বিশ্বকাপ ফুটবল এবং আমাদের ছেলেবেলা

বিশ্বকাপ ফুটবল এবং আমাদের ছেলেবেলা

ফন্ট সাইজ:

আমাদের ছেলেবেলায় দেখেছি প্রত্যেকটি পাড়া-মহল্লায় একজন প্রতিশ্রুতিশীল সংগঠক থাকতেন। তারা বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক কিংবা ক্রীড়া সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। শিশুদের মানস গঠনে কাজ করতেন। তদের কেউ ছিলেন স্কাউট লিডার। কেউ স্পোর্টস লিডার। কেউ আবার ছোটদের নিয়ে ছুটে বেড়াতেন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ কিংবা বাংলাদেশ টেলিভিশনে। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এইসব সংগঠকদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাদের হাত ধরে আমরাও কিছু কাজ করেছি। সেইসব ছবি হঠাৎ করেই যেন হারিয়ে গেল। সেসব সংগঠনের অনেকগুলোই এখন আর কাজ করে না। যারা এখনো কাজ করে যাচ্ছে তাদের সাধুবাদ জানাই।

বাংলাদেশ জুড়ে এখন চলছে ফুটবল উন্মাদনা। বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা শুরু হয়েছে। এই উন্মাদনার মধ্যে আমরাও পেছনে পড়ে নেই। পতাকা উড়িয়ে আমরাও আনন্দ প্রকাশ করি। যদিও সেই দেশ আমাদের দেশ নয়। কিন্তু আমরা আর্জেন্টিনা, স্পেন, জার্মানি কিংবা ব্রাজিলের পতাকা বুকে নিয়ে উল্লাস করি। এই অবস্থা দেখছি দীর্ঘদিন ধরে। একদিন নিশ্চয়ই বিশ্বকাপ ফুটবলে আমাদের অংশগ্রহণ হবে। মাতামাতি হবে। কিন্তু সেইদিন কবে আসবে, কে জানে। আমরা চ্যানেল আইয়ের পক্ষ থেকে বিশ্বকাপ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে আই স্ট্রাইকার নামে একটি খেলার আয়োজন করেছি। চ্যানেল আই কার্যালয়ে মিনি একটি ফুটবল মাঠ এবং গোলপোস্ট বানানো হয়েছে।

চ্যানেল আইতে আগত বিভিন্ন সেক্টরের অতিথিগণ এই খেলায় অংশগ্রহণ করবেন। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক এবং সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, সাবেক ফুটবলার বিপ্লব, এমিলি, আবদুল গাফ্‌ফার, চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তা প্রধান ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজসহ অনেকেই এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার এবং যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বলেন, আমরা ফুটবল আনন্দে ভেসে যাই। অনেক দেশের পতাকা উড়াই। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে প্রথমে আমাদের দেশের জাতীয় পতাকা উপরে রেখে পরে সাপোর্টিং দেশের পতাকা উড়াবো। কারণ মনে রাখতে হবে প্রথমে নিজের দেশ পরে অন্য দেশ।

সুন্দর প্রস্তাব। আমিও সেই প্রস্তাবের সঙ্গে একমত পোষণ করি। কারণ সবার আগে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। আমরা তো বিশ্বকাপ ফুটবল খেলি। মূল খেলায় হয়তো সুযোগ হয় না। বিশ্বকাপ একটি ঐতিহ্যবাহী খেলা। হুট করে এই খেলায় অংশগ্রহণ করা যায় না। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অংশগ্রহণ করতে হয়। মহাদেশ অনুযায়ী বাছাই পর্ব খেলতে হয় তারপরে নির্দিষ্টসংখ্যক দল চান্স পায় মূল পর্বে। যে কারণে খেললাম আর জিতে গেলাম সেটা হয় না। হঠাৎ করেই একটি দেশে পেলে বা ম্যারাডোনা কিংবা মেসি জন্ম নেবে না। ম্যারাডোনা যেমন আর্জেন্টিনার পতাকাকে বিশ্ব মাঝে পরিচিত করে তোলেন তেমনি পেলে ব্রাজিলের পতাকাকে সারা বিশ্বে পরিচিত করে তোলেন।

ক্রিকেটে তেমনি শচীন টেন্ডুলকার ভারতকে নাচিয়ে তোলে। সাকিব আল হাসান কিংবা তামিম, মাশরাফিরা বাংলাদেশকে পরিচিত করে তোলে। আমাদের নারী ফুটবলাররা আমাদের দেশকে আনন্দে ভাসিয়ে দেয় সাফ ফুটবল শিরোপা জিতে। জ্ঞানবুদ্ধি হবার পর থেকেই ফুটবল উন্মাদনা দেখেছি। ১৯৭৪-এ পশ্চিম জার্মানি শিরোপা জিতলো হল্যান্ডকে হারিয়ে। সেই খেলাটা বাংলাদেশ টেলিভিশন লাইভ দেখাতে পারেনি কিন্তু রেকর্ড করা অংশ দেখিয়েছিল। ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হলো হল্যান্ডকে হারিয়ে। মনে পড়ে ম্যারিও ক্যাম্পাস নামের একজন খেলোয়াড় গোল করে আর্জেন্টিনাকে চ্যাম্পিয়ন করেছিল। এই খেলাটি বিটিভি সরাসরি সম্প্রচার করে। ১৯৮২ সালে ইতালি চ্যাম্পিয়ন হলো পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে। বিটিভি এই খেলা সরাসরি দেখানোর ফলে অসম্ভব জনপ্রিয় হলো। ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হলো পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে। এই খেলায় ঈশ্বরের হাত দিয়ে ম্যারোডোনা গোল করলেন। সারাবিশ্বে সাড়া পড়ে গেল। তখন সারা দেশে উন্মাদনা দেখে কে। ম্যারাডোনাকে নিয়ে ভিউকার্ড ছাপানো হলো। নানান রকম পোস্টারে ছেয়ে গেল তরুণদের ঘর। এমনকি অনেকেই স্কুল ব্যাগে ম্যারাডোনার ছবি রাখতো। ম্যারাডোনার কারণে বিনোদনে পরিণত হলো বিশ্বকাপ ফুটবল। মানে পড়ে ১৯৯০ সালে পশ্চিম জার্মানি চ্যাম্পিয়ন হলো আর্জেন্টিনাকে কাঁদিয়ে। আমরা যারা ম্যারাডোনার সমর্থক তারাও কেঁদেছি। কেঁদেছে হাজারো তরুণ-তরুণী।

১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলো পেলের ব্রাজিল। রবার্তো কার্লোসের দুর্দান্ত ফ্রিকিক দর্শকদের আনন্দ দিলো। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত খেলায় স্বাগাতিক দেশ ফ্রান্স চ্যাম্পিয়ন হলো ব্রাজিলকে হারিয়ে। ২০০২ সালে এশিয়ার দেশ দক্ষিণ কোরিয়া-জাপান-এ আয়োজিত খেলায় চ্যাম্পিয়ন হয় রোনাল্ডোর ব্রাজিল। মজার ব্যাপার হলো ১৯৯৪, ১৯৯৮ এবং ২০০২ পরপর তিনবার ব্রাজিল ফাইনালে খেলে দুইবার চ্যাম্পিয়ন হলো।

২০০৬ সালে চ্যাম্পিয়ন হয় পশ্চিম জার্মানি। ২০১০ সালে চ্যাম্পিয়ন দল হয় স্পেন। ২০১৪ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত খেলায় চ্যাম্পিয়ন হয় পশ্চিম জার্মানি। ২০১৮ সালে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত খেলায় চ্যাম্পিয়ন হয় ফ্রান্স। ২০২২ সালে এশিয়ার কাতারে অনুষ্ঠিত খেলায় চ্যাম্পিয়ন হয় মেসি-ম্যারাডোনার দেশ আর্জেন্টিনা। মেসির কারণে অসম্ভব জনপ্রিয় হয় আর্জেন্টিনা। এ বছর যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা-ম্যাক্সিকোতে অনুষ্ঠিত খেলায় কোন দেশ চ্যাম্পিয়ন হবে জানি না। এ বছরই ৪৮টি দেশ এই বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করছে। রাত জেগে খেলা দেখবো। লক্ষ লক্ষ দর্শক টেলিভিশনের পর্দায় এই খেলা উপভোগ করবেন। ওটিটি প্ল্যাটফরম আইস্ক্রিনও বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো সরাসরি সম্প্রচার করবে।

খ্যাতিমান সাংবাদিক মানবজমিন প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী চ্যানেল আইয়ের পক্ষ থেকে ছুটে গেছেন আমেরিকায়। তিনি দর্শকদেরকে অনেক তথ্য দিবেন বিশ্বকাপ নিয়ে। আমরা তো মনেপ্রাণে চাইবোই ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হোক। কারণ এই দু’টি দেশের সমর্থক আমাদের দেশে বেশি। তবে খেলার উন্মাদনাকে কেন্দ্র করে যেন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। খেলা তো খেলা-ই। খেলা নিয়ে আমরা বিনোদন উপভোগ করবো। অন্য দেশকে সমর্থন করবো ঠিক আছে। কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে সবার আগে আমাদের দেশ।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন