ওয়াশ খাতে বরাদ্দ বাড়লেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন মেটেনি: পিপিআরসি-ওয়াটারএইড

ওয়াশ খাতে বরাদ্দ বাড়লেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন মেটেনি: পিপিআরসি-ওয়াটারএইড

ফন্ট সাইজ:

পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) খাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দ বেড়েছে, তবে তা এখনো দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয় বলে জানিয়েছে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ওয়াটারএইড বাংলাদেশ।

বুধবার ঢাকায় আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে পিপিআরসি ও ওয়াটারএইড বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত “WASH Sector ADP Allocation FY2026-27: Haor, Char Left Behind, Budget Misses Equity Targets” শীর্ষক নীতি সংক্ষিপ্তে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।

বিশ্লেষণে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)-তে ওয়াশ খাতে বরাদ্দ এবং এর মাধ্যমে এসডিজি ৬, ১০, ১৩ ও ১৭-এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনা পর্যালোচনা করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত তিন অর্থবছরে ওয়াশ এডিপি বরাদ্দে যে নিম্নমুখী প্রবণতা ছিল, তা এবার কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১০ হাজার ৯০১ কোটি টাকা থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ওয়াশ খাতে বরাদ্দ বেড়ে হয়েছে ১৩ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা, যা প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি।

তবে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই বৃদ্ধি ২০২২-২৩ অর্থবছরের সর্বোচ্চ ১৮ হাজার ২২৮ কোটি টাকার বরাদ্দের তুলনায় এখনো কম। পাশাপাশি জাতীয় বাজেটের সামগ্রিক বৃদ্ধি ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং মোট এডিপি বৃদ্ধি ৩ দশমিক ১৬ শতাংশ হলেও ওয়াশ খাতের অংশ বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশ।

ওয়াটারএইড বাংলাদেশের পলিসি অ্যাডভোকেসি প্রধান অ্যাডভোকেট ফাইয়াজউদ্দিন আহমদ বলেন, “নিরাপদ পানি ও নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপিত স্যানিটেশন থেকে এখনো প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী বঞ্চিত। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নীতিগত উদ্যোগগুলোকে কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে মানুষের জন্য বাস্তব সেবায় রূপান্তর করা।”

শহরকেন্দ্রিক বরাদ্দ, গ্রামীণ এলাকায় ঘাটতি

বাজেট-ট্র্যাকিং বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ওয়াশ বরাদ্দে শহরকেন্দ্রিক প্রবণতা এখনো বিদ্যমান। মোট ওয়াশ এডিপি বরাদ্দের প্রায় ৭২ শতাংশ যাচ্ছে শহরাঞ্চলে, যেখানে গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় সেবার ঘাটতি বেশি।
চারটি পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষের (ওয়াসা) বরাদ্দ ৩ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৬ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা ওয়াসা একাই পেয়েছে ৫ হাজার ১০ কোটি টাকা, যা মোট ওয়াশ বরাদ্দের প্রায় ৩৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

অন্যদিকে গ্রামীণ এলাকায় ওয়াশ সেবার প্রধান প্রতিষ্ঠান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) বরাদ্দ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৩ হাজার ৪২৭ দশমিক ৮৫ কোটি টাকা থেকে কমে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২ হাজার ৪০৮ দশমিক ১৯ কোটি টাকা হয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশের প্রায় ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ এখনো নিরাপদ খাবার পানির সুবিধা থেকে এবং ৬০ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপিত স্যানিটেশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
হাওর ও চরাঞ্চল বাজেটে পিছিয়ে

দুর্গম ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর ক্ষেত্রে বাজেটে মিশ্র চিত্র পাওয়া গেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের বরাদ্দ ২০৬ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা হয়েছে। তবে হাওর এলাকার জন্য আলাদা কোনো বরাদ্দ দেখা যায়নি। একই সঙ্গে লবণাক্ততা ও জলবায়ু ঝুঁকি বাড়লেও উপকূলীয় এলাকার বরাদ্দ কমেছে এবং চরাঞ্চলও বাজেট কাঠামোয় পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি।

জলবায়ু অভিযোজন ও এফএসএম খাতে অগ্রগতি

নীতিপত্রে ওয়াশের কয়েকটি উপ-খাতে ইতিবাচক অগ্রগতির কথাও বলা হয়েছে। জলবায়ু অভিযোজন ও ঝুঁকি হ্রাস খাতে বরাদ্দ বেড়ে ৩ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা হয়েছে। ফিক্যাল স্লাজ ম্যানেজমেন্ট (এফএসএম) খাতে বরাদ্দ ১ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা হয়েছে। সক্ষমতা বৃদ্ধির বরাদ্দও ৯১৬ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৩৩৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

তবে হাইজিন খাত এখনো পৃথকভাবে পর্যাপ্ত গুরুত্ব পাচ্ছে না বলে প্রতিবেদনে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। এ খাতে আলাদা ও ট্র্যাকযোগ্য বাজেট লাইন চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।

মূল কৌশলগত সুপারিশ

উল্লিখিত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নেটওয়ার্ক অব ওয়াশ নেটওয়ার্কস বাজেট চূড়ান্তকরণ ও বাস্তবায়নের আগে নিম্নোক্ত জরুরি নীতি পদক্ষেপের সুপারিশ করেছে: ১. গ্রামীণ ওয়াশ অর্থায়ন শক্তিশালী করা: গ্রামীণ ওয়াশ সেবা প্রদানের জন্য, বিশেষত ডিপিএইচই ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে, বরাদ্দ বৃদ্ধি ও সুরক্ষিত করতে হবে, যাতে দরিদ্র গ্রামীণ পরিবার ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী পর্যাপ্ত বিনিয়োগ পায়।

২. জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ ওয়াশ অর্থায়নের পৃথক উইন্ডো গঠন: উপকূলীয় অঞ্চল, চর, হাওর, পার্বত্য এলাকা ও খরা-প্রবণ অঞ্চলের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্গম এলাকার জন্য নির্দিষ্ট অর্থায়ন লাইন সংরক্ষণ করতে হবে।

৩. ফিক্যাল স্লাজ ম্যানেজমেন্ট ও বর্জ্য পানি ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাড়ানো: বিশেষত দ্রুত নগরায়ণশীল এলাকায় জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলায় এফএসএম, শোধনাগার সুবিধা এবং বর্জ্য পানি ব্যবস্থাপনায় অর্থায়ন বাড়াতে হবে।

৪. ওয়াশ নগদ সহায়তা চালু করা: ফ্যামিলি কার্ড বা হেলথ কার্ড ব্যবস্থার মাধ্যমে অতিদরিদ্র পরিবারকে রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং ট্যাংক, টিউবওয়েল, মৌলিক ল্যাট্রিন উন্নয়ন ও পিট ব্যবস্থাপনার জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দিতে হবে।

৫. স্থানীয় সরকার, বিশেষত ইউনিয়ন পরিষদকে সক্ষম করা: পানির উৎস, স্যানিটেশন সুবিধা ও জলবায়ু-সহনশীল কমিউনিটি ব্যবস্থাসহ ওয়াশ অবকাঠামো পরিকল্পনা, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইনগত ও আর্থিকভাবে ক্ষমতায়ন করতে হবে।

৬. স্কুল ওয়াশ ব্লক সম্প্রসারণ: সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জেন্ডার-বান্ধব টয়লেট, ঋতুকালীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ পানির সুবিধার জন্য পৃথক প্রাতিষ্ঠানিক বাজেট নিশ্চিত করতে হবে।

৭. খাল খননকে সারফেস ওয়াটার পুনরুদ্ধারে রূপান্তর: সাতক্ষীরার গাবুরা ইউনিয়নের মতো উচ্চ লবণাক্ততা অঞ্চলে, যেখানে ভূগর্ভস্থ পানি ক্রমশ ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ছে, প্রচলিত খাল খননধর্মী জনকাজকে জলবায়ু-সহনশীল সারফেস ওয়াটার পুনরুদ্ধার ব্যবস্থায় উন্নীত করতে হবে।

৮. হাইজিনকে ওয়াশ অর্থায়ন এজেন্ডায় ফিরিয়ে আনা: স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নীতি অগ্রাধিকার উন্নত করতে হাইজিন প্রচার ও আচরণ পরিবর্তনের জন্য পৃথক ও দৃশ্যমান বাজেট লাইন চালু করতে হবে এবং পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন বরাদ্দ আলাদাভাবে ট্র্যাক করতে হবে।

বিশ্লেষণের বিষয়ে পিপিআরসি’র নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘বরাদ্দ এক জিনিস, আর বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার আরেক জিনিস। মনিটরিং, তথ্য এবং ওয়াশের জন্য আলাদা বাজেট কোড ছাড়া জবাবদিহিতা দুর্বল থেকে যায়। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা বড় ওয়াশ প্রকল্প এবং পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে পারফরম্যান্স ব্যর্থতার বিষয়টি জোরালোভাবে সামনে আনতে হবে।’

প্রেস ব্রিফিংয়ে ওয়াশ খাতের নেটওয়ার্ক, নাগরিক সমাজ সংগঠন, উন্নয়ন সহযোগী ও খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে ছিল ফিক্যাল স্লাজ ম্যানেজমেন্ট নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ ওয়াটার ওয়ার্কস অ্যাসোসিয়েশন, কোয়ালিশন ফর দ্য আরবান পুওর, বাংলাদেশ ওয়াটার ইন্টেগ্রিটি নেটওয়ার্ক, ফ্রেশওয়াটার অ্যাকশন নেটওয়ার্ক সাউথ এশিয়া, এন্ড ওয়াটার পভার্টি এবং ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার অ্যাসোসিয়েশন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন