সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর যৌথভাবে আয়োজিত ‘রোডম্যাপ ফর ট্রেড, গ্রোথ অ্যান্ড ইকোনমিক ডিপ্লোম্যাসি: নেভিগেটিং রিস্কস, লেভারেজিং রেজিলিয়েন্স’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনটি একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে-আগামী দিনের কূটনীতি হবে অর্থনৈতিক কূটনীতি, আর অর্থনৈতিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দু হবে বিনিয়োগ, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ ও বাজার সম্প্রসারণ।
বিশ্বব্যবস্থা বদলে গেছে। রাষ্ট্রের সাফল্য এখন নির্ধারিত হয় তার অর্থনৈতিক সক্ষমতা, বৈশ্বিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণ, বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষমতা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ রপ্তানির মাধ্যমে। এই নতুন বাস্তবতায় কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে অর্থনীতি। তাই আজকের বিশ্বে অর্থনৈতিক কূটনীতিই জাতীয় উন্নয়ন ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার প্রধান হাতিয়ার।
অর্থনৈতিক কূটনীতিতে সফল হলে দ্রুত বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যায়, নতুন বাজার মেলে, বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে যুক্ত হওয়া যায়, যুগোপযোগী দক্ষ মানবসম্পদের বিদেশে কর্মসংস্থান করা যায়। অর্থনৈতিক কূটনীতি এখন আর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একক দায়িত্ব নয়, সমন্বিত রাষ্ট্রীয় মিশন।
প্রথমেই যা করতে হবে: বৈশ্বিক চাহিদার বিজ্ঞানভিত্তিক ম্যাপিং: সবার আগে চাই “গ্লোবাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্স প্ল্যাটফরম”। এই প্ল্যাটফরম ডেটা অ্যানালিটিকস ব্যবহার করে জানাবে আগামী ৫ থেকে ২০ বছর কোন পণ্য ও সেবার চাহিদা বাড়বে, কারা কিনবে, কোন দেশে হতে হচ্ছে নতুন বাজার, দক্ষ জনশক্তি কাদের প্রয়োজন। অর্থাৎ হবে তথ্যভিত্তিক মার্কেট ম্যাপিং। সেই অনুযায়ী নির্ধারিত হবে প্রায়োরিটি সেক্টর।
বিশ্ব মার্কেট ট্রেন্ড বিশ্লেষণ বলছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল সেবা, সেমিকন্ডাক্টর সাপোর্ট ইকোসিস্টেম, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা ও কেয়ার ইকোনমি, এগ্রি-টেক ও ফুড প্রসেসিং, ফার্মাসিউটিক্যালস, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, ব্লু ইকোনমি, ক্রিয়েটিভ ইকোনমি, স্পোর্টস ইকোনমি, সাইবার সিকিউরিটি, ডেটা অ্যানালিটিকস ও বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং এইসব খাত হয়ে উঠছে বাণিজ্য ও প্রবৃদ্ধির মূল ক্ষেত্র।
দ্বিতীয় ধাপ: বাংলাদেশের সক্ষমতার কঠোর মূল্যায়ন: বিশ্ববাজারে চাহিদা থাকলেই হবে না, দেখতে হবেÑবাংলাদেশ সেই চাহিদা পূরণ করার সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে কি-না। প্রতিযোগী দেশগুলোর চাইতে কি কি কম্পিটিটিভ এডভান্টেজ আছে। দরকার প্রতিটি সম্ভাব্য খাতের জন্য “ন্যাশনাল কম্পিটিটিভনেস অডিট” করা। সক্ষমতা যাচাই করা। দক্ষ মানবসম্পদ প্রাপ্যতা, অবকাঠামো সক্ষমতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, নীতিগত স্থিতিশীলতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, উৎপাদন খরচ, লজিস্টিক দক্ষতা, রপ্তানি সক্ষমতা, পরিবেশ ও সামাজিক মানদণ্ড পূরণের সক্ষমতা এই সব সূচকের ওপর ভিত্তি করে কম্পিটিটিভনেস অডিট হতে পারে। একই সঙ্গে দেখা হবেÑ আমাদের প্রতিযোগী কারা? ভিয়েতনাম, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া বা মেক্সিকোর তুলনায় আমাদের সুবিধা কোথায়? কোথায় আমরা বেশি ভ্যালু এড করতে পারি যা অন্যরা পারবে না?
বাংলাদেশের বড় সুবিধা পপুলেশন ডিভিডেন্ড এবং সস্তা শ্রম। কিন্তু এই সুবিধা তখনই কাজে আসবে যখন তরুণ শিক্ষার্থীদের কর্মমুখী দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করা হবে। ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় সেই দেশই এগিয়ে থাকবে যারা জোর দেবে অবকাঠামো নির্মাণ, দক্ষতা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ওপর।
তৃতীয় ধাপ: অগ্রাধিকারভিত্তিক জাতীয় প্রকল্প তালিকা: মার্কেট ম্যাপিং এবং সম্ভাবনা যাচাই সূচকে উত্তীর্ণ খাতগুলো নিয়ে এসবের সম্ভাবনা, প্রস্তুতি ও আর্থিক রিটার্ন বিবেচনায় প্রকল্পগুলোকে প্রস্পেক্ট অনুযায়ী ৩টি ভাগ করা যেতে পারে। যেমন হতে পারে, টপ প্রায়োরিটি: ফার্মাসিউটিক্যালস, আইসিটি ও এআই, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দক্ষ মানবসম্পদ রপ্তানি, লজিস্টিকস ও বন্দর উন্নয়ন।
মিড প্রায়োরিটি: ক্রিয়েটিভ ইকোনমি, স্পোর্টস ইকোনমি, মেডিকেল ট্যুরিজম, ব্লু ইকোনমি, ফুড প্রসেসিং।
লো প্রায়োরিটি: স্বল্পমূল্য সংযোজনভিত্তিক শিল্প, উচ্চ আমদানিনির্ভর ও নিম্ন প্রযুক্তিভিত্তিক খাত
প্রতিটি খাতের জন্য আলাদা “সেক্টর ডেভেলপমেন্ট ব্লুপ্রিন্ট” প্রয়োজন।
চতুর্থ ধাপ: বিনিয়োগযোগ্য ব্যবসায়িক প্রস্তাব তৈরি: বিনিয়োগকারীরা শুধু সম্ভাবনার গল্প শুনতে চান না, তারা সক্ষমতা, কম্পিটিটিভ এডভান্টেজ ও আর্থিক ফোরকাস্টিং দেখতে চান। আর তাই প্রতিটি অগ্রাধিকার প্রকল্পের প্রেজেন্টেশনে থাকতে হবে-বাজার বিশ্লেষণ, আর্থিক পূর্বাভাস, বিনিয়োগ প্রয়োজনীয়তা, প্রত্যাশিত রিটার্ন, কর সুবিধা, মুনাফা স্থানান্তর নীতি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো, এক্সিট প্ল্যান, পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন।
এই জায়গাতেই একটা বিশাল বড় ভূমিকা রাখতে পারেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। তারা জানেন কোন প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে আগ্রহী হতে পারে। সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীর সঙ্গে তারা ঘটিয়ে দিতে পারেন সংযোগ। এক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের “ইনভেস্টমেন্ট অ্যাম্বাসেডর” হিসেবে যুক্ত করা যেতে পারে। তাদের নেটওয়ার্ক, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং স্থানীয় বাজার জ্ঞান বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পঞ্চম ধাপ: লক্ষ্য, বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ও সময়ভিত্তিক রোডম্যাপ: বাংলাদেশকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। যেমন-পাঁচ বছরে এফডিআই দ্বিগুণ করা, রপ্তানি পণ্যের সংখ্যা দ্বিগুণ করা, নতুন ২০টি বাজারে প্রবেশ, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি তিনগুণ বৃদ্ধি, নন-আরএমজি রপ্তানির অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো। রোডম্যাপ হতে পারে তিন ধাপে-
স্বল্পমেয়াদে এক থেকে দুই বছরের মধ্যে নীতিগত সংস্কার, বিনিয়োগ সহজীকরণ, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস কার্যকর করা, বাণিজ্য চুক্তি ত্বরান্বিত করা যেতে পারে।
মধ্যমেয়াদে তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে দক্ষতা উন্নয়ন, শিল্প বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল কার্যকর করা যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে পাঁচ থেকে ১০ বছরে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি, উদ্ভাবন ইকোসিস্টেম, উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়ন পরিকল্পনা নিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়: বাংলাদেশে অসংখ্য চমৎকার নীতি আছে, কিন্তু ঘাটতি রয়েছে বাস্তবায়নে। প্রস্তাবিত এই অর্থনৈতিক কূটনীতির উদ্যোগের সফলতার প্রধান চাবিকাঠি হচ্ছে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়। আর এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সরাসরি তত্ত্বাবধানে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন “ন্যাশনাল ইকোনমিক ডিপ্লোম্যাসি কাউন্সিল” গড়ে তোলা যেতে পারে। এই কাউন্সিলে থাকবেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, শ্রম মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, বিডা এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এই কাউন্সিল প্রতি সপ্তাহে কাজের অগ্রগতি জানাবেন। প্রত্যেকেই ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে প্রতিটি প্রকল্পের অগ্রগতি রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।
যে সব চ্যালেঞ্জ দূর করার ব্যবস্থা নিতে হবে এখনই: ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন, জ্বালানি ঘাটতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দক্ষ মানবসম্পদের অভাব, দুর্বল লজিস্টিক অবকাঠামো, কর প্রশাসনের জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা ও সমন্বয়হীনতা এইসব চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের বিনিয়োগ সক্ষমতা সূচক পেছনে টেনে ধরছে।
অবশ্য সরকারের নীতিনির্ধারকরা সেদিনের সম্মেলনে স্পষ্ট করেই বলেছেন এইসব চ্যালেঞ্জ দ্রুতই নিরসন করা হবে। প্রযুক্তি ও সক্ষমতার যে জায়গায় বাংলাদেশ এখন দাঁড়িয়ে আছে। সরকার আন্তরিক হলে অল্প সময়েই বিনিয়োগ চ্যালেঞ্জ দেশ থেকে বিনিয়োগ-বান্ধব দেশ হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশ।
‘‘বাংলাদেশ ফার্স্ট: এক লক্ষ্য, এক দেশ”: রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি পুরো জাতির সম্মিলিত অভিযাত্রা। ‘‘বাংলাদেশ ফার্স্ট: এক লক্ষ্য, এক দেশ”। এই অনুভবই হবে নীতি, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের কেন্দ্রীয় দর্শন। প্রত্যেক দূতাবাস হবে বিনিয়োগ কেন্দ্র। প্রত্যেক কূটনীতিক হবেন অর্থনৈতিক দূত। প্রত্যেক প্রবাসী বাংলাদেশি হবেন উন্নয়নের অংশীদার। প্রত্যেক মন্ত্রণালয় কাজ করবে একই লক্ষ্য নিয়ে। কারণ, আগামী দশকের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় জয়ী হবে সেই দেশ, যারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়, তথ্যনির্ভর পরিকল্পনা করে এবং সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করে।
আগামী পাঁচ বছরে আমরা যা করবো, তা নির্ধারণ করবে আগামী পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়াবে। দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে, নাকি একটি সুযোগ হারানো অর্থনীতি হিসেবে। সিদ্ধান্তটা নিতে হবে আমাদেরই।
তাই এখনই সময়
প্রতিক্রিয়াশীল অর্থনীতি থেকে কৌশলগত অর্থনীতিতে উত্তরণের, বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগ গন্তব্যে রূপান্তর করার।
অর্থনৈতিক কূটনীতিকে জাতীয় উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত করার।
লেখক: বিশ্লেষক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব
