নেতানিয়াহুর দুঃস্বপ্ন

বিবিসির বিশ্লেষণ

নেতানিয়াহুর দুঃস্বপ্ন

ফন্ট সাইজ:

যে আশায় পারস্য উপসাগরে ঈগলের ছায়া ডেকে এনেছিলো ইহুদিদের সরদার তা আজ গুঁড়েবালি। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি চুক্তি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে এক গভীর রাজনৈতিক দুঃস্বপ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এই চুক্তি নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের তিনটি প্রধান ভিত্তিকে গুঁড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি তাকে এক নতুন নিরাপত্তা সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

ওয়াশিংটনের ওপর দীর্ঘকাল ধরে নিজের একচ্ছত্র প্রভাব দাবি করা এবং মার্কিন রাজনীতিকদের প্রভাবিত করার গর্ব করা এই নেতা কীভাবে তার প্রধান মিত্রের কাছ থেকে এতটা উপেক্ষিত ও জনসমক্ষে অপদস্থ হলেন, তা নিয়ে এখন বড় প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে, ইসরাইলে আগামী সাধারণ নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর হামলা বন্ধ করার জন্য ওয়াশিংটন ও তেহরানের যৌথ চাপ ইসরাইলের তথাকথিত ‘মিস্টার সিকিউরিটি’ তথা নিরাপত্তার বরপুত্র হিসেবে পরিচিত নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভাবমূর্তি টিকিয়ে রাখাকে অসম্ভব করে তুলেছে। বর্তমানে নেতানিয়াহুর সামনে কোনো সহজ পথ খোলা নেই। ইসরাইলি পার্লামেন্ট নেসেটে দেশটির বিরোধীদলীয় নেতা ইয়াইর লাপিদ এই পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, ইসরাইল এখন হয় তার সবচেয়ে বড় মিত্রের সাথে একটি ধ্বংসাত্মক সংঘাতের দিকে যাচ্ছে, অথবা নিজেদের জাতীয় স্বার্থের চরম আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হচ্ছে।

গত রবিবার বৈরুতে ইসরাইলি বিমান হামলার নির্দেশ দেয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ভাষায় নেতানিয়াহুর সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছেন, তা লুফে নিয়েছে ইসরাইলের বিরোধী দল ও গণমাধ্যমগুলো। আগামী অক্টোবরের শেষের দিকে নির্ধারিত সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতানিয়াহুর ওপর চাপ ক্রমশ বাড়ছে। তবে কেবল বিরোধীরাই নয়, নেতানিয়াহুর নিজের দল লিকুদ পার্টি এবং তার জোট সরকারের কট্টরপন্থী মন্ত্রীদের পক্ষ থেকেও তীব্র চাপ আসছে। বিশেষ করে, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে ইসরাইলি সামরিক অভিযান বন্ধ রাখার বিষয়ে তেহরানের শর্তটি তারা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। ইসরাইলের অতি-ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন-গাভির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে- ট্রাম্পের এই চুক্তি ইসরাইলকে কোনোভাবেই মানতে বাধ্য করে না। তারা এমন কোনো চুক্তির অংশীদার নন যা ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না।

অন্যদিকে, সাবেক মোসাদ কর্মকর্তা ও ইরান বিশেষজ্ঞ সিমা শাইন বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন যে, লেবাননের ভাগ্য নির্ধারণের ক্ষমতা ইরানের হাতে ছেড়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আসলে হিজবুল্লাহকে একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকার সুযোগ করে দিচ্ছে, যা ইসরাইলের সামরিক বা রাজনৈতিক কোনো পক্ষই মেনে নিতে পারছে না। এই তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভের ঝড়ের মাঝে খোদ ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর নীরবতা তার পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণের জটিলতাকেই ফুটিয়ে তুলছে। কয়েক দশক ধরে নেতানিয়াহু ইসরাইলি ভোটারদের কাছে নিজেকে আঞ্চলিক হুমকির বিরুদ্ধে একমাত্র রক্ষাকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছেন। কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর তার নেয়া আক্রমণাত্মক কৌশল যা মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে। ইসরাইলি বাহিনী গাজা উপত্যকার সিংহভাগ ধ্বংস করে প্রায় ৭৩ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করলেও গাজার অর্ধেক এলাকার নিয়ন্ত্রণ এখনো হামাসের হাতেই রয়ে গেছে এবং যুদ্ধবিরতির আট মাস পরও সেখানে কোনো স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধান আসেনি। উপরন্তু, গাজা, লেবানন ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে রাখার নীতি ইসরাইলের সামরিক সম্পদ ও রিজার্ভ সেনাদের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করেছে। এই সংঘাত তেহরানের কট্টরপন্থী নেতাদের মার্কিন-ইসরাইলি শক্তির ভয় তো দূর করেছেই, বরং হরমুজ প্রণালিতে তাদের প্রভাব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

ইসরাইলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ (আইএনএসএস)-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ মনে করেন, ইসরাইল যদি ওয়াশিংটনের এই চুক্তিকে নস্যাৎ করার কোনো সামরিক চেষ্টা চালায়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কঠোর জবাব আসবে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রশাসনের আমলে নেতানিয়াহু যেভাবে হোয়াইট হাউসকে বাইপাস করে মার্কিন কংগ্রেস বা জনমতের সমর্থন আদায় করতে পারতেন, ট্রাম্পের আমলে সেই সুযোগ আর অবশিষ্ট নেই। ফলে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের যে স্বপ্ন নেতানিয়াহু দেখছিলেন, তা এখন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে এবং নির্বাচনের আগ মুহূর্তে তিনি কোনো শত্রুর সাথে নয়, বরং নিজের প্রধান মিত্রের সাথেই এক রক্তক্ষয়ী সংঘাত বা আত্মসমর্পণের দোলাচলে আটকা পড়েছেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন