রাজধানীর উত্তরায় একটি ফ্ল্যাটে গোপনে কিটামিন প্রক্রিয়াজাতকরণ ল্যাব স্থাপন করে আন্তর্জাতিকভাবে মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের সন্ধান পেয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। অভিযানে ৬ কেজি ৩০০ গ্রাম কিটামিন, বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক দ্রব্য ও ল্যাব সরঞ্জাম জব্দের পাশাপাশি তিন বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চক্রটি ডার্ক ওয়েব ও ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে শ্রীলঙ্কাসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মাদক বাণিজ্য পরিচালনা করছিল এবং আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে অভিনব কৌশলে এসব মাদক পাচারের চেষ্টা চালাচ্ছিল। মঙ্গলবার ঢাকার সেগুনবাগিচায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব জানান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. হাসান মারুফ।
তিনি বলেন, ডিএনসি’র গোয়েন্দা বিভাগ দীর্ঘদিন যাবৎ কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে মাদক পাচারের বিষয়ে নজরদারি করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় পাওয়া গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ২৫শে মার্চ ঢাকার একটি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস অফিসে অভিযান পরিচালনা করে একটি সন্দেহজনক পার্সেল আটক করা হয়। পরবর্তীতে পার্সেলটি তল্লাশি করে একটি ব্লুটুথ সাউন্ড স্পিকারের ভেতরে বিশেষ কৌশলে লুকানো অবস্থায় ৫০ গ্রাম কিটামিন উদ্ধার করা হয় এবং তাৎক্ষণিক রাসায়নিক পরীক্ষায় মাদকটির সত্যতা নিশ্চিত করা হয়। উদ্ধারকৃত পার্সেলের তথ্য বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানের মাধ্যমে রাজধানীর উত্তরা এলাকায় অবস্থানরত একটি চক্রের সন্ধান পাওয়া যায়। পরবর্তীতে একই দিন রাতে উত্তরা পশ্চিম থানাধীন একটি আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে তিনজন চীনা নাগরিক লি বিন, ইয়াং চুনশেং ও ইউ ঝে’কে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় ফ্ল্যাটটির একটি কক্ষে গড়ে তোলা অস্থায়ী ল্যাব থেকে ৬ কেজি ৩০০ গ্রাম কিটামিন, বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক দ্রব্য (সালফিউরিক এসিড, ইথানল, অ্যালকোহল), বিভিন্ন ল্যাব সরঞ্জাম, ডিজিটাল স্কেল, প্যাকেটজাতকরণ যন্ত্রপাতি, মোবাইল ফোন এবং দেশি-বিদেশি মুদ্রা উদ্ধার করা হয়। এসব আলামত থেকে বোঝা যায়, চক্রটি সুসংগঠিতভাবে মাদক প্রক্রিয়াজাত, সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল।
ডিজি মো. হাসান মারুফ বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা স্বীকার করে, তারা তরল কিটামিন সংগ্রহ করে ফ্ল্যাটের ভেতরে ল্যাব স্থাপন করে তা পাউডার আকারে প্রক্রিয়াজাত এবং পরবর্তীতে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বিদেশে পাচারের চেষ্টা করতো। তদন্তে জানা যায়, চক্রটি ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মাদকের অর্ডার গ্রহণ এবং একই মাধ্যমে বড় পরিসরে মাদক সংগ্রহ করতো। তারা কিটামিন প্রক্রিয়াজাত করে সাউন্ড স্পিকারসহ বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রের ভেতরে লুকিয়ে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে পাচার করতো। অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে চক্রটি ক্রিপ্টোকারেন্সিনির্ভর পদ্ধতি অনুসরণ করতো। তারা মূলত ঞজঙঘ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে লেনদেন পরিচালনা এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে মূল্য গ্রহণ করতো। পরবর্তীতে তারা ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার ইউএসডিটি সমপরিমাণ অর্থ একত্রে উত্তোলন করতো, যা তাদের কার্যক্রমকে গোপন রাখার ক্ষেত্রে সহায়ক ছিল।
ডিএনসি জানায়, গ্রেপ্তারকৃতদের ভ্রমণ ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তারা বিভিন্ন দেশে স্বল্প সময়ের জন্য অবস্থান এবং ঘন ঘন দেশ পরিবর্তন করতো। এই তথ্যের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে যে, চক্রটির কার্যক্রম একাধিক দেশে বিস্তৃত থাকতে পারে এবং বিভিন্ন দেশে তাদের পৃথক প্রক্রিয়াজাতকরণ ল্যাব স্থাপিত থাকতে পারে। তদন্তে আরও জানা যায়, চক্রটি এনক্রিপ্টেড যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, নিয়মিত ডিজিটাল তথ্য মুছে ফেলা, মোবাইলফোন ও সিম পরিবর্তন এবং ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহারসহ বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে নিজেদের কার্যক্রম গোপন রাখতো।
মানবদেহে কিটামিনের ক্ষতিকর প্রভাবের কথা জানিয়ে ডিজি বলেন, কিটামিন একটি শক্তিশালী ডিসোসিয়েটিভ ড্রাগ, যা স্বল্পমেয়াদে বিভ্রান্তি, হ্যালুসিনেশন ও শারীরিক নিয়ন্ত্রণহীনতা সৃষ্টি করে। দীর্ঘমেয়াদে এটি কিডনি ও মূত্রথলির মারাত্মক ক্ষতি, মানসিক সমস্যা এবং আসক্তির ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। নিয়মিত সেবনে সহনশীলতা তৈরি হয়ে ডোজ বাড়ানোর প্রবণতা দেখা দেয়, যা প্রাণঘাতী ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। এই আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য ব্যক্তি ও নেটওয়ার্ক শনাক্তে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসে কিটামিন পাচার, চীনা চক্রের ৩ সদস্য গ্রেপ্তার
স্টাফ রিপোর্টার
৮ এপ্রিল (বুধবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
