বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতায় জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় শিক্ষাখাত হতে পারে সবচেয়ে বড় সামাজিক আন্দোলনের সূতিকাগার

বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতায় জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় শিক্ষাখাত হতে পারে সবচেয়ে বড় সামাজিক আন্দোলনের সূতিকাগার

ফন্ট সাইজ:

বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার ফলে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তেল ও গ্যাসের দামের উত্থান-পতন, সরবরাহ চেইনের বিঘ্ন এবং অপ্রত্যাশিত সংকট এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিশেষভাবে হুমকিস্বরূপ। আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো এ ধরনের সংকটের ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি থাকে। ফলে জ্বালানি সরবরাহে চাপ পড়ছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এই বাস্তবতায় কেবল নতুন জ্বালানি উৎস খোঁজা নয়, বরং সাশ্রয়ী ও টেকসই ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। ঢাকা শহরসহ দেশের প্রধান শহরগুলোতে যানজটের কারণে যে হারে জ্বালানি অপচয় হয়, তা নির্দেশ করে যে শিক্ষাখাত এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। যানজটের সময় যদি আমরা শিক্ষা খাতের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনি, তাহলে যারা এই যানজটের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক এবং সাপোর্টিং স্টাফ তাদের চলাচলের সময়টা বিকল্প করে দিলে রাস্তায় চাপ অনেকাংশে কমে যাবে।

আমাদের দুটি ছুটির দিন যেখানে সাধারণত নিয়মিত অফিস-বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ থাকে সেই দিনগুলোতে যদি শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়, তাহলে বিশালসংখ্যক শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যানজটের সময় রাস্তায় নামবেন না। ফলে প্রচুর জ্বালানি অপচয় রোধ করা সম্ভব হবে। একইভাবে, যেদিন তারা ক্যাম্পাসে আসবেন সেদিন যদি একটানা লম্বা সময় ধরে শিক্ষাদান করা হয় এবং পরের দিন তাদের ছুটি দেওয়া হয়, তাহলে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কমবে, যানজট হ্রাস পাবে এবং জ্বালানি সাশ্রয় হবে। এছাড়া ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে জ্বালানি সাশ্রয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে যাতে তারা নিজেরাই বিভিন্ন জায়গায় এই সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জ্বালানি সাশ্রয়ের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে শিক্ষাখাত। কারণ দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মিলিয়ে ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক এবং সাপোর্টিং স্টাফসহ প্রায় পাঁচ কোটিরও বেশি মানুষ সরাসরি এই খাতের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রতিদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সক্রিয় থাকে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে যদি জ্বালানি সাশ্রয়ের বিষয়ে সচেতন ও সম্পৃক্ত করা যায়, তবে তা সহজেই একটি শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হতে পারে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল জ্ঞান অর্জনের স্থান নয়; এটি নাগরিক সচেতনতা তৈরির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। তাই পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে জ্বালানি সাশ্রয়, পরিবেশ সচেতনতা এবং টেকসই জীবনধারার ধারণা গড়ে তোলা জরুরি। ছোটোবেলা থেকেই যদি তারা বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং অন্যান্য জ্বালানি ব্যবহারে সংযমের অভ্যাস গড়ে তোলে, তবে সেটি ভবিষ্যতে সমাজের বিভিন্ন স্তরে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই উদ্যোগ শুরু করা যেতে পারে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব স্তরে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জ্বালানি ব্যবহারের একটি স্বচ্ছ হিসাব রাখা যেতে পারে। যেমন প্রতিদিন বা প্রতি মাসে কত বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়েছে এবং সাশ্রয়ের মাধ্যমে কতটা কমানো সম্ভব হয়েছে তা লিপিবদ্ধ করা। যদি এই সাশ্রয়ের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বীকৃতি বা পুরস্কার দেওয়া হয়, তবে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি ইতিবাচক প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। এতে শুধু বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী নয়, বরং সচেতনতার সংস্কৃতিও গড়ে উঠবে।

জ্বালানি সাশ্রয়ের ক্ষেত্রে কিছু বাস্তবধর্মী পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সময়সূচি এমনভাবে নির্ধারণ করা যেতে পারে যাতে দিনের স্বাভাবিক আলো ও তুলনামূলক শীতল সময়কে কাজে লাগানো যায়। এতে অতিরিক্ত কৃত্রিম আলো বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন কমবে। পাশাপাশি ধীরে ধীরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সৌরশক্তি ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো গেলে সেটি দীর্ঘমেয়াদে একটি টেকসই সমাধান হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা যায়, অনেক বড় সামাজিক আন্দোলনের সূচনা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে। তাই এই উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। যদি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে জ্বালানি সাশ্রয়ের একটি সংগঠিত উদ্যোগ শুরু হয়, তবে তা দ্রুত অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে পুরো সমাজে একটি নতুন সচেতনতার সংস্কৃতি তৈরি হতে পারে।তবে এই ধরনের উদ্যোগ সফল করতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত প্রচেষ্টা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, নীতিনির্ধারক এবং সরকারের সমর্থন একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ব্যাপক প্রচার, সচেতনতা কর্মসূচি এবং নীতিগত সহায়তা ছাড়া এই আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী হবে না। সরকার যদি শিক্ষাখাতকে জ্বালানি সাশ্রয়ের একটি জাতীয় উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে অল্প সময়ের মধ্যেই এর দৃশ্যমান ফল পাওয়া সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিক্ষাখাতকে শক্তিশালী রাখা। কারণ এই খাত থেকেই তৈরি হয় ভবিষ্যতের দক্ষ জনশক্তি এবং দায়িত্বশীল নাগরিক। তাই জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্যোগ গ্রহণের সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে কোনোভাবেই দুর্বল করা যাবে না। বরং এটিকে আরও কার্যকর ও উদ্ভাবনী করে তুলতে হবে।

বর্তমান জ্বালানি সংকটকে আমরা চাইলে একটি সুযোগে রূপ দিতে পারি। এই সংকট আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে কীভাবে আমরা কম জ্বালানি ব্যবহার করে টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে পারি। শিক্ষাখাতকে কেন্দ্র করে যদি একটি জ্বালানি সাশ্রয় আন্দোলন গড়ে ওঠে, তবে তা শুধু সংকট মোকাবিলায় সহায়তা করবে না, বরং বাংলাদেশের জন্য একটি দায়িত্বশীল ও টেকসই ভবিষ্যতের পথও তৈরি করবে। বিশ্বের বিভিন্ন সংকট থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি যে, সঠিক সময়ে সঠিক উদ্যোগ নিলে সংকটকে সাফল্যে রূপান্তর করা সম্ভব। বাংলাদেশ যদি শিক্ষাখাতকে এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখে, তাহলে বিশ্ব সংকটকে জাতীয় সাফল্যের উদাহরণে পরিণত করা যাবে। এটি শুধু জ্বালানি সাশ্রয় নয়, বরং একটি নতুন প্রজন্মকে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলারও সুযোগ। সময় এসেছে এই সুযোগকে কাজে লাগানোর। শিক্ষাঙ্গণ থেকে শুরু করে পুরো সমাজে যদি এই সচেতনতা ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে জ্বালানি সংকট আর কেবল সমস্যা থাকবে না হয়ে উঠবে একটি শক্তিশালী পরিবর্তনের সূচনা। এই আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা দেখাতে পারব যে, ছোট ছোট পদক্ষেপই বড় পরিবর্তন আনতে পারে এবং বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে একটি টেকসই উন্নয়নের মডেল হয়ে উঠতে পারে।

লেখক: অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।