শেহবাজ শরিফ ও অসিম মুনিরের সঙ্গে আলোচনার পর ট্রাম্প ইরানে বোমাবর্ষণ বন্ধ করলেন

শেহবাজ শরিফ ও অসিম মুনিরের সঙ্গে আলোচনার পর ট্রাম্প ইরানে বোমাবর্ষণ বন্ধ করলেন

ফন্ট সাইজ:

পাকিস্তান বুধবার ঘোষণা করেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্রদের সঙ্গে অবিলম্বে কার্যকর একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। এর মধ্যে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত। একই সঙ্গে ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদে বৈঠকের জন্য উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এর লক্ষ্য হবে বিরোধগুলোর স্থায়ী সমাধান। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বুধবার ভোরের দিকে এক্সে এক পোস্টে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে উভয় দেশের নেতৃত্বকে ‘গভীর কৃতজ্ঞতা’ও জানান তিনি। শেহবাজ বলেন, দুই পক্ষই অসাধারণ প্রজ্ঞা ও বোঝাপড়া প্রদর্শন করেছে। শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠনমূলকভাবে যুক্ত ছিল তারা। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে ইসলামাবাদ আলোচনা টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠায় সফল হবে এবং আগামী দিনগুলোতে আরও ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যাবে। যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করা প্রধানমন্ত্রী উভয় দেশের প্রতিনিধিদের ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদে এসে সব বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আরও আলোচনা করার আহ্বান জানান। তবে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এতে সম্মত হয়নি। তিনি বলেন, সরাসরি আলোচনার বিষয়ে আলোচনা চলছে। তবে প্রেসিডেন্ট বা হোয়াইট হাউস ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত কিছুই চূড়ান্ত নয়।
অন্যদিকে, এক হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে ইসরাইলও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মত হয়েছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর এক বিবৃতিতে বলা হয়, ইসরাইল ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছে। তবে তারা বলেছে এই যুদ্ধবিরতি ‘লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করে না।’

ট্রাম্পের দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা

এই অগ্রগতি আসে পাকিস্তানের অনুরোধের পর। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বুধবার ভোরে জানান, তেহরান যদি গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেয়, তবে তিনি দুই সপ্তাহের জন্য ইরানে বোমাবর্ষণ স্থগিত করবেন। একই সময়ে ইরান জানায়, দেশটির ওপর হামলা বন্ধ হলে তারা তাদের প্রতিরক্ষামূলক অভিযানও বন্ধ করবে এবং এই সময়কালে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। ট্রাম্পের এই ঘোষণা আসে তার দেয়া চূড়ান্ত সময়সীমা (৮ এপ্রিল রাত ৮টা, ইস্টার্ন টাইম)-এর দুই ঘণ্টারও কম আগে। এর আগের দিন মঙ্গলবার তিনি ইরানকে আবারও হুমকি দিয়ে বলেন, ‘আজ রাতে পুরো একটি সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে’। কারণ তেহরান তার শর্ত মানার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। সময়সীমা শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এক্সে লিখেছেন-
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে এবং অদূর ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ফল আসতে পারে। কূটনীতিকে কাজ করার সুযোগ দিতে আমি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অনুরোধ করছি সময়সীমা দুই সপ্তাহ বাড়ানোর জন্য।

পাকিস্তান নিজেকে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে শান্তি প্রক্রিয়ার সহায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। বিশেষ করে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানে হামলার পর শুরু হওয়া সংঘাতের পর থেকে। শেহবাজ শরিফ ইরানকেও আহ্বান জানান, বিশ্বের প্রায় ২০ ভাগ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি দুই সপ্তাহের জন্য খুলে দিতে। তিনি বলেন, সদিচ্ছার নিদর্শন হিসেবে পাকিস্তান ইরানের ভাইদের কাছে অনুরোধ জানায়, তারা যেন দুই সপ্তাহের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়। আমরা সব যুদ্ধরত পক্ষকে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি পালনের আহ্বান জানাই, যাতে কূটনীতি যুদ্ধের চূড়ান্ত অবসান ঘটাতে পারে।

ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া

এর কিছুক্ষণ পর ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে জানান, তিনি শেহবাজ শরিফ এবং পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনিরের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, তাদের অনুরোধে এবং ইরান যদি হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ, তাৎক্ষণিক ও নিরাপদভাবে খুলে দিতে সম্মত হয়- এই শর্তে আমি দুই সপ্তাহের জন্য ইরানে বোমাবর্ষণ ও হামলা স্থগিত করতে সম্মত হচ্ছি। তিনি আরও বলেন, এটি হবে দ্বিপাক্ষিক যুদ্ধবিরতি।
ট্রাম্প যোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে তাদের সব সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছে এবং ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি শান্তিচুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। তিনি বলেন, আমরা ইরানের কাছ থেকে ১০ দফা প্রস্তাব পেয়েছি, যা আলোচনার জন্য কার্যকর ভিত্তি। প্রায় সব বিতর্কিত বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে এবং এই দুই সপ্তাহে চুক্তি চূড়ান্ত করা সম্ভব হবে।

ইরানের প্রতিক্রিয়া

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানান, দেশটির ওপর হামলা বন্ধ হলে ইরানও তাদের প্রতিরক্ষামূলক অভিযান বন্ধ করবে। তিনি শেহবাজ শরিফ ও অসিম মুনিরকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এ অঞ্চলে যুদ্ধ বন্ধে তাদের অক্লান্ত প্রচেষ্টার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতে আলোচনার অনুরোধ এবং ইরানের ১০ দফা পরিকল্পনাকে আলোচনার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণের ঘোষণার প্রেক্ষিতে আমরা জানাচ্ছি- ইরানের ওপর হামলা বন্ধ হলে আমাদের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীও তাদের প্রতিরক্ষামূলক অভিযান বন্ধ করবে। তিনি জানান, দুই সপ্তাহের জন্য ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা হবে।

ইসরাইলের সমর্থন

ইসরাইল জানিয়েছে, তেহরান যদি হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়, তবে দুই সপ্তাহের জন্য ইরানে হামলা স্থগিত করার ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে তারা সমর্থন করে। নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানায়, ইরান যদি অবিলম্বে প্রণালি খুলে দেয় এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও আঞ্চলিক দেশগুলোর বিরুদ্ধে সব হামলা বন্ধ করে, তাহলে ইসরাইল এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরাইলও চায় ইরান যেন আর পারমাণবিক, ক্ষেপণাস্ত্র বা সন্ত্রাসী হুমকি সৃষ্টি করতে না পারে।

ইসহাক দারের কূটনৈতিক তৎপরতা

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার অল্প সময়ের মধ্যে মরক্কো, সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, এসব আলোচনায় মধ্যপ্রাচ্যের সর্বশেষ পরিস্থিতি এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়। গত সপ্তাহে সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইসলামাবাদে এক বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। এরপর দার বেইজিং সফর করেন। সেখানে পাকিস্তান ও চীন মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে পাঁচ দফা উদ্যোগ ঘোষণা করে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন