সরকারের ৪২ দিনে একটি মানুষও গুম-ক্রসফায়ারের শিকার হয়নি: আইনমন্ত্রী

সরকারের ৪২ দিনে একটি মানুষও গুম-ক্রসফায়ারের শিকার হয়নি: আইনমন্ত্রী

ফন্ট সাইজ:

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে ‘বিরোধী দল ও মত দমন কমিশন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। এই আইনটি জাতিকে সামনের দিকে নেয়ার বদলে পিছিয়ে দেবে বলে দাবি করেন তিনি। তার এই বক্তব্যকে রাজনৈতিক ময়দানের জন্য ‘জুসি’ বা রসালো আখ্যায়িত করেছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল-২০২৬’ উত্থাপনের পর এর ওপর আপত্তি এবং পাল্টা জবাবে এসব কথা বলেন তারা। এর আগে বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী। অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ সভাপতিত্ব করেন।

‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল-২০২৬’ উত্থাপনের পর এর ওপর আপত্তি জানিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে ‘বিরোধী দল ও মত দমন কমিশন’। ২০০৯ সালের মানবাধিকার কমিশন আইন পুনঃপ্রচলনের বিরোধিতা করেন তিনি।
বিলের বিরোধিতা করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, আজকের এই সংসদটি যে কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যারা এখানে এসেছেন তারা একটি ক্রান্তিকালীন সময় পার করে এসেছেন। অথচ জাতির গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে আলোচনার জন্য আমাকে মাত্র ২ মিনিট সময় দেয়া হয়েছে, যা অত্যন্ত অপ্রতুল। আমরা সংসদে অনেক বিষয়ে সময় অপচয় করি, কিন্তু এমন মৌলিক বিষয়ে সময় না দেওয়াটা দুঃখজনক।

২০০৯ সালের আইনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এই বিল পাসের মাধ্যমে ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনটিকে রিস্টোর (পুনঃপ্রচলন) করা হচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে আমরা দেখেছি, এই কমিশনকে বিরোধী দল ও মত দমনে ব্যবহার করা হয়েছে। বিএনপিকে দমন করার বৈধতা দিয়েছে এই কমিশন। এমনকি আমরা কমিশনের চেয়ারম্যানকে বলতে শুনেছি মানবাধিকার রক্ষার স্বার্থে জামায়াত নেতাকর্মীদের গুলি করা বৈধ।

তিনি বলেন, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশটিকে ল্যাপস (বিলুপ্ত) করে ২০০৯ সালের আইনে ফিরে যাওয়া হবে এই সংসদের জন্য একটি ব্যাকওয়ার্ড মুভ বা পশ্চাৎমুখী পদক্ষেপ। এটি জাতি পিছিয়ে পড়ার একটি টেক্সটবুক এক্সাম্পল হয়ে থাকবে।
কমিশনের সিলেকশন কমিটির গঠন নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও বলেন, কমিশন গঠনের জন্য যে ৬ সদস্যের সিলেকশন কমিটি রয়েছে, সেখানে ৫ জনই সরকারদলীয় ব্যক্তি। স্পিকারের নেতৃত্বে সেই কমিটিতে থাকেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, সরকারি দলের একজন এমপি ও একজন সচিব। এমন কমিটির মাধ্যমে গঠিত কমিশন কীভাবে নিরপেক্ষ কাজ করবে? মূলত এটি একটি সরকারি দপ্তর বা বিরোধী দল দমন কমিশনে পরিণত হয়েছে।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তে সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, যেখানে বাহিনীগুলো সরাসরি মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত থাকে, সেখানে ২০০৯ সালের আইন অনুযায়ী তদন্ত করতে বাহিনীর বা সরকারের পূর্বানুমতি লাগে। সরকার নিজেই যেখানে মানবাধিকার ক্ষুণ্ন করবে, সেখানে তাদের অনুমতি নিয়ে কতটা স্বচ্ছ তদন্ত সম্ভব, তা এ সংসদের সবার জানা। ওদিকে আইনমন্ত্রী উত্থাপন করলে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে তীব্র আপত্তি জানানো হয়।
জবাবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যকে রাজনৈতিক ময়দানের জন্য ‘জুসি’ বা রসালো আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, মাননীয় সংসদ সদস্য সবকিছুই পড়েছেন, কিন্তু প্রস্তাবিত বিলের প্রথম লাইনটিই পড়েননি।

আইনমন্ত্রী বলেন, মাননীয় সংসদ সদস্য খুব সুন্দর সুন্দর বক্তৃতা দিয়েছেন। উনার এই বক্তৃতাগুলো পল্টন ময়দান, প্রেসক্লাব বা ঢাকা রাজপথের মুক্তাঙ্গনের জন্য অনেক বেশি জুসি এবং প্রাসঙ্গিক। তবে সংসদে বিল পাসের ক্ষেত্রে আইন পাঠ করা জরুরি। আমার মনে হয় উনি সব পড়েছেন, শুধু বিলটা পড়েননি।
মন্ত্রী বলেন, বিলের প্রথম লাইনেই দেয়া আছে- ২০২৫ সালের মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আরও পরামর্শ ও যাচাই-বাছাই প্রয়োজন। যাতে এই সময়টায় মানবাধিকার কমিশনের জায়গাটা ফাঁকা না থাকে, সেই কারণে আমরা সাময়িকভাবে ২০০৯ সালের আইনটাকে রেস্টোর (পুনঃপ্রচলন) করেছি। কেউ যাতে বলতে না পারে বাংলাদেশে কোনো মানবাধিকার কমিশন নাই।
২০২৫ সালের অধ্যাদেশটির সমালোচনা করে আইনমন্ত্রী আরও বলেন, এই অধ্যাদেশটি একটি অসৎ উদ্দেশ্যে (এটেরিয়র মোটিভ) করা হয়েছিল। এর ১৬ ধারাটি পড়লে দেখা যাবে এটি ভিকটিমের জন্য আরেকটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমান। এতে জরিমানা বা ক্ষতিপূরণের কোনো সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন নেই। এমন অস্পষ্ট আইন জনস্বার্থ বিরোধী।
বর্তমান সরকারের মানবাধিকার রেকর্ড তুলে ধরে তিনি বলেন, এই সরকারের বয়স ৪২ দিন। এই ৪২ দিনে একটি মানুষও ক্রসফায়ারের শিকার হয়নি, একটি মানুষও গুমের শিকার হয়নি। আমরা চাই না দেশে আর কোনো গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংস্কৃতি থাকুক।
হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যের জবাবে আইনমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সবচেয়ে বড় শিকার জিয়া পরিবার ও বিএনপি পরিবার। তাই এই সরকার মানবাধিকার রক্ষা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বেশি আন্তরিক।

আইনমন্ত্রী বলেন, এই সরকারের বয়স প্রায় ৪২ দিন। সরকার চাইলে প্রতিহিংসার রাজনীতি করতে পারত। কিন্তু এই ৪২ দিনে বাংলাদেশের একটি মানুষও ক্রসফায়ারের শিকার হয়নি, একটি মানুষও গুমের শিকার হয়নি। মানবাধিকারের রেকর্ডই বলে দিচ্ছে আমরা কোন পথে হাঁটছি।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার সবচেয়ে বড় পরিবার হলো জিয়া পরিবার ও বিএনপি পরিবার। আমাদের সামনে যারা বসে আছেন, তাদের অনেকেই গত ১৭ বছর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন। আমরা চাই না বাংলাদেশে আর কোনো মা-বোনকে জায়নামাজে বসে সন্তানের প্রতীক্ষায় চোখের জল ফেলতে হোক।

মানবাধিকার কমিশন বিলের বিষয়ে মন্ত্রী ব্যাখ্যা করেন, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশটি তড়িঘড়ি করে করা হয়েছিল, যাতে অনেক আইনি অসংগতি রয়েছে। বিশেষ করে ১৬ নম্বর ধারায় ক্ষতিপূরণ বা জরিমানার বিষয়ে কোনো স্পষ্ট গাইডলাইন নেই। তাই স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ ও শক্তিশালী আইন করার লক্ষ্যেই ২০২৫ সালের অধ্যাদেশটি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আর এই অন্তর্বর্তী সময়ে দেশে যাতে মানবাধিকার কমিশনের আইনি শূন্যতা তৈরি না হয়, সেজন্যই সাময়িকভাবে ২০০৯ সালের আইনটি ফিরিয়ে আনা হয়েছে।



কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন