ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে শনিবার একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর এটি ছিল ওই স্থাপনার কাছাকাছি চতুর্থ হামলা। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের হামলা অব্যাহত থাকলে তেজস্ক্রিয় দূষণ ছড়িয়ে উপসাগরীয় (জিসিসি) দেশগুলোর রাজধানীগুলোতে ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে।
বুশেহর ইরানের একমাত্র কার্যকর বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ১৯৭৫ সালে শাহ শাসনামলে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং জার্মানির সিমেন্স কোম্পানিকে প্রকল্পটি দেয়া হয়েছিল। তবে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধের কারণে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরে রাশিয়ার সহায়তায় ১৯৯৬ সালে পুনরায় কাজ শুরু হয় এবং দীর্ঘ বিলম্বের পর ২০১৩ সালে কেন্দ্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়।
এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে ১০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি রিঅ্যাক্টর রয়েছে, যা ইরানের মোট বিদ্যুতের প্রায় ১ থেকে ২ শতাংশ সরবরাহ করে। বর্তমানে রাশিয়া থেকে আনা ৪.৫ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে রিঅ্যাক্টরটি পরিচালিত হচ্ছে। কেন্দ্রটিতে প্রায় ২৮২ টন পারমাণবিক উপাদান রয়েছে, যার মধ্যে ৭২ টন সক্রিয় জ্বালানি এবং ২১০ টন ব্যবহৃত জ্বালানি সংরক্ষিত আছে। ব্যবহৃত জ্বালানিতে বিপজ্জনক সিজিয়াম-১৩৭ এর পরিমাণ এত বেশি যে তা চেরনোবিল দুর্ঘটনায় নিঃসৃত পরিমাণের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভৌগোলিকভাবে বুশেহর উপসাগরীয় দেশগুলোর খুব কাছাকাছি অবস্থিত। কুয়েত সিটি মাত্র প্রায় ২৭০ কিলোমিটার দূরে, বাহরাইনের রাজধানী মানামা প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার, সৌদি আরবের দাম্মাম ও ধাহরান প্রায় ৪০০ কিলোমিটার এবং কাতারের দোহা প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার দূরে। এসব দেশের বড় অংশের মানুষ পানীয় জলের জন্য সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণের ওপর নির্ভরশীল।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যদি রিঅ্যাক্টর বা জ্বালানি সংরক্ষণাগারে সরাসরি আঘাত লাগে, তাহলে তেজস্ক্রিয় কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে পারে। জাগ্রোস পর্বতমালা এবং বাতাসের প্রবাহের কারণে এই দূষণ সহজেই কুয়েত, বাহরাইন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে ছড়িয়ে যেতে পারে। এতে খাদ্য, মাটি ও পানির ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। পাশাপাশি সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোও অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে।
উপসাগরীয় দেশগুলো আগে থেকেই এই কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি আগেই সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা হলে উপসাগরীয় অঞ্চলে পানি, মাছ বলে কিছুই থাকবে না, জীবনও থাকবে না।
যদিও আধুনিক পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর আঘাত লাগলে দ্রুত বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো করে তৈরি করা হয়, তবুও ঝুঁকি পুরোপুরি এড়ানো যায় না। বিশেষ করে কুলিং ব্যবস্থা ব্যর্থ হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা মেল্টডাউন ঘটতে পারে।
উল্লেখ্য, ইরানে বুশেহর ছাড়াও নাতানজ, ফোরদো, ইসফাহান ও আরাকসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনা রয়েছে, যেগুলোও বিভিন্ন সময় হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। অতীতে ইউক্রেনের চেরনোবিল (১৯৮৬) এবং জাপানের ফুকুশিমা (২০১১) দুর্ঘটনা দেখিয়েছে, পারমাণবিক স্থাপনায় বড় ধরনের বিপর্যয় হলে তার প্রভাব বহু বছর ধরে বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
