ফুটবলের ‘চিরন্তন নিয়ম’ পাল্টে জার্মান মিথের অপমৃত্যু

ফুটবলের ‘চিরন্তন নিয়ম’ পাল্টে জার্মান মিথের অপমৃত্যু

ফন্ট সাইজ:

গ্যারি লিনেকারের সেই বিখ্যাত উক্তিটা মনে আছে? এই ইংলিশ কিংবদন্তি ফুটবলার ও বিশ্লেষক একদা বলেছিলেন, ‘ফুটবল একটি সহজ খেলা; যেখানে ২২ জন মানুষ ৯০ মিনিট ধরে একটা বলের পেছনে ছোটে, আর দিনশেষে জার্মানরাই জেতে।’ বিশ্বকাপে পেনাল্টি শুটআউটের ক্ষেত্রে এই উক্তিটি স্রেফ কথার কথা ছিল না, ছিল এক অমোঘ সত্য। এর আগে চারবার টাইব্রেকারের ভাগ্য পরীক্ষায় নেমে প্রতিবারই শেষ হাসি হেসেছে ডি মানশাফটরা। ১৮টি শটের মধ্যে মিস হয়েছিল মাত্র একটি। পেনাল্টিকে লটারি নয়, নিখুঁত বিজ্ঞান বানিয়ে স্নায়ুচাপকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়েছিল তারা। কিন্তু বস্টনের চেনা আঙিনায়, ম্যাসাচুসেটসের এক পড়ন্ত বিকালের সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গেই যেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অলিখিত নিয়মটি উল্টে গেল।

পেনাল্টি শুটআউটে প্যারাগুয়ের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলো চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি। নির্ধারিত সময়ের পর অতিরিক্ত ৩০ মিনিটের খেলাও ড্র হয় ১-১ গোলে। পরে টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে ইউরোপিয়ানদের ছিটকে দিয়ে উল্লাসে মাতে লাতিন আমেরিকানরা। ফুটবল ইতিহাসের রিখটার স্কেলে এই কম্পন এতটাই তীব্র যে, তা হয়তো মেপে ওঠার সাধ্য কোনো যন্ত্রের নেই। তাই জার্মানির ‘কিং অব দ্য পেনাল্টিস’ উপাধিটা আজ থেকে অতীত।

একটানা ১৫টি পেনাল্টি সফলভাবে জালে জড়ানো জার্মানি এদিন স্পট কিক থেকে একবার নয়, দু’বার নয়, ব্যর্থ হলো তিন-তিনবার! কাই হাভার্টজ, নিক ভোল্টমেড আর জোনাথন টা- তিনজনই চরম নাটকীয়তার রাতে নিজেদের স্নায়ু হারিয়ে ফেললেন। বিপরীতে, নিজেদের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম মুহূর্তটি উদ্‌যাপনে মাতলো ২০১০ সালের পর প্রথম বিশ্বকাপে আসা প্যারাগুয়ে।

ম্যাচের প্রথমার্ধে ৮০ শতাংশ বলের দখল রেখেও কোনো ফায়দা তুলতে পারেনি হুলিয়ান নাগেলসম্যানের শিষ্যরা। উল্টো ৪২ মিনিটে প্রথম ভালো সুযোগেই, কাউন্টার অ্যাটাক থেকে হুলিও এনসিসোর দারুণ হেডারে লিড নেয় প্যারাগুয়ে। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে ফ্লোরিয়ান ভির্টজের ক্রস থেকে কাই হাভার্টজের ফ্লিক জার্মানিকে সমতায় ফেরালে মনে হচ্ছিল, চেনা গল্পেই ফিরছে ম্যাচ। অতিরিক্ত সময়ে জোনাথন টা’র একটি হেডার বল জালে জড়ালে বুনো উদ্‌যাপন শুরু করে জার্মানরা। তবে ভিডিও এসিস্ট্যান্ট রেফারির (ভিএআর) পর্যালোচনায় মূল রেফারি জালাল জায়েদ ফাউলের অভিযোগে গোলটি বাতিল করেন। ডাগআউটে এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে হলুদ কার্ড দেখেন জার্মান বস।

কিন্তু আসল নাটক তোলা ছিল টাইব্রেকারের জন্য। প্রথম শট নিতে আসলেন ম্যাচের গোলদাতা হাভার্টজ। প্যারাগুয়ে গোলকিপার অরল্যান্ডো গিল তাকে দীর্ঘক্ষণ দাঁড় করিয়ে রেখে যে মনস্তাত্ত্বিক খেলাটা খেললেন, তাতেই বুঝি পরাস্ত হলো জার্মান অহংকার। গিলের সেভের পর ভোল্টমেডের শটও আটকে ফেলেন গিল। মাঝে প্যারাগুয়ে দু’বার ম্যাচ শেষ করার সুযোগ হাতছাড়া করে। তবে সাডেন ডেথে জোনাথন টা বল আকাশে উড়িয়ে মারতেই আবারো ম্যাচ হাতের মুঠোয় পেয়ে যায় প্যারাগুইয়ানরা। তৃতীয়বার আর কোনো ভুল হয়নি। শেষ শটে হোসে কানাল ম্যানুয়েল নয়্যারকে পরাস্ত করতেই জার্মানির বুক ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।

২০১৪ সালে ব্রাজিলকে কাঁদিয়ে ট্রফি জেতার পর গত ১২ বছরে বিশ্বকাপে একটিও নকআউট ম্যাচ জিততে পারেনি জার্মানি। ম্যাচ শেষে আর্সেনাল তারকা কাই হাভার্টজ মাথা নিচু করে ক্ষমা চেয়ে বলেন, ‘আমার এটি দ্বিতীয় বিশ্বকাপ এবং টানা দু’বার আমরা পরের রাউন্ডে যেতে ব্যর্থ হলাম। আমি দুঃখপ্রকাশ করছি। আমাদের অনেক পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু আমরা জেতার যোগ্য ছিলাম না।’

কোচ নাগেলসম্যানও স্বীকার করে নিলেন রুঢ় বাস্তবতা, বললেন ‘আমরা আর প্রথম সারির দলগুলোর কাতারে নেই। প্যারাগুয়ের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়াটা অত্যন্ত তিক্ত।’ তবে ২০২৮ সাল পর্যন্ত চুক্তিবদ্ধ ৩৮ বছর বয়সী এই কোচ এখনই পদত্যাগ করছেন না। তিনি আরও বলেন, ‘যদি ডিএফবি (জার্মান ফুটবল এসোসিয়েশন) চায়, আমি থাকবো। তবে আমি জানি এই ইন্ডাস্ট্রি কীভাবে চলে। জার্মানির মানুষ এখন আমাকে নিয়ে খুব একটা ইতিবাচক কথা বলবে না।’ ফুটবল মহলে ইতিমধ্যেই গুঞ্জন, নাগেলসম্যানের ডাগআউটে বসার দিন ফুরিয়ে এসেছে এবং ইয়ুর্গেন ক্লপকে আনার দাবি জোরালো হচ্ছে।

২০০০ সালের ইউরো বিপর্যয়ের পর জার্মান ফুটবলে যে ‘ডাস রিবুট’ বা আমূল পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছিল, যেভাবে এসেছিল ২০১৪-র সাফল্য, আজ ২৬-এর বস্টনে এসে মনে হচ্ছে সেই রিবুটেরও একটা সিকুয়েল প্রয়োজন। কারণ ফুটবল বোদ্ধাদের মতে জার্মানি দলটা এখন আর কেবল ‘আনলাকি’ নয়, তারা আসলে আর আগের মতো ভালো দলই নেই!

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন