এবারের বাজেট মানুষের জন্য

এবারের বাজেট মানুষের জন্য

ফন্ট সাইজ:

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, সবার জন্য এই বাজেট। এবারের জাতীয় বাজেটে দেশের প্রতিটি মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। সমাজের পৃষ্ঠা ৮ কলাম ১
কোনো শ্রেণি, পেশা, ধর্ম বা গোষ্ঠীকে বাজেটের আওতার বাইরে রাখা হয়নি। সম্পদের সীমাবদ্ধতা আছে। এই সীমাবদ্ধতার মধ্যে দেশের প্রতিটি মানুষকে বাজেটের আওতায় আনা হয়েছে। গতকাল রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

সংবাদ সম্মেলনের সূচনা বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সবার জন্য ‘ইনক্লুসিভ’ বাজেট করতে হয়েছে। গত দেড় দশক আমাদের অর্থনীতি ছিল পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতি। কিছু মানুষের অর্থনীতি। নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে, একটি গোষ্ঠীকে সুবিধা দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা আমাদের অর্থনীতির ভাবনায় সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চাই। সেই ভাবনা থেকে সীমিত সম্পদের মধ্যে সবার জন্যই এই বাজেট দেয়া হয়েছে।

আমীর খসরু বলেন, এবারের বাজেটের মূল দর্শন হচ্ছে অর্থনীতিকে গণতান্ত্রিক করা এবং উন্নয়নের মূলধারার বাইরে থাকা মানুষদের রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার আওতায় নিয়ে আসা।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, জুলাই-আগস্টের গণ-আন্দোলন এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর দেশের মানুষ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন সরকার পেয়েছে। এবারের বাজেটের প্রেক্ষাপট অন্যান্য সময়ের তুলনায় ভিন্ন। দীর্ঘদিন ধরে দেশের মানুষ এমন একটি বাজেট থেকে বঞ্চিত ছিল, যেখানে তাদের প্রত্যাশা ও আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, এবারের বাজেট ভিন্নধর্মী বাজেট; প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ভাবনা-দর্শন ভিন্ন। দেড় দশকে দেশের ভেতরে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে । আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত কিছু না কিছু ঘটছে। একটার পর একটা ঘটনা ঘটছে। এখন চলছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ। এমন বিশ্ব প্রেক্ষাপটে আমাদের চ্যালেঞ্জ আরও বেশি। আর এই প্রেক্ষাপটেই সবাইকে বাঁচিয়ে রেখে গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এবারের বাজেট দেয়া হয়েছে।
দেশের সীমিত সম্পদের কথা তুলে ধরে আমীর খসরু বলেন, সরকারের প্রতিটি প্রকল্প ও ব্যয় এই চারটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে। অপচয়ভিত্তিক অর্থনীতি নয়, বরং নীতি-নৈতিকতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করাই সরকারের লক্ষ্য। এগুলো হলোÑ অর্থের যথাযথ ব্যবহার (ভ্যালু ফর মানি), বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাবর্তন (রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট), কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত বিবেচনা।

বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতার কথাও তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, নিয়মভিত্তিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে বিশ্ব ক্রমেই সুরক্ষাবাদী ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে। পাশাপাশি যুদ্ধ ও সংঘাত এখন নতুন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতাসহ বিভিন্ন কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে, যার প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়ছে। তিনি বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক সংকট এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে সরকারের চ্যালেঞ্জ আরও বেড়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি খাতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী জানান, ভবিষ্যতে সরকারি ব্যয় ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হবে।

বিনিয়োগভিত্তিক অর্থনীতি গড়ার তাগিদ: অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতিকে টেকসই ও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে ঋণনির্ভরতা কমিয়ে বিনিয়োগভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার বিকল্প নেই। শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করলেই হবে না, সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ-সংক্রান্ত নীতিমালার বাস্তবায়ন তদারকির জন্য একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করা হবে। সরকারি সেবা নিতে গিয়ে কেউ হয়রানি বা ক্ষতির শিকার হলে সরাসরি অভিযোগ জানানোর জন্য একটি বিশেষ ওয়েবসাইট চালুর উদ্যোগের কথাও জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টাস্কফোর্স ব্যবস্থা নেবে। একই সঙ্গে প্রতিটি কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। কোনো কাজে অযৌক্তিক বিলম্ব হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের কার্যালয়ে বিশেষ ড্যাশবোর্ড চালুর উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনের শেষদিকে অর্থমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সরকারের পরিকল্পনাগুলোর ৮০ শতাংশও যদি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।

মূল্যস্ফীতি কমার আশা: আমীর খসরু বলেন, আমাদের পলিসিগুলো যদি ঠিকমতো বাস্তবায়ন করতে পারি, আমি মনে করি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন হবে না। সাংবাদিকদের প্রশ্নে অর্থমন্ত্রী বলেন, মূল্যস্ফীতিটা গত বেশ কয়েক বছর ধরে বাড়তে বাড়তে ৯ এর উপরে তিন বছর ধরে চলছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ। আপনারা জানেন ব্যাংকগুলোতে যেহেতু বিরাট একটা মূলধন ঘাটতি রয়ে গেছে লুটপাটের কারণে, ঋণ নেয়ার কারণে, যে কারণে তহবিল খরচ অনেক বেশি হয়ে গেছে, এটার প্রতিফলন কিন্তু মূল্যস্ফীতিতে পড়ছে। অর্থমন্ত্রীর মতে, মূল্য নিয়ন্ত্রণ, বাজার নিয়ন্ত্রণ পুলিশ দিয়ে, র‍্যাব দিয়ে, সরকারি লোক দিয়ে মূল্য কারসাজি নিয়ন্ত্রণ হবে না। আপনাকে মূল্য নিয়ন্ত্রণটা করতে হবে আপনার নীতির মাধ্যমে। এবং আপনার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। সুতরাং আমাদের পলিসিগুলো যদি আমরা ঠিকমতো বাস্তবায়ন করতে পারি, আমাদের ‘ইনফ্লেশন কন্ট্রোল’ করা খুব যে কঠিন হবে আমি মনে করি না।”

বেতন বাড়লে, দুর্নীতি কমবে: এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী ১লা জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এতে সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়বে। ফলে দুর্নীতির প্রবণতা কমে আসবে। অর্থমন্ত্রী বলেন, গত ১১ বছরে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। সুতরাং, এটি সমন্বয় করা দরকার। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে, তাদের আয় বাড়বে, তখন নিশ্চয়ই দুর্নীতি কমার কথা।

কর্মসংস্থান বাড়বে: নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাজেটে চাকরির কথা পরিষ্কারভাবে বলা আছে। আমরা আশা করি, বাজেটে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবো। আর কর্মসংস্থানের জন্য আমরা বিনিয়োগে জোর দিচ্ছি। দক্ষ কর্মী তৈরিতে নানা প্রকল্প নেয়া হচ্ছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা স্কিল ডেভেলপমেন্টে জোর দিচ্ছি। দক্ষ একজন শ্রমিকের চাকরি দেশে-বিদেশে হওয়া খুবই সহজ। এজন্য আমরা স্কিল ডেভেলপমেন্ট সংক্রান্ত নানা প্রকল্প হাতে নিচ্ছি।

কালোটাকা তৈরি কমবে: অর্থমন্ত্রী বলেন, মৌজার রেট পুনর্মূল্যায়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সারা দেশে মৌজাভিত্তিক জরিপ পরিচালনার মাধ্যমে জমির প্রকৃত বাজারমূল্য নির্ধারণের কাজ চলছে। বাজারদরের সঙ্গে মৌজার রেট সমন্বয় করা গেলে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ অনেকটাই কমে যাবে বলে তিনি মনে করেন।

মন্ত্রী জানান, দেশের অর্থনীতিতে নতুন প্রবৃদ্ধির উৎস তৈরি করতে পর্যটনের সঙ্গে থিয়েটার, সংগীত, চলচ্চিত্র ও শিল্পকলাকে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সংস্কৃতিকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপ দিতে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিশ্বের অনেক দেশ সিনেমা, গান ও থিয়েটারের মাধ্যমে নিজেদের সফট পাওয়ার গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশও একই পথে এগোতে চায়।

সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ইয়াসিন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, অর্থসচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।



কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন