বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে জয়শঙ্করের বৈঠক, শেখ হাসিনাকে ফেরত চায় ঢাকা

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্ট

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে জয়শঙ্করের বৈঠক, শেখ হাসিনাকে ফেরত চায় ঢাকা

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালকে জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি অনুসরণ করবে। এই নীতি ‘পারস্পরিক আস্থা, সম্মান এবং পারস্পরিক লাভের’ ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই বৈঠকে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়েছে ঢাকা। এতে বলা হয়, দিল্লি চায় দুই দেশের মধ্যে সংযোগ প্রকল্পগুলো এগিয়ে নিতে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে।

বুধবার সরকারি বিবৃতিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আবারও ‘শেখ হাসিনা এবং তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের’ অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাদের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বছরের আগস্ট থেকে দিল্লিতে অবস্থান করছেন। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ ভারতের কাছে ডিজেল ও সার সরবরাহ বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে।

দিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, জয়শঙ্কর ‘নতুন সরকারের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করার এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার’ ভারতের আগ্রহ পুনর্ব্যক্ত করেন। ‘দুই পক্ষ দ্বিপাক্ষিক কাঠামোর মাধ্যমে অংশীদারিত্ব আরও গভীর করার প্রস্তাব খতিয়ে দেখার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। শিগগিরই পরবর্তী বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে’। উভয় পক্ষ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও মতবিনিময় করেছে। এটি ঢাকার নতুন সরকারের পক্ষ থেকে দিল্লির সঙ্গে প্রথম উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগ। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের প্রায় ১৮ মাস পর এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসে।

প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরকে সঙ্গে নিয়ে খলিলুর রহমান মঙ্গলবার অজিত দোভালের সঙ্গে বৈঠক করেন। এর আগে গত নভেম্বরে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দিল্লি সফরেও তাদের বৈঠক হয়েছিল। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ‘আলোচনায় দুই দেশই বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার গুরুত্বের ওপর জোর দেয়। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়।’ খলিলুর রহমান ভারত সরকারকে ধন্যবাদ জানান যুবনেতা শহীদ ওসমান হাদির সন্দেহভাজন হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করার জন্য। দুই পক্ষ সম্মত হয়েছে প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী গ্রেপ্তার করা ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেয়া হবে বলে।

গত ৮ মার্চ পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ এলাকা থেকে হাদি হত্যা মামলার দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় মাথায় গুলি করার পর ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাদির মৃত্যু হয়। ৩২ বছর বয়সী হাদি ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের সময় গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে উঠে আসেন, যা শেখ হাসিনার পতনে ভূমিকা রাখে। তার হত্যাকাণ্ড দেশে বড় ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশের বিবৃতিতে বলা হয়, জয়শঙ্কর জানিয়েছেন- বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষ করে চিকিৎসা ও ব্যবসায়িক ভিসা সহজ করা হবে। প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারত ভিসা দেয়া সীমিত করেছিল। নির্বাচনের সময় বাংলাদেশও ভিসা কার্যক্রম বন্ধ রাখে, তবে গত মাসে তা আবার চালু হয়েছে। ঢাকার মতে, শিক্ষা, চিকিৎসা, পর্যটন ও ব্যবসাসহ বিভিন্ন কারণে ভ্রমণের জন্য এখনো পূর্ণমাত্রায় ভিসা দেয়া শুরু হয়নি।

পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকট আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। বাংলাদেশ জানায়, খলিলুর রহমান ভারতের পেট্রোলিয়াম বিষয়কমন্ত্রী হারদীপ পুরিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন সাম্প্রতিক ডিজেল সরবরাহের জন্য এবং সরবরাহ বাড়ানোর অনুরোধ করেছেন। মন্ত্রী পুরি জানিয়েছেন, ভারত সরকার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে।

সূত্র অনুযায়ী, গঙ্গার পানি চুক্তির মেয়াদ ডিসেম্বর মাসে শেষ হবে। তা নবায়নের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। ঢাকা তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি নিয়েও চাপ বাড়াতে পারে, যা গত ১৪ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কারণে ঝুলে আছে। ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে সীমান্ত নিরাপত্তা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল। দিল্লি চায় দুই দেশের মধ্যে সংযোগ প্রকল্পগুলো এগিয়ে নিতে, বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে। তবে এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বিতর্কের বিষয়।

রিপোর্টে বলা হয়, ভারতকে প্রমাণ করতে হবে-এই সংযোগ উভয় দেশের মানুষের জন্যই উপকারী হবে।
৭ থেকে ৯ এপ্রিল দিল্লি সফর শেষে খলিলুর রহমান মরিশাসের রাজধানী পোর্ট লুইসে যাবেন। সেখানে ১১-১২ এপ্রিল ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সে অংশ নেবেন। এই সফরের এক মাস আগে, মার্চের শুরুতে বাংলাদেশের শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান মেজর জেনারেল কায়সার রশিদ চৌধুরী দিল্লি সফর করেন। তিনি ১লা থেকে ৩রা মার্চ পর্যন্ত সফরে ভারতের রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (র’)-এর প্রধান পরাগ জৈন এবং ডিরেক্টর জেনারেল অব মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স লেফটেন্যান্ট জেনারেল পি এস রমনের সঙ্গে বৈঠক করেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন