বেনাপোল স্থলবন্দরে দিন দিন বাড়ছে শুল্ক ফাঁকির ঘটনা

ফন্ট সাইজ:

যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরে মিথ্যা ঘোষণার আড়ালে উচ্চ শুল্কের পণ্য আমদানির ঘটনা যেন এখন নিয়মিত চিত্রে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ ‘সিন্থেটিক ফেব্রিক্স’ ঘোষণার আড়ালে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় শাড়ি ও থ্রি-পিস জব্দের ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে বন্দরের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, তদারকি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিয়ে। গত তিনদিনে ৪টি শুল্ক ফাঁকির ঘটনা প্রকাশ্যে আসায় বন্দরের ট্রাফিক ব্যবস্থা এবং শুল্ক নির্ধারণকারী কর্তৃপক্ষের অবহেলা বা অপারগতাকে দায়ী করছেন কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।

কাস্টমস সূত্র জানায়, ঢাকার ‘নুসরাত ট্রেডিং’ ভারত থেকে সিন্থেটিক ফেব্রিক্স আমদানির ঘোষণা দিয়ে গত রোববার বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করে। মেসার্স খাজা এন্টারপ্রাইজ নামের একটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এই পণ্য চালানটি খালাসের দায়িত্বে ছিল। বন্দরের ১৯নং শেড থেকে পণ্য চালানের শুল্কায়ন করে পণ্যটি খালাসের অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু গোপন সূত্রে খবর পেয়ে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ অভিযান চালিয়ে দেখতে পান, ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব পণ্যের কোনো মিল নেই। ফেব্রিক্সের আড়ালে লুকানো ছিল বিপুল পরিমাণ উচ্চ শুল্কের পণ্য। বেনাপোল কাস্টম হাউজের সহকারী কমিশনার রাহাত হোসেন জানান, মিথ্যা ঘোষণার অভিযোগে পণ্যগুলো সাময়িকভাবে আটক করা হয়েছে। বর্তমানে শতভাগ কায়িক পরীক্ষার কাজ চলছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এই পণ্য চালানের মাধ্যমে যে পরিমাণ শুল্ক ফাঁকির ঘটনা ঘটানো হয়েছিল তার পরিমাণ কমপক্ষে ৫০ লাখ টাকা। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে অনিয়মের ধারাবাহিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গত ১৪ মার্চ ‘ব্রেকিং পাউডার’ ঘোষণার আড়ালে প্রায় ৬ কোটি টাকার পণ্য উদ্ধার করা হয়। ৯ই মার্চ ‘ঘাসের বীজ’ ঘোষণার চালান থেকে প্রায় ৩০ লাখ টাকা মূল্যের নিষিদ্ধ পাট বীজ উদ্ধার করা হয়। ১৮ই জানুয়ারি মোটরপার্টসের ঘোষণার বাইরে প্রায় ৫০ লাখ টাকার অতিরিক্ত পণ্য পাওয়া যায়। এমনকি গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে প্রায় আড়াই কোটি টাকার একটি চালান বন্দরের নিরাপত্তা স্তর অতিক্রম করে বাইরে চলে যায়, যা পরে বিজিবি আটক করে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়, বরং একটি সুসংগঠিত অনিয়মের অংশ।
বেনাপোল বন্দর সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দাবি করেন, বেনাপোল বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে, যারা নিম্ন শুল্কের পণ্যের আড়ালে উচ্চ শুল্কের পণ্য আমদানি করে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছে। এই চক্রের সঙ্গে বন্দরের পরিচালক এবং তার নেতৃত্বে কিছু শেড ইনচার্জের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ বহুবার উঠেছে। বিশেষ করে ৩৭ নম্বর শেডের ইনচার্জ নুর উদ্দিন লিংকন, ১৫ নম্বর শেডের সন্দ্বীপ, ১৯নং শেড ইনচার্জ সোহেল রানা, ৪১ নম্বর শেডের রুহুল আমিন, ২৭ নম্বর শেডের কে এম নাহিদুজ্জামান এবং সহকারী শেড ইনচার্জ ইউসুফ হোসেনের নাম বিভিন্ন ঘটনায় ঘুরে ফিরে আসছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত অভিযোগের পরও তারা বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

অভিযোগ রয়েছে, বন্দরে আধুনিক স্ক্যানার থাকা সত্ত্বেও তা নিয়মিত ব্যবহার করা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে শুধুমাত্র কাগজপত্র যাচাই করেই পণ্য ছাড় দেয়া হচ্ছে, ফলে বাস্তবে পণ্যের প্রকৃতি যাচাই করা হচ্ছে না। এতে করে শুল্ক ফাঁকির সুযোগ তৈরি হচ্ছে বারবার। এ ছাড়া প্রশাসনিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। সহকারী শেড ইনচার্জ ইউসুফ হোসেনের বদলি আদেশ থাকলেও তিনি এখনো বেনাপোলে দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে বন্দর পরিচালক শামীম হোসেনের বদলির আদেশ থাকলেও তা কার্যকর হয়নি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতে করে জবাবদিহির অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এবং প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। অভিযোগের বিষয়ে বন্দর পরিচালক শামীম হোসেন বলেন, মিথ্যা ঘোষণার কিছু ঘটনা ঘটেছে, তবে অনেক ক্ষেত্রে ঘোষণাকৃত পণ্যই সঠিক পাওয়া গেছে। তিনি আরও বলেন, আমি বদলি হয়েছি, কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণ করার মতো কর্মকর্তা না থাকায় এখনো দায়িত্বে আছি। এ প্রসঙ্গে আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মো. মতিয়ার রহমান বলেন, বেনাপোল স্থলবন্দর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার। এখানে অনিয়ম চলতে থাকলে শুধু রাজস্ব ক্ষতিই নয়, পুরো বাণিজ্য ব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমরা চাই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হোক। তিনি আরও বলেন, বন্দরের কার্যক্রম আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করা, স্ক্যানিং ও মনিটরিং জোরদার করা এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গেলে এ ধরনের সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন