রংপুরের প্রাণ শ্যামাসুন্দরী খাল। যে খালটির নগরীর সৌন্দর্য বাড়ানোর কথা ছিল, সে খাল আজ অবহেলা ও অব্যবস্থাপনায় নগরীর জন্য অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠেছে। শ্যামাসুন্দরী নিয়ে নেই কোনো পরিকল্পনা, নেই কোনো ব্যবস্থাপনা, সেই সঙ্গে নেই নগরবাসীর সচেতনতা। নগরের দু’টি ঐতিহ্যবাহী খাল শ্যামাসুন্দরী ও কেডি খাল। এ খাল দু’টির আজ বেহাল অবস্থা। খালের প্রবাহে বাধা থাকায় জলাবদ্ধতা দূরের বদলে জলজট তৈরি করছে। স্থানীয়দের অসচেতনতার কারণে বসতবাড়ির ময়লা আবর্জনা ও প্লাস্টিক ফেলার কারণে পানিদূষণ, বায়ুদূষণ, সর্বোপরি রংপুর নগরের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। বিগত দিনগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ পায়নি রংপুর সিটি করপোরেশন (রসিক)। ২০২৪ সালে বরাদ্দ ছিল শূন্য। ফলে শ্যামাসুন্দরী নিয়ে মাঠে নামতে পারেনি রসিক। ১৮৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রংপুর পৌরসভা। ১৮৯০ সালে তৎকালীন পৌরসভার চেয়ারম্যান ও ডিমলার রাজা জানকি বল্লভ সেন তার মা শ্যামাসুন্দরী’র স্মরণে ঘাঘট নদীর মৃত শাখাটি পুনঃখনন করেন। খালটি উত্তর-পশ্চিমে কেল্লাবন্দ ঘাঘট নদী থেকে শুরু হয়ে নগরীর বিভিন্ন এলাকার বুক চিরে মাহিগঞ্জ সাতমাথা রেলগেট এলাকায় কেডি ক্যানেল স্পর্শ করে মিশেছে খোকসা ঘাঘট নদীতে। খাল পুনঃখননের উদ্দেশ্য ছিল শহরের জলাবদ্ধতা নিরসন ও ম্যালেরিয়ার প্রকোপ কমানো। রংপুর নগরীর ১৫ দশমিক ৮০ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এ খালটির সঠিক পরিচর্যা হয়নি কখনো। তাই খাল পুনঃখননের উদ্দেশ্যের ঠিক উল্টো ঘটনা ঘটছে। রংপুর সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর নগরীর জনসংখ্যা হয়েছে ১০ লক্ষাধিক। শ্যামাসুন্দরী খাল ঘেঁষে, খালের জায়গা দখল করে তৈরি হয়েছে বড় বড় অট্টালিকা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, রেস্টুরেন্ট ও ঘরবাড়ি। এসবের প্রতিদিনের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে শ্যামাসুন্দরী খালে। এ ছাড়া পয়ঃনিষ্কাশনের সংযোগ এ খালে দেয়ায় পানি দূষিত হয়ে পড়েছে। ২০১৯ সালে শ্যামাসুন্দরী খালের সীমানা নির্ধারণ, পুনরুদ্ধার ও পুনরুজ্জীবিত কর্মসূচি হাতে নেয়া হলে তা পরবর্তীতে করোনা প্রকোপের কারণে থমকে যায়। এরই মধ্যে ২০২০ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর ১১ ঘণ্টার ৪৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতে রংপুর নগরীর বেশির ভাগ এলাকা তলিয়ে যায়। ঘরবাড়ি, দোকানপাট, মালামাল, খাদ্যশস্যসহ প্রায় অর্ধকোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। এরপর ২০২১ সালের ৩রা অক্টোবর ২৪ ঘণ্টায় ২৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতে নগরীতে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। ২০২১ সালের শেষের দিকে রংপুর সিটি করপোরেশন শ্যামাসুন্দরী নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার জন্য ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়ে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেয়। কিন্তু পরবর্তীতে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের দৃশ্যমান কোনো কিছু দেখতে পাওয়া যায়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে শ্যামাসুন্দরী খালের উন্নয়নে অঙ্গীকার করা হলেও দৃশ্যমান কোনো কাজ লক্ষ্য করা যায়নি। সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের রংপুর মহানগর সভাপতি এড. জোবাইদুল ইসলাম বলেন, শ্যামাসুন্দরী খালের কোনো কোনো অংশ কিছু অসাধু মানুষ দখলে নিয়েছে। ফলে খালটি আজ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এর জন্য দায়ী রংপুর সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসন। তারা নিজেদের দায়িত্ব পালন করেনি। শ্যামাসুন্দরী খাল সিটি করপোরেশনের প্রায় সব ওয়ার্ড ঘেঁষে গেছে। যদি সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলরা নিজ নিজ এলাকায় শ্যামাসুন্দরীকে রক্ষা করতেন, তাহলে এমন পরিস্থিতি হতো না। খালটা রক্ষা করার মন-মানসিকতা কারও নেই বরং দখল করার প্রবণতাই বেশি। তিনি আরও বলেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও পানি উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে যদি বর্তমান সরকারের খাল কাটা কর্মসূচির আওতায় শ্যামাসুন্দরীকে আনা যায়, তাহলে শ্যামাসুন্দরী খাল পুনরায় নিজের রূপে ফিরবে এবং রংপুর নগরীর সৌন্দর্যতা বাড়াবে। রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এড. মাহফুজ-উন-নবী ডন বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার রংপুর সিটি করপোরেশনে বাজেট বৈষম্য করেছে। তারা রংপুর সিটি করপোরেশনে শূন্য বাজেট দিয়েছিল। এখন আমি সকল দলমতের মানুষকে নিয়ে শ্যামাসুন্দরীকে বাঁচাতে লড়াই করে যাবো।
আশীর্বাদের শ্যামাসুন্দরী যেন এখন অভিশাপ
জাভেদ ইকবাল, রংপুর থেকে
১৯ এপ্রিল (রবিবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
