অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রণীত কয়েকটি অধ্যাদেশ বাতিলের সিদ্ধান্তকে সরকারের সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র বলে মনে করছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। বুধবার বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এ নিয়ে একটি গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে এনসিপি। বৈঠকে এনসিপি’র কেন্দ্রীয় নেতারাসহ নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ অংশ নেন। বৈঠকে বক্তারা বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের নেয়া সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেন। তারা বলেন, এসব অধ্যাদেশ বাতিলের মাধ্যমে সরকার আওয়ামী লীগ সরকারের পথেই হাঁটছে।
বৈঠকে সরকার জুলাই সনদ বাস্তবয়নে গড়িমসি করছে এবং কিছু খোঁড়া যুক্তি দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের(সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ এবং তার একটা অংশ নিয়ে যে গণভোট হলো, যেটা জনগণ অনুমোদন করেছে, যেটা পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করার কথা ছিল, সেটা নিয়ে গড়িমসি করা হচ্ছে এবং কতগুলো খোঁড়া যুক্তি দেয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, গণভোটের রায় নাকচ করে দেয়া কিংবা এটা নিয়ে তালবাহানা করা; যে অধ্যাদেশগুলো সরকারের স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে এবং মানুষের কল্যাণ বয়ে আনবে সেগুলো বাতিল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এগুলো আমাদের সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে।
ড. বদিউল আলম মজুমদার আরও বলেন, গণভোট নিয়ে গড়িমসি এবং একই সঙ্গে এই অধ্যাদেশগুলো বাতিল করার মাধ্যমে আমাদের মধ্যে অনৈক্য এবং অহেতুক অনৈক্য আমরা নিজেরা সৃষ্টি করছি। আমি একজন বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিক হিসেবে সরকারের কাছে অনুরোধ করতে চাই, আপনারা এই জাতির মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করার চেষ্টা করুন, অনৈক্য নয়। এই ভয়াবহ মুহূর্তে আজকে আমাদের সবচেয়ে দরকার ঐক্য। যেমনিভাবে আমাদের ঐক্য দরকার ছিল সেই হাসিনাকে বিতাড়নের জন্য।
বৈঠকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ওনাদের (বিএনপি) সংবিধানের বিষয়গুলো খুবই সিলেক্টিভ। আমাদের একজন সহ-আলোচকও বলে গেলেন যে, বাংলাদেশের সংবিধানের বিষয়ে ওনারা খুব সিলেক্টিভভাবেই মানছেন। আমরা যেখান থেকে হাঁটি হাঁটি পা পা করে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পরে একটা জায়গায় এসে পৌঁছেছি এবং জুলাই সনদ এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে আমরা আরও একটা ধাপ অতিক্রম করতে পারতাম। সেখান থেকে আমরা এখন উল্টো পথে হাঁটা শুরু করেছি।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, জুলাইয়ের গণভোট যদি বাতিল হয়-গণভোটের বাতিলের সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচনও বাতিল। এটা হলো সার কথা। গণভোট না মেনে নেয়া মানে হলো জুলাই সনদকে নেগেট করে দেয়া।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবু হেনা রাজ্জাকী বলেন, অধ্যাদেশগুলো যে বাতিল করা হচ্ছে তার কোনো কারণ নেই। সিম্পল অধ্যাদেশগুলো বানানো হয়েছিল যাতে আবার হাসিনা তৈরি না হয়। আর যারা বাতিল করছেন তারা হাসিনা তৈরি করবেন, আপাতত তারা নিজেরাই হাসিনা হবেন। সে কারণেই এই অধ্যাদেশগুলো বাতিল করা হচ্ছে এছাড়া আর কোনো কারণ নাই। এই অধ্যাদেশগুলো যদি বাতিল না করে কার্যকর করেন, এগুলোকে পাস করানো হয় দেশের কোনো ক্ষতি হবে? হবে না। সাধারণ জনগণের কোনো ক্ষতি হবে? না। বিদেশের শক্তিদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নষ্ট হবে? না। দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে? না। দেশের দুর্নীতি হবে? না। কিন্তু তারপরেও করছি কেন? এগুলো সব আমরা করবো তাই। এই কারণেই এই অধ্যাদেশগুলো বাতিল করা হচ্ছে। এই অধ্যাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক দুইপক্ষের বাঁচার। রাষ্ট্র পরে আগে নিজে বাঁচবেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক ফরিদা আখতার বলেন, জুলাইয়ে যে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল, সেটা কোনো সংবিধান মেনে হয়নি। ওই প্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যেটা হয়েছিল, সেটাও তো কোনো সংবিধানে ছিল না, আমরা তো সেভাবেই ছিলাম। আবার আমরাই নির্বাচন দিলাম, তাহলে আমরাই যদি সংবিধানে না থাকি তাহলে ওই নির্বাচনটাই বা কীভাবে সংবিধানে হয়? এ সব এলোমেলো ব্যাপার নিয়ে বর্তমান সরকার এখন ক্ষমতায় আছে। তার মানে তারা যদি এখন প্রশ্ন তোলে যে সংবিধানের সবকিছু তারা মানছে; তারা মিথ্যাচার করছে বা অসত্য বলছে। যে সংস্কারগুলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় হয়েছিল, সেগুলো কিন্তু অনেকগুলো আলোচনার পরে হয়েছে, অনেক বিশেষজ্ঞ সবার সঙ্গে কথা বলেই হয়েছে। ফলে এখানে এটা নিয়ে যে এভাবে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, বাতিল করে দেয়া হচ্ছে এগুলো একদম একটা স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ আমি বলবো।
গোলটেবিল বৈঠকে এনসিপি’র মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরাম-এর সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুরসহ জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য রাখেন।
