নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী বিল লোকসভায় পাস হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রমে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ কেন্দ্রীয় সরকার প্রয়োজনীয় ভোট সংগ্রহ করতে পারেনি। সংবিধান (১৩১তম সংশোধনী) বিল, ২০২৬ পাস করাতে সরকারের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তারা সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি। প্রস্তাবিত বিলের পক্ষে ২৯৮ জন সংসদ সদস্য ভোট দেন এবং বিপক্ষে ভোট দেন ২৩০ জন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি।
প্রথম বিলটি পাস না হওয়ায়, আরও দুটি বিল ভোটে তোলা হয়নি। এর মধ্যে একটি ছিল আসন পুনর্বিন্যাস (ডেলিমিটেশন) এবং লোকসভায় আসন সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে। কেন্দ্র জানায়, এই বিলগুলো নারী সংরক্ষণ সংক্রান্ত আইনের সঙ্গে অন্তর্নিহিতভাবে যুক্ত। বৃহস্পতিবার মধ্যরাত পর্যন্ত এবং শুক্রবার অব্যাহত থাকা লোকসভা বিতর্কে সরকার জোরালোভাবে দাবি তোলে, লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভায় ৩৩ শতাংশ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষণ করা হোক। সরকারের পক্ষে নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি বিরোধীদের একটি বড় আশঙ্কা দূর করার চেষ্টা করে বলেন, লোকসভায় আসন সংখ্যা বাড়ানো হলেও দক্ষিণের রাজ্যগুলোর প্রতি কোনো অবিচার করা হবে না। এ বিষয়ে তিনি ব্যক্তিগতভাবে নিশ্চয়তা দিচ্ছেন।
মোদি বলেন, নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন দেওয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ আমরা যেন হাতছাড়া না করি। আমি আপনাদের অনুরোধ করছি-এটিকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবেন না, এটি জাতীয় স্বার্থের বিষয়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও দুই দিন ধরে সংসদে আশ্বস্ত করেন, লোকসভায় বর্তমান ৫৪৩টি আসন বাড়িয়ে প্রায় ৮১৬টি করা হলেও দক্ষিণের রাজ্যগুলোর প্রতিনিধিত্ব অক্ষুণ্ন থাকবে বা সামান্য বাড়বে। মোদি ও শাহ উভয়েই কংগ্রেস ও অন্যান্য বিরোধী দলকে অভিযুক্ত করেন- তারা নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে নানা ইস্যু তৈরি করে বিলটির বিরোধিতা করছে এবং নারীদের সংরক্ষিত আসন থেকে বঞ্চিত করছে। বিজেপি নেতারা বলেন, এর জন্য তাদের নির্বাচনে মূল্য দিতে হবে।
বিলটির সঙ্গে ডেলিমিটেশন যুক্ত করার বিরোধিতা করে বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী বলেন, সরকার নারী সংরক্ষণের বিষয়টিকে একটি আড়াল হিসেবে ব্যবহার করছে এবং আসলে দেশের নির্বাচনী মানচিত্র নিজেদের পক্ষে পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। তিনি অভিযোগ করেন, এটি নারীদের বিল নয়। কারণ এতে নারীর ক্ষমতায়নের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। এটি আসলে নারীদের আড়ালে রেখে ভারতের নির্বাচনী মানচিত্র বদলানোর একটি চেষ্টা। গান্ধী আরও দাবি করেন, সরকার জাতিভিত্তিক জনগণনা এড়িয়ে যেতে চাইছে। তিনি বলেন, তারা আমার ওবিসি ভাইবোনদের ক্ষমতা ও প্রতিনিধিত্ব দিতে চায় না, বরং তাদের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিতে চায়।
লোকসভায় বিলটি পাস না হওয়ার পর সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেন, অন্য দুটি বিল এর সঙ্গে অন্তর্নিহিতভাবে জড়িত ছিল। তিনি বলেন, এটি দুঃখজনক যে বিরোধীরা এমন একটি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিলকে সমর্থন করেনি, যা দেশের মানুষের সম্মান ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করত। আপনাদের একটি সুযোগ ছিল, কিন্তু আপনারা তা নষ্ট করেছেন। নারীদের অধিকার দিতে মোদি সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। বিজেপি সংসদ সদস্যরাও সংসদ প্রাঙ্গণে প্রতিবাদ জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেন, কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, ডিএমকে এবং সমাজবাদী পার্টি বিলটি পাস হতে দেয়নি। এই ঘটনায় তাদের উল্লাস তিনি নিন্দনীয় বলে অভিহিত করেন। তিনি এক্সে লিখেছেন, এখন দেশের নারীরা লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভায় ৩৩ শতাংশ সংরক্ষিত আসন পাবেন না, যা তাদের অধিকার ছিল। কংগ্রেস ও তার মিত্ররা বারবার এমন কাজ করেছে। তাদের মানসিকতা নারী বা দেশের স্বার্থে নয়।
তিনি আরও বলেন, আমি তাদের বলতে চাই, নারী শক্তির এই অপমান এখানেই থেমে থাকবে না। এটি দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়বে। ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনসহ প্রতিটি নির্বাচনে বিরোধীদের নারীদের ক্ষোভের মুখে পড়তে হবে। জবাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় রাহুল গান্ধী আবারও বলেন, এই আইনটি সংবিধানের ওপর আঘাত। তিনি বলেন, আমি সংসদে যেমন বলেছি, এটি সংবিধানের ওপর আঘাত ছিল এবং আমরা খুশি যে আমরা এটি প্রতিহত করতে পেরেছি। এটি নারী সংরক্ষণ বিল নয়, বরং ভারতের নির্বাচনী মানচিত্র বদলানোর চেষ্টা। যদি সরকার ২০২৩ সালে পাস হওয়া নারী সংরক্ষণ আইন বাস্তবায়ন করতে চায়, তাহলে বিরোধীরা শতভাগ সমর্থন দেবে।
এরপর তিনি এক্সে লিখে কেন্দ্রের পরিকল্পনাকে অসাংবিধানিক কৌশল বলে আখ্যা দেন, যা বিরোধী জোট ইন্ডিয়ার ঐক্যের কারণে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি লিখেছেন, ভারত দেখেছে। ইন্ডিয়া (জোট) এটি থামিয়েছে। কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও বলেন, নারী সংরক্ষণকে পুরোনো জনগণনার ভিত্তিতে ডেলিমিটেশনের সঙ্গে যুক্ত করা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, ওবিসিদের অন্তর্ভুক্ত না করা পুরোনো জনগণনার ভিত্তিতে নারী সংরক্ষণকে ডেলিমিটেশনের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি আমরা কখনোই মেনে নিতে পারি না। এই বিল পাস হওয়া সম্ভব ছিল না এবং আমি মনে করি এটি আমাদের গণতন্ত্র ও দেশের ঐক্যের জন্য বড় বিজয়।
এনডিটিভির সূত্র জানায়, রাহুল গান্ধী তৃণমূল কংগ্রেসের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জিকে ফোন করে বিলটি পরাজিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন। এই ফোনালাপটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জাতীয় পর্যায়ে কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেস ইন্ডিয়া জোটের অংশ হলেও, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এই নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হবে ২৩ ও ২৯ এপ্রিল।
