জুলাই সনদ ও সাংবিধানিক সংকট সমাধানের প্রস্তাবনা

জুলাই সনদ ও সাংবিধানিক সংকট সমাধানের প্রস্তাবনা

ফন্ট সাইজ:

অভূতপূর্ব রক্তাক্ত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে যে সংকট আমরা প্রত্যক্ষ করছি, তা মূলত দুই ধরনের বৈধতার সংঘাত: একদিকে সরকারি দল সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কথা বলছে, আর অন্যদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান রাষ্ট্রকে একটি নৈতিক বাধ্যবাধকতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষার পরিবর্তে উভয় পক্ষই একপক্ষীয় অবস্থান গ্রহণ করায় সংকট ঘনীভূত হচ্ছে।

সরকারি দলের মূল ঘাটতি স্পষ্ট: তারা রাষ্ট্রকে কেবল সাংবিধানিক কাঠামো হিসেবে দেখছে, কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উদ্ভূত নৈতিক পুনর্গঠনের দাবিকে যথাযথভাবে আত্মস্থ করতে পারছে না। জুলাই গণ-আন্দোলন ক্ষমতা পরিবর্তনের দাবি নয়; এটি ছিল বৈষম্যহীন সমাজ নির্মাণের নৈতিক আহ্বান। এই আহ্বানই ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর মাধ্যমে গণরায়ে পরিণত হয়েছে-যা কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, রাষ্ট্রের প্রতি অমোঘ নৈতিক বাধ্যবাধকতা।
বিরোধী দল এই নৈতিক শক্তিকে ধারণ করলেও, তা একটি টেকসই সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় রূপান্তরের ক্ষেত্রে যথেষ্ট দূরদর্শিতা ও কৌশল দেখাতে পারছে না। ফলে তাদের দাবি নৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে।

সরকারি দল এবং বিরোধী দল উভয়কে বুঝতে হবে সংসদ হলো ‘ঈড়হংঃরঃঁঃবফ চড়বিৎ’ (সংবিধান দ্বারা সৃষ্ট শক্তি), কিন্তু জনগণ হলো ‘ঈড়হংঃরঃঁবহঃ চড়বিৎ’ (সংবিধান তৈরির মূল শক্তি)। যখন প্রতিনিধিরা জনগণের আকাঙ্ক্ষা বুঝতে ব্যর্থ হয়, তখন ক্ষমতা সরাসরি তার উৎস জনগণের কাছে ফিরে যায়। গণভোট কেবল সংখ্যাতত্ত্ব নয়, এটি হলো রাষ্ট্রের সংকটে জনগণের সরাসরি নৈতিক রায় বা ‘এবহবৎধষ ডরষষ’।

সাংবিধানিক বৈধতা এবং নৈতিক আহ্বানের মধ্যে কোনোটি এককভাবে যথেষ্ট নয়। সাংবিধানিক বৈধতা নৈতিক ভিত্তি হারালে শূন্যে পরিণত হয়, আর নৈতিক আহ্বান প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না পেলে অরাজকতার ঝুঁকি তৈরি করে। অতএব, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রাষ্ট্রবিনির্মাণের আকাঙ্ক্ষা এবং পুরাতন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের নৈতিক বিদ্রোহ-এই দুইকে “জুলাই জাতীয় সনদ”-এর মাধ্যমে নতুন সাংবিধানিক ঐকমত্য (Constitutional Consensus)-এ রূপান্তর করাই একমাত্র পথ।

১. সাংবিধানিক বৈধতা বনাম নৈতিক বৈধতার দ্বন্দ্ব;
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংকট কেবল আইনি নয়; এটি একটি গভীর ‘লেজিটিমেসি ক্রাইসিস’। Hannah Arendt-এর ভাষায়, ক্ষমতার আইনি ভিত্তি তার নৈতিক ভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হলে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। সরকারি দল যখন কেবল সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার ওপর জোর দেয়, তখন তারা রাষ্ট্রের যান্ত্রিক রূপকে অগ্রাধিকার দেয়, কিন্তু নৈতিক ভিত্তি উপেক্ষা করে।

কধৎষ চড়ঢ়ঢ়বৎ-এর অন্তর্দৃষ্টি অনুযায়ী, রাজনৈতিক ব্যবস্থার বৈধতা নির্ভর করে কতোটা ন্যায়সঙ্গত এবং জনগণের প্রতি জবাবদিহিমূলক-এবং জনগণের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত নৈতিক বৈধতা কেবল আবেগ নয়, রাষ্ট্র পুনর্গঠনের নীতিগত ভিত্তি। এখানে ‘জনগণের ইচ্ছা’ (General Will) আইনের ঊর্ধ্বে স্থান পায়।

২. সামাজিক চুক্তির পুনর্লিখন:
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কেবল সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি ক্ষয়ে যাওয়া ‘সামাজিক চুক্তি’ ছিঁড়ে ফেলে নতুন চুক্তির আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে। নতুন চুক্তিতে রাষ্ট্র আর নিছক দাতা হবে না, জনগণ আর নিছক গ্রহীতা নয়। জনগণ স্ব-উদ্যোগ, নৈতিক দায়িত্ব এবং রাজনৈতিক সক্রিয়তা নিয়ে রাষ্ট্রের পুনর্গঠনে অংশগ্রহণ করবে। রাষ্ট্রের কাঠামো কেবল আইনগত নিয়ম ও প্রাতিষ্ঠানিক শাসনের ওপর নির্ভর করবে না; বরং এটি জনগণের নৈতিক স্বীকৃতি, অংশগ্রহণ এবং ন্যায়বোধের উপর ভিত্তি করে শক্তিশালী হবে।

৩. গ্লোবাল পলিটিক্স ও প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতা: বিশ্বব্যবস্থায় শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের মধ্যে, বাংলাদেশের ভঙ্গুর প্রশাসনিক কাঠামো এবং দুর্নীতিবান্ধব প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রকে ‘সফট-স্টেট’ (ঝড়ভঃ-ঝঃধঃব) হিসেবে রূপান্তরের ঝুঁকিতে ফেলছে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি সংকীর্ণ স্বার্থে আবদ্ধ থাকে এবং জাতীয় নিরাপত্তাহীনতার প্রতিফলন চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও সার্বভৌমত্ব দুর্বল হয়ে পড়বে।

‘জুলাই সনদ’ কোনো নির্দিষ্ট দলের ইশতেহার নয়; এটি রাষ্ট্রের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার (ঈড়ষষবপঃরাব অংঢ়রৎধঃরড়হ) প্রতিফলন। যদি রাষ্ট্র এই সনদকে তার ধ্রুবতারা হিসেবে গ্রহণ না করে, তবে শাসকের পরিবর্তন হবে, শাসনের চরিত্র নয়। ন্যায়বিচার কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থাকলে সামাজিক আস্থা নষ্ট হবে এবং রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে অরাজকতার দিকে ধাবিত হবে।

৪. রাষ্ট্র পুনর্গঠনে সরকারি ও বিরোধী দলের সমন্বিত করণীয়: রাষ্ট্রকে ক্ষমতার যন্ত্র থেকে মুক্ত করে একটি মর্যাদাপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হলে প্রশাসনিক সংস্কারের চেয়েও বড় প্রয়োজন একটি দার্শনিক পুনর্জাগরণ।
ঔপনিবেশিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তন: বৃটিশ-পাকিস্তানি আমলাতন্ত্র ও বিচারব্যবস্থা পরিবর্তন করতে হবে। রাষ্ট্র নাগরিকের ‘সেবক’, কোনো গোষ্ঠীর প্রভু নয়।

বিচারব্যবস্থায় নৈতিক ও সাংস্কৃতিক অন্তর্ভুক্তি: বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের সর্বজনীনতা নিশ্চিত করা।
বহুত্ববাদী ও অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি: পারস্পরিক সম্মান ও সমাজের প্রতিটি স্তরে বিকশিত সমাজ শক্তির রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা।
সরকারি ও বিরোধী দল উভয়ই নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে, নীতি নির্ধারণে ক্ষমতার খেলায় নয়, নৈতিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণে নেতৃত্ব দেবে।

জুলাই সনদ: সংকট সমাধানের ৬টি (ছয়) প্রস্তাবনা;
১. জুলাই সনদের সাংবিধানিক রূপান্তর: শহীদদের আত্মত্যাগ ও জনগণের আকাঙ্ক্ষা প্রতীকী শ্রদ্ধায় সীমাবদ্ধ না রেখে, অবিলম্বে জাতীয় সংসদে ‘সংবিধান সংস্কার বিল’ হিসেবে উত্থাপন করতে হবে। বিলের লক্ষ্য হবে সংবিধানের নৈতিক ভিত্তি পুনঃনির্মাণ ও রাষ্ট্রের সকল স্তরে জনগণের মৌলিক অধিকার, গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের আকাঙ্ক্ষা ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা।

২. জাতীয় ঐক্যের রাজনৈতিক অঙ্গীকার: বিলটি একক দলের কৃতিত্ব নয়; সরকারি ও বিরোধী দলের অর্থাৎ সর্বদলীয় যৌথ প্রস্তাব হিসেবে সংসদে পেশ করা হবে। এটি প্রমাণ করবে, রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো সংস্কারে সকল রাজনৈতিক শক্তি জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ।

৩. গণভোট: জনসার্বভৌমত্বের চূড়ান্ত রক্ষাকবচ: রাজনৈতিক দলসমূহ যদি মনে করে সংসদীয় সংশোধনীতে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোগত সংস্কার বা নতুন কাঠামো প্রবর্তন যথার্থ নয়, তবে সংবিধান সংস্কার বিল জাতীয় সংসদে গৃহীত হওয়ার পর তা আবার গণভোটে জনগণের সরাসরি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করতে হবে, যাতে সংবিধানের চূড়ান্ত বৈধতা জনসার্বভৌমত্বের (Popular Sovereignty) মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়।

৪. দ্বৈত বৈধতা কাঠামো (Dual Legitimacy Structure)
রাষ্ট্র পরিচালিত হবে দুই স্তরের বৈধতার মাধ্যমে:
(ক) সংসদীয় বৈধতা:
জাতীয় সংসদ আইন প্রণয়ন করবে ও
সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব উত্থাপন করবে।
(খ) গণভোটীয় বৈধতা:
রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক গণভোট প্রবর্তন করতে হবে।
গণভোটের ফলাফল হবে চূড়ান্ত ও বাধ্যতামূলক। এই মডেলই হবে Parliamentary Supremacy Ges Popular Sovereignty-এর সমন্বয়।
৫. সাংবিধানিক নৈতিকতা কাউন্সিল: (Council of Constitutional Morality) একটি নতুন ধারণা-রাষ্ট্রের নৈতিক দিকনির্দেশনা নিশ্চিত করার জন্য। এই কাউন্সিলের কাজ হবে রাষ্ট্রীয় সকল নীতি ও আইনের নৈতিক মূল্যায়ন এবং সাংবিধানিক ব্যাখ্যার সহায়ক মতামত প্রদান করা।
৬. নৈতিক ও সাংস্কৃতিক পুনর্গঠন: রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রে সংস্কার প্রক্রিয়া হবে রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক ও নৈতিক রূপান্তর। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা হবে, যা ভবিষ্যতে স্বৈরতন্ত্রের উত্থানকে সামাজিকভাবে রুখে দেবে।
এই প্রস্তাবসমূহ কেবল নৈতিক আহ্বান নয়; বরং এগুলো বাস্তব রাজনীতিতে প্রয়োগযোগ্য একটি কাঠামোগত নকশা, যা সাংবিধানিক সংস্কার ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের একটি কার্যকর পথ নির্দেশ করে। তবে এই রূপরেখার বাস্তবায়ন নির্ভর করবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের উপর।
রাষ্ট্র তখনই টিকে থাকে, যখন তা কেবল ক্ষমতার কাঠামো নয়, বরং মানুষের আস্থা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের প্রতিফলন হয়ে ওঠে।
জুলাই সনদ সেই সম্ভাবনার নাম-যেখানে রাষ্ট্র নিজেকে পুনর্গঠন করে জনগণের কাছে নতুন করে বৈধতা অর্জন করেছে।

লেখক: গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ

২ মাস আগে

বিস্তারিত তথ্যে ভরপুর লেখাটি জনগণের আশা-আকাঙ্খায় প্রতিফলন।
ধন্যবাদ লেখক কে

BAD MOUTH

২ মাস আগে

জুলাই সনদ ইউনুস, আলী রিয়াজ, বদিউল মজুমদারের। বিএনপি দিয়েছে নোট অফ ডিসেন্ট।==== ইউনুস, আলী রিয়াজ, বদিউল মজুমদার অনির্বাচিত। বিএনপি ভোটে নির্বাচিত।
এটাই বাস্তব।====

মন্তব্য করুন