দীর্ঘ ১০ মাস পরও ধরাছোঁয়ার বাইরে শিশু ময়নার খুনি। উল্টো হেনস্তা ভয়ভীতি নির্যাতনের শিকার ও ইজ্জত হারিয়ে হতাশ এখন ময়নার পরিবার। তাদের প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায়। পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কর্মকাণ্ড ও ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ বলছেন ময়নার পিতা প্রবাসী আব্দুর রাজ্জাক। রাজ্জাক বলেন, কেন সাংবাদিককে কিছু বলতে ও সংবাদ সম্মেলন করতে আমাকে বারবার নিষেধ করা হচ্ছে। তার ধারণা, ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে অদৃশ্য কোনো শক্তির প্রভাবে বন্দি আছে মামলাটি। রাজ্জাকের অভিযোগের তীর এখন মোয়াজ্জিন সাইদুর রহমানের (২১) দিকে। গত ১০ মাসে সবকিছু খুইয়ে স্ত্রী, দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে অনেকটা দিশাহারা রাজ্জাক। তারপরও মৃত্যুর আগে রাষ্ট্রের কাছে সন্তানের খুনিকে দেখে যাওয়ার আকুতি জানিয়ে সর্বক্ষণ কাঁদছেন ময়নার মা-বাবা। খুনি শনাক্ত ও বিচার ধামাচাপা দিতে স্থানীয় একটি চক্রের পাশাপাশি উপরের কোনো শক্তির সহায়তার সন্দেহ করছেন রাজ্জাক। ময়নার খুনিরা তার অবশিষ্ট দুই সন্তানকে অপহরণ, হত্যা ও গুম করার শঙ্কায় ভুগছেন তিনি। তাদের বুকফাটা আর্তনাদে কাঁপছে সরাইলের শাহবাজপুর গ্রামের ছন্দু মিয়ার পাড়ার আকাশ বাতাস। সরজমিন অনুসন্ধান, মামলা ও নিহত ময়নার পারিবারিক সূত্র জানায়, বাহরাইন প্রবাসী পিতা আব্দুর রাজ্জাকের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া সন্তান শিশু মায়মুনা আক্তার ময়না (১০)কে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে খুনের ঘটনার ১০ মাস পেরিয়ে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত প্রশাসন চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার খুনিকে শনাক্ত করতে পারেনি। উল্টো বিভিন্ন ধরনের লাঞ্ছনা নির্যাতন চাপ প্রশ্ন ও অপমান অপদস্তের শিকার হচ্ছেন পরিবার। এমন অভিযোগ ময়নার পিতা আব্দুর রাজ্জাকের। তিনি জানান, এ পর্যন্ত ঘটনায় জড়িত সন্দেহে বাড়ির পাশের মসজিদের ইমাম মাওলানা হামিদুর রহমান (৪০) ও মোয়াজ্জিন মো. সাইদুর রহমান (২১)কে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠিয়েছেন পুলিশ। এ ছাড়া, আর উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি নেই মামলার। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদেরকে পাঁচদিনের রিমান্ডও মঞ্জুর করেছিলেন আদালত। দীর্ঘ প্রায় আট মাস কারাভোগের পর গত ১১ই মার্চ জামিনে এসেছেন তারা। এর আগে তাদেরকে নির্দোষ বলে জামিন করাতে আমাকে কেন চাপ দিলেন স্থানীয় মসজিদ কমিটি মুসল্লিসহ দেশের অনেক বড় বড় নেতা? এজন্য রাজ্জাককে ধর্ম উপদেষ্টার কার্যালয় পর্যন্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। সেখানে ক্যামেরা দিয়ে তার বক্তব্য রেকর্ড করার চেষ্টাও করা হয়েছে। রাজ্জাকের দাবি- এই ঘটনা মোয়াজ্জিনই ঘটিয়েছে। প্রকৃত খুনি মোয়াজ্জিনই। ইমাম হয়তো তাকে সহযোগিতা করেছে। সে আমার মেয়েকে (ময়নাকে) আদর করতো। মোয়াজ্জিনকে দেখলেই আমার রক্ত টগবগ করতো। মোয়াজ্জিনের সহযোগী কারা- তা এখনো কেন প্রশাসন বের করতে পারছেন না? ইমামের ডিএনএ টেস্টের জন্য বিছানার ছাদরসহ পরনের আগে পরের ১৫-১৬টি কাপড় নিলো। আর মোয়াজ্জিনের শুধু পরনের ২টি কাপড় নিলো কেন? আরও কাপড় নিলেন না কেন? ডিএনএ রিপোর্টে মোয়াজ্জিনের সঙ্গে ইমামের নাম ঠিক আছে। কিন্তু পরে অনেক জায়গায় মোয়াজ্জিনের নামের সঙ্গে উদয়ুজ্জামানের নাম আনলো কেন? এগুলো প্রশাসনের ব্যর্থতা। মোয়াজ্জিন কেন রাতে মসজিদের দ্বিতীয়তলার ফ্লোর সিঁড়ি ও নিজের কক্ষ ধৌত করলো। রাত ৪টার সময় একটি সিএনজি মসজিদের সামনে আসছিল লাশটা নিয়ে যেতে। ওই সিএনজির চালককে পুলিশ হয়তো শনাক্ত করতে পেরেছেন। কিন্তু তা প্রকাশ করছেন না কেন প্রশাসন। প্রশাসন আসলে কোন বা কারও চাপের মধ্যে আছে? তারা শুধু আমাকে চাপ দিচ্ছেন। প্রশাসন আমাকে বলেন, তুমি আল্লাহ্ আল্লাহ্ কর। আরেকজন বলে, তুমি ঘরে গিয়ে খোঁজো। আবার আরেকজন বলে, তুমি সাংবাদিকের কাছে যেও না। নিউজ করাইও না। দিনশেষে কথা একটাই- ধর্ষণকারী ও খুনিকে বাঁচাতে গিয়ে একশ্রেণির মানুষ সম্মিলিতভাবে ময়নার মা-বাবার ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন। নিহত ময়নার বাবা ও মা লিপা আক্তার বলেন, নিরপরাধ মানুষ দুনিয়াতে বেঁচে থাকা কঠিন। ১০টা মাস প্রশাসন আইন ও মানুষের পিছে ঘুরলাম। কিছুই হলো না। খুনিরা এখনো বহাল তবিয়তে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এখন দুই সন্তানকে নিয়ে খুবই টেনশন ও নিরাপত্তাহীনতায় আছি। আল্লাহ্ যেন মৃত্যুর আগে আমাদের ময়নার খুনিকে দেখার ভাগ্য দেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে গ্রামের একাধিক ব্যক্তি বলেন, ঘটনার পেছনে বড় কোনো ঘটনা থাকতে পারে। ময়নাদের আশপাশের প্রভাবশালী ২/১ জন লোক জড়িত থাকার বিষয়টি উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ড ও মামলাটিকে ধামাচাপা দিতে মোটা অঙ্কের টাকা ভাগ বণ্টনের বিষয়টিও চাউর হচ্ছে। মোয়াজ্জিন মো. সাইদুর রহমান বলেন, আমার বিরুদ্ধে করা সকল অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি এই ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানি না। ইমাম মাওলানা হামিদুর রহমান বলেন, এ বিষয়ে আমি শতভাগ নির্দোষ। কারণ ঘটনার দিন ও সময়ে আমি এখানে উপস্থিতই ছিলাম না। বেহুদা আটটি মাস কারাভোগ করলাম। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ব্রাহ্মণবাড়িয়া পিবিআই’র পুলিশ পরিদর্শক বেলাল উদ্দিন বলেন, আমরা খুনি শনাক্তে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। এই পর্যন্ত ২২ জনের ডিএনএ টেস্ট করেছি। খুনি অবশ্যই বের হবে। সময় লাগতে পারে। ময়নার পিতার অভিযোগ সম্পর্কে বলেন, সকল অভিযোগ সঠিক নয়। তিনি মোয়াজ্জিনকে বা অন্য কাউকেও সন্দেহ করতে পারেন। আমরা নিশ্চিত হয়ে আইনি ব্যবস্থা নেবো। তদন্ত চলমান আছে। তদন্তের স্বার্থে আমাদেরকে অনেক ধরনের কাজ করতে হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের ৫ই জুলাই বাড়ির পাশে খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হয় শাহবাজপুর লতিফ মোস্তারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী ময়না। পরের দিন ৬ই জুলাই রোববার ভোরে বাড়ির পাশের মসজিদের দ্বিতীয়তলায় বিবস্ত্র অবস্থায় মিলে ময়নার মরদেহ। ৭ই জুলাই ময়নার মা লিপা আক্তার বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে (শিশু ধর্ষণ ও খুন) সরাইল থানায় একটি মামলা করেন। কিছুদিন পরই মামলাটি চলে যায় জেলা পিবিআইয়ের কাছে। ঘটনার ১০ মাস পেরিয়ে গেলে এখনো শনাক্ত হয়নি খুনি চক্র।
১০ মাস পরও অধরা খুনি
সরাইলের চাঞ্চল্যকর শিশু ময়না হত্যা
সরাইল (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি
১৭ এপ্রিল (শুক্রবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
