গাজার তাঁবুগুলোতে হাজারো বিধবা নারী

একাকী জীবনের নির্মম লড়াই

গাজার তাঁবুগুলোতে হাজারো বিধবা নারী

ফন্ট সাইজ:

উত্তর গাজার তীব্র তাপদাহের মধ্যে একটি অস্থায়ী জীর্ণ তাঁবুর ভেতরে বসে আছেন মোনা আল-মাসরি। প্রতিটি নতুন দিনে বেঁচে থাকার পরিকল্পনা করার চেষ্টা করছেন তিনি। মোনা চার সন্তানের জননী, যাদের বয়স দুই থেকে নয় বছরের মধ্যে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরাইলি সামরিক হামলায় তার স্বামী মোহাম্মদ নিহত হন। কাপড়ের তৈরি একটি পাতলা দেয়ালের ভেতর পুরো পরিবারের জীবনের তীব্র অনিশ্চয়তা ও বোঝা এখন তার একার নাজুক কাঁধে। মোনা জানান, গাজার বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু মানবেতর জীবনযাপনই নয়, সবচেয়ে বড় মানসিক ও শারীরিক কষ্টের বিষয় হলো প্রতিদিনের বেঁচে থাকার প্রতিটি ক্ষুদ্র লড়াইয়ে তাকে সম্পূর্ণ একা মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সন্তানকে একবেলা খাবার দেয়া, পানের উপযুক্ত একটু পানির ব্যবস্থা করা এবং যেকোনো মুহূর্তে ওপর থেকে নেমে আসা বোমা হামলার আতঙ্ক থেকে ছোট ছোট সন্তানদের আগলে রাখার এই দীর্ঘ যুদ্ধ তিনি একা লড়ে যাচ্ছেন। আকুল কণ্ঠে মোনা বলেন, এই যুদ্ধ কেবল আমাদের মাথা গোঁজার ঘরবাড়ি কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে সমস্ত সুরক্ষা, সম্মান ও স্থিতিশীলতা। এখানে জীবন বলতে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। প্রতিদিন সকালে উঠে একটাই চিন্তা থাকে, কীভাবে এই তীব্র কষ্ট ও ক্লান্তি এড়িয়ে সন্তানদের নিয়ে আরেকটা দিন বেঁচে থাকা সম্ভব হবে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।

পরিসংখ্যানের চেয়েও ভয়াবহ বাস্তবচিত্র

গাজায় মোনার মতো এমন হাজার হাজার অসহায় নারী রয়েছেন, যাদের মাথার ওপর থেকে উপার্জনের একমাত্র অভিভাবক ও জীবনের সঙ্গী হারিয়ে গেছেন। গাজার সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, পুরো গাজা ভূখণ্ডে বর্তমানে মোট বিধবা নারীর সংখ্যা বেড়ে ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কেবল চলমান যুদ্ধে ইসরাইলি আগ্রাসনের কারণে ২৮,২২৪ জন নারী তাদের স্বামীকে হারিয়ে নতুন করে বিধবা হয়েছেন। এর বাইরে আরও ২২,৫০০ জন নারী যুদ্ধের আগেই নিবন্ধিত বিধবা হিসেবে বসবাস করছিলেন। তবে গাজার সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আজিজা আল-কাহলৌত জানান, অবরুদ্ধ পরিবেশ, তীব্র যুদ্ধক্ষেত্র ও যোগাযোগ ব্যবস্থার মারাত্মক বিপর্যয়ের কারণে এখনও বহু বিধবা নারীর তথ্য নথিবদ্ধ করা সম্ভব হয়নি। ফলে বাস্তবে এই সংখ্যাটি আরও অনেক বেশি বলে তারা ধারণা করছেন। মুখপাত্র আরও বলেন, উপার্জনের একমাত্র মানুষকে হারিয়ে এই নারীরা এক অবর্ণনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে মানবিক জীবনযাপনের ন্যূনতম সুযোগটুকুও তাদের নেই। এদের দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও অভাব থেকে মুক্ত করতে হলে কেবল সাময়িক খাদ্য সাহায্য দিয়ে হবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে।

মানসিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের মুখে নারী ও শিশুরা

বাস্তুচ্যুত এসব নারীদের জীবনযুদ্ধের গল্প কেবল খাদ্য বা আশ্রয় সংকটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর পেছনে রয়েছে এক গভীর মানবিক ও মানসিক ট্রমা। গাজার বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী আসিল আবু শাওয়িশ বিষয়টি নিয়ে বলেন, যুদ্ধের মাঝে হঠাৎ করে স্বামী হারানো এক চরম মানসিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের জন্ম দেয়। এসব নারীকে একদিকে যেমন নিজের জীবনসঙ্গীকে হারানোর তীব্র কষ্ট চেপে রাখতে হচ্ছে, অন্যদিকে অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতে পরিবারের একমাত্র প্রধান হিসেবে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেয়া এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কঠিন দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। গাজার বিধবা নারীদের এমন এক পরিবেশে বাস করতে হচ্ছে যেখানে প্রতিনিয়ত মৃত্যু ও আতঙ্কের ছায়া রয়েছে। অনেক নারী তাদের ভেতরের মানসিক কান্না ও ভেঙে পড়ার অনুভূতি সন্তানদের সামনে প্রকাশ করতে পারেন না, যাতে ছোট শিশুরা পুরোপুরি ভেঙে না পড়ে। কিন্তু এই দীর্ঘমেয়াদী মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা ও শোকাচ্ছন্নতা তাদের মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

একই সাথে যেসব শিশু তাদের পিতাকে হারিয়েছে, তাদের মানসিক অবস্থা আরও সংকটজনক। বাবার অনুপস্থিতি এবং তার সাথে ক্রমাগত বাস্তুচ্যুতি ও মানবেতর পরিবেশ শিশুদের মনস্তত্ত্বে গভীর প্রভাব ফেলছে। অনেক শিশুর মধ্যে প্রতিনিয়ত আতঙ্ক, রাতে ঘুম না হওয়া, অস্বাভাবিক আচরণ এবং মানসিক ট্রমার স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। মনোবিজ্ঞানীরা জোর দিয়ে বলছেন, গাজার এই অসহায় নারীদের টিকিয়ে রাখতে হলে জরুরি খাদ্য ও আর্থিক অনুদানের পাশাপাশি নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য সেবা, চিকিৎসা, সন্তানদের শিক্ষা ব্যবস্থার পুনর্বাসন এবং আইনগত সহায়তা দেয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এটি এখন কেবল একটি অঞ্চলের সমস্যা নয়, বরং মানবজাতির জন্য এক বিরাট দায়িত্ব।