু বাংলাদেশকে নিজের প্রভাববলয়ের অংশ হিসেবে দেখার পুরোনো মানসিকতা নিয়ে এই প্রতিযোগিতা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

ঢাকারও দায়িত্ব রয়েছে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। বিচারকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের ভাষায় উপস্থাপন করা হলে ভারতের সঙ্গে প্রত্যর্পণ আলোচনা আরও কঠিন হবে। বাংলাদেশকে স্পষ্ট করতে হবে, তার দাবি কোনো ব্যক্তির প্রতি প্রতিহিংসা নয়; বরং গুরুতর অভিযোগের বিচার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। একই সঙ্গে ভারতবিরোধিতাকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার সহজ উপায় হিসেবে ব্যবহার করা থেকে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে বিরত থাকতে হবে।

বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক ভারতের জন্য কোনো কূটনৈতিক অনুগ্রহ নয়; এটি ভারতের নিজস্ব নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রয়োজন। একইভাবে ভারতের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য আত্মসমর্পণ নয়; বরং ভূগোল ও অর্থনীতির বাস্তবতা। সমতার ভিত্তিতে কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হলে দুই পক্ষকেই পারস্পরিক সংবেদনশীলতা স্বীকার করতে হবে। ভারতকে বুঝতে হবে, বাংলাদেশের জনগণ তাদের সার্বভৌম রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান দেখতে চায়। বাংলাদেশকেও বুঝতে হবে, ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং আঞ্চলিক স্বার্থকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করা সম্ভব নয়।

শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরবেন কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যৎ দেবে। কিন্তু তার ঘোষণার ফলে একটি বিষয় ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়েছে: ব্যক্তি ও দলের প্রতি আনুগত্যকে রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের বিকল্প বানালে কূটনীতি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ভারত যদি বাংলাদেশের সঙ্গে টেকসই অংশীদারত্ব চায়, তাহলে তাকে আওয়ামী লীগ অথবা শেখ হাসিনার বাইরে বাংলাদেশের রাষ্ট্র, জনগণ এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে হবে।

নয়াদিল্লির প্রকৃত পরীক্ষা তাই শেখ হাসিনাকে কতটা নিরাপদে রাখতে পারে, সেটি নয়। প্রকৃত পরীক্ষা হলো, তাকে আশ্রয় দিয়েও ভারত কীভাবে প্রমাণ করবে যে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার একমাত্র বাংলাদেশের জনগণের। আর ঢাকার পরীক্ষা হলো, শেখ হাসিনার বিচার ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রশ্ন মোকাবিলা করেও কীভাবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে প্রতিশোধ, সন্দেহ ও আবেগের বন্দিত্ব থেকে মুক্ত রাখা যায়। দুই রাজধানী এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলেই ব্যক্তি নির্ভর সম্পর্কের জায়গায় রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, পারস্পরিক মর্যাদা ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
লেখক: সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ইমেইল: [email protected]

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন