আজ থেকে উৎপাদনে ফিরছে ইস্টার্ন রিফাইনারি

ফন্ট সাইজ:

কাঁচামাল সংকটে বন্ধ থাকা দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড প্রায় তিন সপ্তাহ পর আবার চালু হতে যাচ্ছে। সৌদি আরব থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল নিয়ে একটি ট্যাংকার বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। শুক্রবার সকাল থেকে এ কার্যক্রম শুরু হবে।

ইস্টার্ন রিফাইনারি সূত্র জানায়, তেল যা মজুত আছে, তা দিয়ে আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ দিন পরিশোধন কার্যক্রম চালানো সম্ভব হবে। পরবর্তী অপরিশোধিত তেলের চালান চলতি মাসের ২০ তারিখের পর আসার সম্ভাবনা রয়েছে। সৌদি আরব থেকে চলতি মাসের ১০ থোক ১২ তারিখের মধ্যে নতুন চালান লোডিং হলে সরবরাহে কোনো বিঘ্ন ঘটবে না। পরবর্তী চালানেও প্রায় ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসতে পারে। জানা যায়, ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য ১ লাখ টন ক্রুড বোঝাই করেও এমটি নরডিক্স পল্যাক্স জাহাজটি বাংলাদেশে আসতে পারেনি।

জাহাজটি এখনো হরমুজের কারণে আটকা পড়ে আছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি পরিবহন কার্যত বন্ধ হয়ে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে গত ১৮ই ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের আগে দেশে পৌঁছানো ক্রুডের চালানটিই ছিল সর্বশেষ চালান। ইস্টার্ন রিফাইনারিতে দৈনিক প্রায় সাড়ে ৪ হাজার ক্রুড পরিশোধন করা হয়। গত ২১শে জানুয়ারি আসা চালানের কিছু এবং ১৮ই ফেব্রুয়ারির ১ লাখ টন মিলে ইস্টার্ন রিফাইনারি উৎপাদন অব্যাহত রাখার চেষ্টা করে। পরবর্তীতে উৎপাদন কমিয়েও দেয়া হয়।

কিন্তু এরপরও ক্রুড না আসায় একপর্যায়ে গত ১৪ই এপ্রিল ইস্টার্ন রিফাইনারির চারটি ইউনিটের মধ্যে দুইটি পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হয়। অপর দুইটি ইউনিটও সীমিত পরিসরে বিটুমিন এবং পেট্রোল উৎপাদন করতে থাকে। ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য ক্রুডের সংস্থান করতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) নানাভাবে চেষ্টা করে। সৌদি আরব থেকে ১ লাখ টন ক্রুড নিয়ে আসার ব্যাপারে সবকিছু চূড়ান্ত করা হয়।

বিপিসি’র ক্রুড পরিবহনের যাবতীয় ব্যবস্থা করে থাকে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)। সৌদি আরবের ওই ক্রুড আনার জন্য বিএসসি ‘এমটি নিনেমিয়া’ ট্যাংকারটিকে ভাড়া করে। এক লাখ ধারণক্ষমতার এই ট্যাংকারটি সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে গত ২১শে এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্দেশ্যে নোঙ্গর তোলে। মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী ‘এমটি নিনেমিয়া’ জাহাজটি লোহিত সাগর হয়ে চট্টগ্রামের পথে যাত্রা করে। এতে পথিমধ্যে নানা প্রতিকূলতা থাকলেও শেষে বুধবার দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে জাহাজ কুতুবদিয়ার অদূরে নোঙ্গর করে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে বুধবার দুপুর ১২টায় চট্টগ্রামে এসেছে ট্যাংকার জাহাজ এমটি নিনেমিয়া। ইস্টার্ন রিফাইনারির উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্ল্যানিং অ্যান্ড শিপিং) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তেল সরবরাহের সব প্রস্তুতি আমাদের নেয়া আছে। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় সকাল থেকে লাইটার জাহাজ আসতে সময় লেগেছে। আগামীকাল (শুক্রবার) সকাল থেকেই ৫টি ইউনিট পুরোদমে উৎপাদন শুরু হবে।

উল্লেখ্য, দেশের জ্বালানি তেলের অন্তত ২০ শতাংশ নির্ভরশীল বিপিসি’র মালিকানাধীন দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত একমাত্র জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির উপর। এতে বছরে ১৫ লাখ টনের বেশি ক্রুড অয়েল পরিশোধন করে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন, ফার্নেস অয়েল, কেরোসিন, জেট ফুয়েল, ন্যাপথা, বিটুমিন, এলপিজিসহ ১৩ ধরনের পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্ট তৈরি করা হয়। ইস্টার্ন রিফাইনারিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ১৪০ টন পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন করা হয়। এর মধ্যে ডিজেল উৎপাদন হয়েছে সর্বোচ্চ ৬ লাখ ৪৮ হাজার ৬১২ টন।

দেশে ডিজেলের চাহিদা বছরে গড়ে ৪০ থেকে ৪২ লাখ টন। চাহিদার বাকি ডিজেল পরিশোধিত অবস্থায় বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটের সময় সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং ভারত থেকে ডিজেল আমদানি বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। ইস্টার্ন রিফাইনারির ডিজাইনে মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রিক ক্রুডই পরিশোধন করা যায়। বাংলাদেশ জিুটুজি ুপদ্ধতিতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসব ক্রুড আমদানি করে। আমদানি করা ক্রুডের শতভাগ পরিবহন করে সরকারি পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান বিএসসি। আমেরিকান প্রতিষ্ঠান নর্ডিক এনার্জি থেকে চার্টারে ট্যাংকার ভাড়া নিয়ে বিএসসি ইস্টার্ন রিফাইনারির সব ক্রুড পরিবহন করে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন