হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার খবরে বিশ্বনেতাদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার খবরে বিশ্বনেতাদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

ফন্ট সাইজ:

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প উভয়েই জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য খোলা। এ ঘোষণায় বিশ্বনেতারা মিশ্র প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। আরাঘচি শুক্রবার ঘোষণা করেন, কৌশলগত এই জলপথটি সম্পূর্ণ খোলা। যা আগের দিন কার্যকর হওয়া ইসরাইল-লেবানন যুদ্ধবিরতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ডনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে নিশ্চিত করেন যে প্রণালিটি খোলা। তিনি পরে দাবি করেন, ইরান আর কখনো হরমুজ প্রণালি বন্ধ করবে না বলে সম্মত হয়েছে। তবে তিনি এটিও বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ পূর্ণ শক্তিতে বহাল থাকবে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স, এপিকে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।

এদিকে ফ্রান্স ও বৃটেন প্যারিসে প্রায় ৪০টি দেশের অংশগ্রহণে একটি বৈঠকের আয়োজন করে। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ শেষ হলে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারে তারা ভূমিকা রাখবে। এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল পরিবহন হয়। ফলে এখানে ট্যাংকার চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে।

এ ঘোষণায় বিশ্বনেতারা মিশ্র বার্তার মধ্যেও সতর্ক আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন- হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ খোলা এবং বাণিজ্য ও পূর্ণ চলাচলের জন্য প্রস্তুত। তবে ইরান-সংক্রান্ত ক্ষেত্রে নৌ অবরোধ সম্পূর্ণ শক্তিতে বহাল থাকবে, যতক্ষণ না আমাদের চুক্তি শতভাগ সম্পন্ন হয়।

কিছুক্ষণ পর তিনি আবার লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অবরোধ ইরানি জাহাজ ও বন্দরগুলোর ওপর বহাল থাকবে, যতক্ষণ না তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছায়, যার মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচিও অন্তর্ভুক্ত। পরে এএফপিকে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করার চুক্তি খুব কাছাকাছি এবং আর কোনো বড় বাধা নেই। জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক্সে লিখেছেন, প্রণালিটি সম্পূর্ণ খোলা ঘোষণা করা হয়েছে এবং ইসরাইল-লেবাননের ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির সময়জুড়ে এটি খোলা থাকবে। তবে পরবর্তীতে ইরানের কিছু রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ভিন্ন তথ্য দেয়। এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা জানান, শুধু বেসামরিক জাহাজ- তাও ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড করপস (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর অনুমতি নিয়ে চলাচল করতে পারবে। আইআরজিসি ঘনিষ্ঠ ফার্স নিউজ এজেন্সি জানায়, দেশের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের অস্বাভাবিক নীরবতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে এবং নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির অবস্থানও স্পষ্ট নয়।

বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার প্যারিসে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রনের সঙ্গে যৌথভাবে একটি শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করেন, যেখানে ৩০-৪০টি দেশ সরাসরি বা ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নেয়। স্টারমার সতর্কভাবে প্রণালি খোলার খবরকে স্বাগত জানালেও বলেন, এটি স্থায়ী ও কার্যকর হতে হবে। তিনি বলেন, বৃটেন ও ফ্রান্স একটি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও প্রতিরক্ষামূলক বহুজাতিক মিশনের নেতৃত্ব দেবে, যা নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে।

সম্মেলনের পর ইমানুয়েল মাক্রন বলেন, আমরা সবাই হরমুজ প্রণালির সম্পূর্ণ, তাৎক্ষণিক ও নিঃশর্ত পুনরায় খোলার দাবি জানাই। তিনি আরও বলেন, আমরা এমন কোনো সীমাবদ্ধতা বা চুক্তির বিরোধিতা করি, যা কার্যত প্রণালিটিকে বেসরকারিকরণ করার চেষ্টা হবে এবং অবশ্যই কোনো টোল ব্যবস্থারও বিরোধিতা করি। মাক্রনের দপ্তর জানায়, আন্তর্জাতিক জোটের সদস্যরা গোয়েন্দা তথ্য, মাইন অপসারণ, সামরিক এসকর্ট এবং উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ- এসব ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেৎস বলেন, জার্মানি এই মিশনে মাইন অপসারণ ও গোয়েন্দা সহায়তা দিতে পারে। তবে এর জন্য সংসদের অনুমোদন এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মতো একটি আইনগত ভিত্তি প্রয়োজন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণও প্রয়োজন। আমরা মনে করি এটি কাম্য। তবে পরে ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে ইঙ্গিত দেন, ন্যাটোর সহায়তা তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব এক্সে লিখেছেন, আমরা প্রণালি খোলার ইরানের ঘোষণাকে স্বাগত জানাই। স্থায়ী সমাধানের জন্য কূটনীতি প্রয়োজন।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস শুক্রবার হরমুজ প্রণালি খোলার ঘটনাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এটি সঠিক পথে একটি পদক্ষেপ।

জাতিসংঘের শিপিং সংস্থার মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গেজ বলেন, আমরা প্রণালি পুনরায় খোলার ঘোষণাটি যাচাই করছি, এটি যেন সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য নিরাপদ ও অবাধ চলাচলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

নরওয়ের শিপওনার্স অ্যাসোসিয়েশন জানায়, জাহাজ চলাচলের আগে অনেক বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন- যেমন মাইন আছে কি না, ইরানের শর্ত কী এবং বাস্তবায়ন কীভাবে হবে। সংস্থার প্রধান নির্বাহী নুট আরিল্ড হারেইদে বলেন, এটি যদি প্রণালি খোলার দিকে একটি পদক্ষেপ হয়, তাহলে এ পদক্ষেপ স্বাগত জানানোর যোগ্য। জার্মানির হাপাগ-লয়েড শিপিং কোম্পানির এক মুখপাত্র বলেন, আমরা নতুন পরিস্থিতি ও ঝুঁকি মূল্যায়ন করছি। আপাতত আমরা প্রণালি দিয়ে চলাচল থেকে বিরত থাকছি।

ডেনমার্কের মেয়ার্স্ক জানায়, আমরা ঘোষণাটি লক্ষ্য করেছি। আমাদের কর্মী, জাহাজ ও পণ্যের নিরাপত্তাই অগ্রাধিকার। এখন পর্যন্ত নিরাপত্তা অংশীদারদের পরামর্শ ছিল- প্রণালি এড়িয়ে চলা।

ইরান যুদ্ধবিরতির সময় প্রণালি সম্পূর্ণ খোলা থাকবে এমন ঘোষণায় তেলের দাম হঠাৎ কমে যায়। এক্সটিবি-এর গবেষণা পরিচালক ক্যাথলিন ব্রুকস বলেন, এই খবর বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলছে। যুদ্ধবিরতির সময় এটি সবচেয়ে বড় উন্নয়ন, যা আশা জাগায় যে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন