নারী-প্রগতির পথে যৌতুক এক বড় বাধা

নারী-প্রগতির পথে যৌতুক এক বড় বাধা

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের গ্রামেগঞ্জে, শহর-নগরে এখনো কোনো-না-কোনোভাবে অহরহ যৌতুক দাবি এবং আদায় করা হয়। যৌতুকের দর কষাকষি মাঝে মাঝে সামাজিক ভব্যতার সীমা অতিক্রম করে এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, পাত্রীর চেয়ে যৌতুকের জিনিসের মর্যাদা বেশি হয়ে যায়। ওগুলো ছাড়া স্বামীর কাছে স্ত্রীর , কিংবা শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে পুত্রবধূর কোনো মূল্যই থাকে না। আইনে নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়া সত্ত্বেও অনেক বিবাহ প্রত্যাশী যুবক ও তাদের পরিবার একটা ভিন্ন ছুতা ধরে যৌতুক দাবি করে।

বিবাহযোগ্যা মেয়ের বাবা-মা যখন বাধ্য হয়ে এই দাবি পূরণ করে, তখন অসচ্ছল পরিবারের মেয়েরা নিজের মধ্যে গুমরে মরে। এটা তখন একপ্রকার ছদ্মবেশী যৌতুক হয়ে যায়। অনেকক্ষেত্রে যৌতুক দেয়া-নেয়াকে উপহার বলে চালানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু উপহার তো সেই জিনিস—যা মানুষ খুশি হয়ে দেয় এবং দাতা-গ্রহীতা উভয়েই খুশি হয়ে আদান-প্রদান করে। যৌতুক দেয়া-নেয়ার মধ্যে পাত্রীর পরিবারের জন্য এমন কোনো খুশির ছিটেফোঁটা আলামত দেখতে পাওয়া যায় না।

অনেক পাত্রীর বাবা-মা ধারদেনা করে কিংবা সম্পত্তি বন্ধক রেখে মেয়ের মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে যৌতুকের দাবি মেটায়। ঘনিষ্ঠজন ছাড়া আর কেউ এটা জানতে পারে না। এই আদান-প্রদানকে উপহার বলা হলে পৃথিবীর সব শব্দার্থ-জ্ঞাপক অভিধান লজ্জা পেয়ে মুখ লুকোবে। উপহার কখনো বলা-কওয়া করে দেয়া-নেয়া হয় না; এটা দিও, সেটা দিও, না দিতে পারলে, বাবার বাড়িতেই থাকো–এমন হুমকি স্বামী-স্ত্রীর মধুর সম্পর্ককে ধূলিসাৎ করে। মাঝে মাঝে এমনও হয় যে, মুখে কিছু বলে না, কিন্তু আভাসে-ইঙ্গিতে অথবা অন্য লোকের মাধ্যমে মাছের মত ডুবে থেকে বুদবুদ কেটে বুঝিয়ে দেয় হয় যে, কিছু দিতে হবে। প্রকাশ্যভাবে না চাইলেও মনে-মনে যদি আশা থাকে, এটাসেটা পাবে এবং না পেলে পাত্রপক্ষ বেজার হবে, তখন তা যৌতুকের চেয়েও ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। পাত্রপক্ষ মাঝে মাঝে এমন চালাকিও করে যে, তারা কিছু চায় না, কিন্তু তাদের মহল্লায় রেওয়াজ এর কথা বলে–রেওয়াজ অনুযায়ী মেয়ের বাবা-মা কর্তৃক উপঢৌকন দেয়া না হলে তারা সমাজে ছোট হয়ে যাবে।

যখনই মহল্লার রেফারেন্স দেয়া হবে, পাত্রীপক্ষকে বুঝতে হবে, দুই লাইনের ভেতরে অলিখিত সাদা পৃষ্ঠায় ‘যৌতুক চাই’ লেখা আছে। মাঝে মাঝে চালাক-চতুর পাত্রপক্ষ এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে যে, পাত্রীপক্ষ সেধেসুধে কিছু দিতে বাধ্য হয়। তাদের কথা—সেধেসুধে দিলে তো তাকে যৌতুক বলা যাবে না। আর স্বেচ্ছায় যদি মেয়ের ব্যবহারের জন্য পাত্রপক্ষকে পাত্রীপক্ষ জিনিসপত্র দেয়, তাহলে তারা তা গ্রহণ না করলে অসামাজিকতা হবে? এমনও শোনা যায়, পাত্রী শ্বশুর বাড়িতে গেলে তাকে আশপাশের লোক মারফত বলা হয়, শোবে কোথায়, খাট তো আনেনি? এমনি হাজার বিড়ম্বনা আছে নববিবাহিতা একটি মেয়ের জন্য। এমনিতে মেয়েরা বাপ-মা ছেড়ে দূরে অন্য সংসারে যায়। আর সেখানে গিয়ে আদরের পরিবর্তে অনাদর, অসম্মান এবং অবহেলা যদি পায়, তাহলে বিবাহ নামের এই সামাজিক বন্ধনের মাধুর্য কতটা কাঁটার মালা হয়ে উঠতে পারে, তা ভুক্তভোগীরাই কেবল জানে।

দেশের বিদ্যমান আইন এখনো নারীবান্ধব। যৌতুকের জন্য চাপ সৃষ্টি করে কোনো মেয়েকে বাপের বাড়িতে ফেলে রাখলে বহুতর রাষ্ট্রীয় নিগ্রহ রয়েছে পুরুষের জন্য। দেশের জেলা-উপজেলায় প্রশাসনের নানা কমিটি, দেশের বিচারব্যবস্থা, এনজিও সংগঠন এগিয়ে আসে ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়াতে। বেশিরভাগ বাঙালি মেয়ের কাছে স্বামী-গৃহ এবং পিতৃগৃহ সমান সমান। তারা চায় দুকুল রক্ষা হোক। শ্বশুর-শাশুড়িকে এরা মা-বাবার মতোই ভক্তি করে। কিন্তু তারপরও এদেশে অনেক পুরুষের মধ্যে সেই আদিকালের যৌতুক পাওয়ার ঘৃণ্য মনোভাব এখনো প্রবল—বিয়ের মাধ্যমে কিছু হাতিয়ে নেবে, এমন আকাঙ্ক্ষা কিছু শিক্ষিত মানুষের মধ্যেও লক্ষ্য করা যায়। বর্তমান উন্নত যোগাযোগ, অবাধ তথ্যপ্রবাহ এবং বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত অধিকার-সচেতনতার যুগে যদি নারীর সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে আধুনিক যুগের পুরুষেরা নারী নির্যাতনের হাতিয়ার যৌতুক কুপ্রথার প্রতি আকৃষ্ট হয় বা মৌন সমর্থন যোগায়, তাহলে তারা অগ্রগামী বিশ্বের এবং উদারনৈতিক মানসিকতা-সম্পন্ন দেশবাসীর সামনে চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারবে কিভাবে? ব্যক্তিত্বহানির শিকারে পরিণত হয়ে তারা দেশকে ভালো কিছু দেয়ার কোনো দায়িত্ব নিতেই পারবে না।

(লেখক: সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও প্রবন্ধকার)

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন