‘বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বৃহস্পতিবার একটি মানববন্ধন ও র্যালির আয়োজন করে বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশন (বিএলএফ)। “শিশুশ্রমকে না বলি, শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করি” প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে সরকার প্রতিনিধি, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডাইফ)-র প্রতিনিধি, শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ), ইন্ডাস্ট্রিওল বাংলাদেশ কাউন্সিল (আইবিসি) সহ জাতীয় ও খাতভিত্তিক শ্রমিক সংগঠন, মালিক সংগঠন, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), উন্নয়ন সহযোগী, সুশীল সমাজ এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
বিশ্বব্যাপী শিশুশ্রম এখনো একটি গুরুতর সামাজিক ও মানবিক সমস্যা। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ১৩ কোটি ৮০ লাখ শিশু শ্রমে নিয়োজিত, যার মধ্যে প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত রয়েছে। বাংলাদেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় ১৭ লাখ ৯০ হাজার শিশু শ্রমে নিয়োজিত, যার মধ্যে প্রায় ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত থেকে স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক বিকাশের ক্ষেত্রে মারাত্মক ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিশুশ্রম নির্মূলে সম্মিলিত উদ্যোগ জোরদার করার লক্ষ্যে প্রতি বছর ১২ জুন বিশ্বব্যাপী বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস পালন করা হয়।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে সকল ধরনের শিশুশ্রম নির্মূলের অঙ্গীকার করেছে এবং এ লক্ষ্যে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এই জাতীয় অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সহায়তা এবং বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস ২০২৬ উদযাপন উপলক্ষে বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশন (বিএলএফ) ১-১২ই জুন ২০২৬ পর্যন্ত ১২ দিনব্যাপী সচেতনতামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এর মাধ্যমে শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, শিশুদের অধিকার সুরক্ষার পক্ষে জনমত গঠন, ২০৩০ সালের মধ্যে শিশুশ্রম নির্মূলে সকল অংশীজনের অঙ্গীকার জোরদার করা এবং শিশুশ্রম প্রতিরোধে শোভন কর্মপরিবেশ ও নিরাপদ কর্মক্ষেত্র নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরা হবে।
মানববন্ধনে স্কপের যুগ্ম আহ্বায়ক ফয়েজ হোসেন বলেন “শিশুশ্রম বন্ধে পরিবারের সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর পাশাপাশি সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তি ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। শিশুশ্রমে জড়িত ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দক্ষতা উন্নয়ন ও কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ সম্প্রসারণ প্রয়োজন।”
আইবিসির সভাপতি কুতুবউদ্দিন আহমেদ বলেন, “শিশুশ্রম প্রতিরোধে বিদ্যমান আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন এবং কার্যকর নজরদারি জোরদার করতে হবে। শিশুশ্রমমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সরকার, নিয়োগকর্তা, শ্রমিক সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও উন্নয়ন সহযোগীসহ সকল পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য।”
আইএলও প্রতিনিধি নীরান রামজুথান বলেন, “বাংলাদেশের সকল অংশীজনের প্রতি আমার আহ্বান, শিশুশ্রম নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে একটি সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন। পাশাপাশি শিশুদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য শোভন কর্মপরিবেশ প্রতিষ্ঠায় সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।”
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) এর নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন “সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ ছাড়া শিশুশ্রম বন্ধ করা সম্ভব নয়। একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষকে সামনে রেখে আমাদের সকলের সমন্বয়ে একটি এক বছরের কর্মসূচী হাতে নেওয়া উচিৎ যার মাধ্যমে আমরা শিশুশ্রম নিরসনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারবো।”
মানববন্ধনে বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশন (বিএলএফ)-এর নির্বাহী পরিচালক একেএম আশরাফ উদ্দীন বলেন, “শিশুশ্রম এখনো বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও মানবাধিকারগত চ্যালেঞ্জ। এ সমস্যা মোকাবিলায় বিদ্যমান উদ্যোগের পাশাপাশি কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি এবং শিশুশ্রমে জড়িত পরিবারের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিশেষ করে জবরদস্তিমূলক শ্রম, আধুনিক দাসত্ব এবং দায়িত্বশীল সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) সংক্রান্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে দেশের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে শিশুশ্রমমুক্ত করার উদ্যোগ আরও জোরদার করতে হবে।”
আইএলও প্রতিনিধি সৈয়দা মনিরা সুলতানা বলেন, “শিশুশ্রম নিরসনের সঙ্গে শোভন কর্মপরিবেশের একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বাবা-মায়েদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং ন্যায্য মজুরিভিত্তিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে শিশুদের শ্রমে নিয়োজিত হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। একই সঙ্গে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক ও মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে কোনো শিশু অর্থনৈতিক কারণে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়। পাশাপাশি শ্রমে নিয়োজিত শিশুদের পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুশ্রমিকসহ সকল ঝুঁকিপূর্ণ শিশুর অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।”
বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশন-(বিএলএফ) এর মহাসচিব জেড এম কামরুল আনাম বলেন, “শিশুশ্রম নিরসনে সর্বপ্রথম পরিবারকে সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে সমাজের সচ্ছল ব্যক্তিদেরও এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে। শিশুশ্রমে জড়িত পরিবারের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন জরুরি। পাশাপাশি শিশুশ্রম নির্মূলে সরকারের কার্যকর তদারকি ও আইন বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।”
চাইল্ড লেবার এলিমিনেশন প্ল্যাটফর্ম (ক্লেপ)-এর সেক্রেট্রারি আফজাল কবির খান বলেন, “শিশুশ্রম নিরসন বর্তমান সরকারের একটি অগ্রাধিকারমূলক লক্ষ্য। এ জন্য সকল শিশুর জন্য বাধ্যতামূলক শিক্ষা, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং মানসম্মত কারিগরি শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি শিশুশ্রমে জড়িত পরিবারের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। সরকার, উন্নয়ন সহযোগী ও অন্যান্য অংশীজনের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে শিশুশ্রম নির্মূলের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।”
