ছুটির দিনেও পাম্পে দীর্ঘ লাইন
তেজগাঁও ট্রাস্ট পাম্পে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন ছবি: শাহীন কাওসার

ছুটির দিনেও পাম্পে দীর্ঘ লাইন

ফন্ট সাইজ:

সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও রাজধানীর বিভিন্ন পাম্পে ছিল দীর্ঘ লাইন। লাইনে অপেক্ষারতদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিলেন চাকরিজীবী। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের জেরে মাস দেড়েক ধরেই অস্থির দেশের তেলের বাজার। ডিজেল ও অকটেনের সংকট লেগেই আছে। ফলে পাম্পগুলোতে তেল নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন যানবাহন চালক ও মালিকরা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়া হচ্ছে বলে ঘোষণা আসার পরও রাজধানীতে ফিলিং স্টেশনগুলোয় তেলের জন্য দীর্ঘ কমেনি। শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন থাকায় পাম্পগুলোতে ভিড় করেন তারা। এরমধ্যে যারা ইতিমধ্যেই তেল দেয়ার মেশিনের সামনে এসেছেন তাদের অতিরিক্ত তেল নিতে ও বাড়তি ঝামেলা এড়াতে পাম্প কর্মীদের অতিরিক্ত পয়সা অফার করতেও দেখা গেছে।

সরজমিন রাজধানীর নীলক্ষেত, আসাদগেট, পরীবাগ, মতিঝিল সহ বিভিন্ন এলাকার তেলের পাম্পগুলো ঘুরে দেখা যায়, প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল নিয়ে চালকরা তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। কোথাও কোথাও সে লাইন কয়েক কিলোমিটার ছাড়িয়ে গেছে। তবে লাইনে অপেক্ষারত অধিকাংশই ছিলেন চাকরিজীবী। চৈত্রের তীব্র দাবদাহে প্রচণ্ড গরমের কারণে অনেকে গাড়ি সড়কে রেখে পাশে ফুটপাথের ছায়ায় আশ্রয় নেন। এদের মধ্যে কেউ সময় কাটানোর জন্য মোবাইলে লুডু খেলছেন আবার কেউ গেম খেলছেন। প্রচণ্ড গরমে তেলের জন্য অপেক্ষা করতে করতে অনেকে ক্ষুব্ধ, বিরক্ত।

মতিঝিল মেঘনা ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, তেল নিতে আসা মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ সিরিয়াল। ৩ ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরও অনেকে এখানে তেল পাননি। অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছেন অনেকে, জুমার নামাজও ঠিকমতো পড়তে পারেননি। অনেকে পাম্পকর্মীকে বাড়তি টাকা দিয়ে ১০০০ টাকার তেল নিচ্ছেন। একই চিত্র দেখা যায় পাশেই রহমান ফিলিং স্টেশনে। তবে এখানে অক্টেন ও ডিজেল শেষ হয়ে যাওয়ায় শুধুমাত্র পেট্রোল বিক্রি করা হচ্ছিল। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা চালকরা যারা বাড়তি টাকা দিয়ে তেল নেয়ার দৃশ্য দেখেছেন- অনুকরণ করে কানে কানে কেউ চোখ দিয়ে ইশারা দিয়ে বাড়তি টাকা দিয়ে ১০০০ টাকার তেল নিচ্ছেন।

মতিঝিল রহমান ফিলিং স্টেশনে সাড়ে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর তেল পেয়েছেন রবিন হোসেন। তিনি বলেন, আমি একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে জব করি। অফিস থাকায় অন্যদিনগুলোতে তেল নিতে পারি না। আজ ছুটির দিন থাকায় এসেছি তেল নিতে। সকাল ১১টায় লাইনে দাঁড়িয়ে তেল পেয়েছি দুইটার দিকে। এর মধ্যে প্রচণ্ড গরমে নাভিশ্বাস অবস্থা। আজকে ছুটির দিন থাকায় অফিস নিয়ে চিন্তা করতে হয়নি। কিন্তু অন্যান্য দিনে তো এইভাবে লাইনে অপেক্ষা করতে হলে চাকরি থাকবে না। তাই রিকোয়েস্ট করে পাম্পকর্মীকে কিছু টাকা দিয়ে ১০০০ টাকার তেল নিয়েছি, এই তেল দিয়ে এক সপ্তাহ চলতে পারবো। কবে পরিস্থিতি ঠিক হবে জানি না।

বেলা সাড়ে ১১টায় লাইনে দাঁড়িয়ে দুপুর ১টা পর্যন্ত তেল পাননি বেসরকারি কর্মকর্তা মনসুর আলী। প্রচণ্ড গরমে হাঁসফাঁস করছিলেন তিনি। গরম থেকে কিছুটা বাঁচতে তার মেয়ে মাথায় ছাতা ধরে রেখেছিলেন। তিনি বলেন, আজ অফিস ছুটি তাই বাজার করতে মেয়েকে নিয়ে বের হয়েছি। বাজার শেষ করে পাম্পে এসে দেখি দীর্ঘ লাইন। এইভাবে আর কয়দিন চলবে। অফিস করবো নাকি তেলের পেছনে দৌড়াবো? মানুষের ইনকাম কমে গেছে, কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। যুদ্ধ বন্ধ হয়েছে ভেবেছিলাম পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে কিন্তু এসে দেখি উল্টো।

পরীবাগের মেঘনা ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে চালকরা ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর তেল নিতে পারছেন। তেল নিতে লাইন পরীবাগ থেকে কাঁটাবন সিগন্যাল পর্যন্ত চলে গেছে। এখানে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রি চলছে। তবে সরবরাহ ঘাটতি থাকায় পাশেই পূর্বাচল ট্রেডার্সে ও দৈনিক বাংলা মোড়ের বিনিময় ফিলিং স্টেশনে বন্ধ ছিল তেল বিক্রি। সেখানে কেবল সিএনজি বিক্রি করতে দেখা গেছে। নীলক্ষেতের পথের বন্ধু ফিলিং স্টেশনের বাইকারদের লাইন ছিল নীলক্ষেত থেকে পলাশী পর্যন্ত। শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর নীলক্ষেত মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে নিউমার্কেট-মুখী সড়কের আইল্যান্ড ঘেঁষে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে গোলাপি রঙের ‘ভিআইপি’ বাস। পাশের পেট্রোল পাম্প থেকে তেল নেয়ার অপেক্ষায় বাসগুলো রাখা হয়েছে। পাম্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা জানান, কিন্তু এই মুহূর্তে আমাদের কাছে কোনো মজুত নেই। বিকাল বা আগামীকাল সরবরাহ এলে তারা তেল পাবেন।

পরীবাগে তেল নিতে আসা আনিসুজ্জামান বলেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে তেল নিতে হয়েছে। সরকার বলছে তেলের সংকট নেই অথচ পাম্পগুলোতে তেলের সংকট। তেলের পেছনে দৌড়াবো নাকি চাকরি করবো। প্রতিদিন ৪ ঘণ্টা সময় পাম্পে নষ্ট হচ্ছে। মোটরসাইকেল ঘরে তুলে রাখবো এইভাবে আর চলে না। আমাদের ইনকাম অর্ধেকে নেমে এসেছে। যুদ্ধ করে তেল নিতে হচ্ছে। এখানে সিরিয়াল হাতিরপুল পর্যন্ত চলে গেছে।
নীলক্ষেতের একটি পাম্পে অপেক্ষমাণ আরেক বাসচালক সেলিম মিয়া বলেন, ‘গত রাত থেকেই লাইনে আছি। পরশু এক ট্রিপ দেওয়ার পর তেল শেষ হয়ে গেছে। এরপর অনেক পাম্পে ঘুরেও তেল পাইনি, উল্টো রিজার্ভে যা ছিল তাও শেষ হয়ে গেছে।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন