নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র ৯০ মিনিট বাকি। দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যেই বিজয়ের দাবি করতে শুরু করেন। তিনি হুমকি দিয়েছিলেন, ইরান যদি চুক্তিতে রাজি না হয় এবং হরমুজ প্রণালি খুলে না দেয়, তবে ‘পুরো একটি সভ্যতা আজ রাতেই ধ্বংস হয়ে যাবে’। যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যেই আমাদের সব সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছি, বরং তা ছাড়িয়েও গেছি।’ কিন্তু এই চুক্তিতে একটি বড় ফাঁক রয়েছে- একটি বিশাল, পারমাণবিক বোমা আকৃতির ফাঁক।
মূল লক্ষ্য কি পূরণ হয়েছে?
২৮শে ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের বোমা হামলাকে এমন একটি অস্তিত্বগত লড়াই হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা থেকে থামানো। তার আরও তিনটি প্রধান লক্ষ্য ছিল। তা হলো- ইরানের নৌবাহিনী ধ্বংস করা, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার দুর্বল করা এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সরকার পরিবর্তন (রেজিম চেঞ্জ) লক্ষ্য নয়। যদিও প্রথমদিকে তিনি বলেছিলেন, দেশটি ইরানি জনগণের ‘দখলে নেয়ার’ জন্য প্রস্তুত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পাহাড়ি ঘাঁটির ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও ইসলামিক রিপাবলিকের কাছে এখনো প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ ভাগ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আছে। যা ৯০ ভাগ অস্ত্র মানের ইউরেনিয়ামে পৌঁছাতে খুবই সামান্য পথ বাকি। অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর সময় ইরান যতটা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি ছিল, এখনো ততটাই আছে।
ইরানের প্রতিশ্রুতি- কতোটা বিশ্বাসযোগ্য?
যুদ্ধবিরতি সম্মত হওয়ার পরপরই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, তাদের ১০ দফা পরিকল্পনায় দেশটি ‘কোনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করবে না’ বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, এই ১০ দফা পরিকল্পনায় ট্রাম্প সম্মত হয়েছেন। ট্রাম্প নিজেও তার ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে আরাঘচির বক্তব্য শেয়ার করেছেন। তবে এটি ইরানের দীর্ঘদিনের অবস্থান। দেশটি গোপনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে এবং ভূগর্ভস্থ স্থানে সংরক্ষণ করছে। এমন অভিযোগ বহুদিন ধরেই। ফলে তাদের এই দাবি যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই সন্দেহের চোখে দেখেছে। এ ছাড়া, এই ১০ দফা শর্তে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বিষয়ে ইরান কোনো স্পষ্ট ছাড় দিয়েছে বলেও মনে হয় না।
কূটনৈতিকভাবে শক্তিশালী ইরান?
এটি অবশ্য আলোচনার শুরু- শেষ নয়। তবে পুরো সংঘাত জুড়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে: সামরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কূটনৈতিকভাবে ইরানের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। বিশেষ করে এখন তারা জানে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিতে পারে, যা আগের আলোচনাগুলোতে তাদের হাতে ছিল না। শুক্রবার যখন ইরানি ও মার্কিন কূটনীতিকরা আলোচনায় বসবেন, তখন ইরানের হাতে নতুন কৌশল থাকবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র অনেকটাই আগের অবস্থানেই রয়েছে।
বড় প্রশ্নগুলো
এখন একটি বড় প্রশ্ন হলো, চাপের চূড়ান্ত মুহূর্তে ইরান কেন হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে রাজি হলো? এটি কি বোঝায় যে তাদের শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে? সম্ভবত এর উত্তর লুকিয়ে আছে যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে পাওয়া ছাড় ও নিশ্চয়তার মধ্যে। এর মধ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সীমা নির্ধারণের কোনো চুক্তি আছে কিনা- তা এখনা পরিষ্কার নয়।
ট্রাম্পের দাবি বনাম বাস্তবতা
ট্রাম্প এএফপিকে বলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে ইরানের ইউরেনিয়াম ‘পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে’। তবে কীভাবে, তা তিনি ব্যাখ্যা করেননি। নিঃসন্দেহে এই যুদ্ধবিরতি গুরুত্বপূর্ণ। এটি ৩৯ দিনের যুদ্ধের সম্ভাব্য সমাপ্তির প্রথম ইঙ্গিত। এবং আপাতত ‘ডিলমেকার-ইন-চিফ’ হিসেবে পরিচিত ট্রাম্প নিজেকে সফল মনে করছেন। তবে ফেব্রুয়ারিতে জেনেভায় আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ইরানের পারমাণবিক চুক্তিকে ‘সুইস চিজ’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। কারণ সেটি অনেক ফাঁকফোকরে ভরা ছিল। সম্ভবত ট্রাম্পেরও তার এই ‘বিজয়’ আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
