সুইস ব্যাংকে লুকানো সম্পদ: কার টাকা, কার দায়?

সুইস ব্যাংকে লুকানো সম্পদ: কার টাকা, কার দায়?

ফন্ট সাইজ:

বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ বিশেষ করে সুইস ব্যাংকে গচ্ছিত অবৈধ সম্পদ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য দীর্ঘদিনের এক নীরব রক্তক্ষরণ। উন্নয়নের নানা সূচকে অগ্রগতির গল্প শোনা গেলেও এই বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, দেশের একটি বড় অঙ্কের সম্পদ গোপনে বিদেশে সরে যাচ্ছে। প্রশ্নটি তাই কেবল অর্থের নয় এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার একটি কঠিন পরীক্ষা।

একদিকে আমরা উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলি, অন্যদিকে হাজার হাজার কোটি টাকা অবৈধ পথে বিদেশে পাচার হয় এই বৈপরীত্য রাষ্ট্রব্যবস্থার গভীরে লুকিয়ে থাকা দুর্বলতা, জবাবদিহিতার ঘাটতি এবং আইনের অসম প্রয়োগেরই প্রতিফলন। ফলে বিষয়টি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

সুইস ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে গোপনীয়তার প্রতীক হিসেবে পরিচিত। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে তাদের ব্যাংকিং নীতিতে কিছু পরিবর্তন এসেছে এবং তথ্য আদান-প্রদানের কাঠামো কিছুটা উন্মুক্ত হয়েছে, তবুও পাচার হওয়া অর্থের প্রকৃত মালিক শনাক্ত করা এখনো অত্যন্ত জটিল। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন জাগে বাংলাদেশ কি আদৌ এই অর্থ ফেরত আনতে পারবে?

বিশ্বের অভিজ্ঞতা আশাবাদ জাগায় পারবে, তবে শর্ত একটাই: ধারাবাহিক, সমন্বিত এবং রাজনৈতিকভাবে দৃঢ় উদ্যোগ।

নাইজেরিয়ার সাবেক শাসক সানি আবাচার পরিবারের পাচার করা অর্থ পুনরুদ্ধারের ঘটনা এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ধাপে ধাপে সেই অর্থ ফেরত আনা হয়েছে দীর্ঘ আইনি লড়াই, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সরকারের সুস্পষ্ট রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে। একইভাবে ফিলিপাইনে ফের্দিনান্দ মার্কোস পরিবারের অবৈধ সম্পদের একটি বড় অংশ বিদেশ থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। ইন্দোনেশিয়াও তাদের দুর্নীতিবিরোধী কমিশনের শক্তিশালী ভূমিকার মাধ্যমে অর্থ পাচার রোধ ও পুনরুদ্ধারে কিছুটা অগ্রগতি অর্জন করেছে।

এই উদাহরণগুলো স্পষ্ট করে দেয় কেবল বক্তব্য, প্রতিবেদন বা ক্ষণিকের উদ্যোগে নয়; প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি, আইনি কাঠামো এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার সমন্বয়েই এই লড়াই সফল হয়।

বাংলাদেশের জন্য প্রথম শর্ত অটল রাজনৈতিক সদিচ্ছা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঘোষিত অবস্থান বাস্তবে কার্যকর না হলে, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ কখনোই ফলপ্রসূ হবে না। ক্ষমতার প্রভাব বিবেচনা না করে সম্পদের উৎস অনুসন্ধান এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা এটাই হতে হবে প্রথম পদক্ষেপ।

দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা অপরিহার্য। তথ্য বিনিময়ের বৈশ্বিক ব্যবস্থাগুলো যেমন অটোমেটিক এক্সচেঞ্জ অব ইনফরমেশন কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। সুইজারল্যান্ডসহ অন্যান্য আর্থিক কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি জোরদার করা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় গড়ে তোলা জরুরি।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের উচিত সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে সরাসরি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া।এক্ষেত্রে বাংলাদেশ দূতাবাসের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি দায়িত্ব পালনে আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। কেবল তথ্য চাওয়া নয়, বরং নির্দিষ্ট কেসভিত্তিক তদন্তে যৌথ টাস্কফোর্স গঠন, পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তি (Mutual Legal Assistance) আরও কার্যকর করা এবং সন্দেহভাজন হিসাবসমূহ দ্রুত শনাক্ত ও অস্থায়ীভাবে স্থগিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। পাশাপাশি সম্পদের প্রকৃত মালিকানা শনাক্তে আর্থিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় জোরদার করা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রমাণ উপস্থাপনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কূটনৈতিক তৎপরতা, আইনি প্রস্তুতি এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমন্বয়েই এই যৌথ উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে।

তৃতীয়ত, দেশের অভ্যন্তরে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকলে এই লড়াই এগোবে না। তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সেই তথ্যকে আইনি প্রমাণে রূপান্তরের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। কারণ, শক্ত প্রমাণ ছাড়া বড় মামলাগুলো টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয় না এটি আমাদের বাস্তবতার এক বড় সীমাবদ্ধতা।

চতুর্থত, আইনি কাঠামো আধুনিক ও কার্যকর করতে হবে। পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারের জন্য বিশেষ আইন, দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। দীর্ঘসূত্রিতা ও আইনি জটিলতা অনেক সময় এই প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে, যা শেষ পর্যন্ত অপরাধীদেরই সুবিধা দেয়।

পঞ্চমত, জনসচেতনতা ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি। গণমাধ্যম, বিশেষ করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, এই ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সমাজে যদি এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয় যে অবৈধ অর্থ বিদেশে রাখা নিরাপদ নয় এবং শেষ পর্যন্ত তা জবাবদিহিতার মুখে পড়বে, তাহলে এটি দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করবে।

তবে বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই এই লড়াই সহজ নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি, জটিল এবং অনেক ক্ষেত্রে কূটনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। কিন্তু বিশ্ব দেখিয়েছে, অসম্ভব নয়। প্রয়োজন কেবল ধারাবাহিকতা, দক্ষ কৌশল এবং দৃঢ় প্রতিশ্রুতি।

সবশেষে, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। এই অর্থ দেশের মানুষের, দেশের ভবিষ্যতের। যারা এই সম্পদ লুট করে বিদেশে পাচার করেছে, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং সেই অর্থ জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করা এটাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের স্পষ্ট অঙ্গীকার।

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই মুহূর্তে অর্থ পাচারের মতো সমস্যাকে উপেক্ষা করা মানে ভবিষ্যতের ভিত দুর্বল করে দেওয়া। তাই এখনই সময় কথার বাইরে গিয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার। কারণ, দেশের প্রতিটি টাকাই দেশের মানুষের অধিকার, এবং সেই অধিকার ফিরিয়ে আনা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব।


লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি

ইমেইল: [email protected]





কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন