অর্ধেক নগরী তুমি, অর্ধেক কল্পনা

অর্ধেক নগরী তুমি, অর্ধেক কল্পনা

ফন্ট সাইজ:

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস-নামটির মধ্যেই যেন আছে আলো, শিল্প আর অদৃশ্য এক দীর্ঘশ্বাস। কেউ বলেন প্রেমের নগরী, কেউ বলেন আলোর শহর, কেউ আবার শিল্পের রাজধানী। কিন্তু প্যারিসকে এক কথায় ব্যাখ্যা করা যায় না। এটি অর্ধেক বাস্তব, অর্ধেক কল্পনা-অর্ধেক ইতিহাস, অর্ধেক স্বপ্ন।
প্যারিস কেবল একটি শহর দেখা নয়; বরং একটি অনুভূতির ভেতর দিয়ে হাঁটার অভিজ্ঞতা। আপনি যখন পড়বেন, আশা করি মনে হবে-আপনি নিজেই সেইন নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছেন, কিংবা আইফেল টাওয়ারের চূড়ায় বসে শহরের আলো গুনছেন।
রেলস্টেশনের কোলাহল থেকে শুরু
ভ্রমণ শুরু হলো এধৎব ফব খুড়হ স্টেশন থেকে। বিশাল ঘড়ির কাঁটা তখন সকাল দশটা ছুঁইছুঁই। ইউরোপের বিভিন্ন শহর থেকে ট্রেন এসে নামছে একের পর এক। কাঁধে ব্যাকপ্যাক, হাতে ম্যাপ, চোখে কৌতূহল-মানুষের ভিড়ে নিজেকেও যেন এক চলমান গল্প মনে হচ্ছিল।
স্টেশনের সঙ্গেই যুক্ত মেট্রো। প্যারিসের মেট্রো যেন শহরের রক্তধারা। নিচের অন্ধকার সুড়ঙ্গে নামলেই বোঝা যায়Ñএই শহর কেবল উপরের ঝলমলে নয়, ভেতরেও ততটাই সচল।
প্রথম শিক্ষা পেলাম এখানেই-ব্যাগের চেইন ভালো করে বন্ধ রাখুন, মোবাইল শক্ত করে ধরুন। এক মুহূর্তে দরজা বন্ধ, আর ঠিক সেই মুহূর্তে এক তরুণ ছিনতাইকারী এক মহিলার হাত থেকে মোবাইল নিয়ে উধাও! দরজা বন্ধ, ট্রেন ছুটছে-মহিলা স্তব্ধ। স্বামীও নির্বাক।
সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি প্যারিস সফরে এসে এক বিব্রতকর ঘটনার মুখে পড়েছিলেন। সফরকালে তার ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনতাই হয়ে যায়। ছিনতাইকারীরা গাড়ির জানালা ভেঙে ব্যাগটি নিয়ে পালিয়ে যায়। ওই ব্যাগের ভেতর তার পাসপোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ছিল। ফলে পাসপোর্ট হারিয়ে যাওয়ায় তাকে ট্রাভেল পাস নিয়ে দেশে ফিরতে হয়েছিল।
ভয় পাওয়ার কিছু নেই-বিশ্বের সব বড় শহরেই এমন ছোটখাটো অপরাধ ঘটে। তবে সতর্ক থাকা জরুরি, বিশেষ করে পর্যটনকেন্দ্রিক এলাকায়।
আইফেল টাওয়ার নিয়ে যে প্রশ্ন
প্যারিস মানেই আইফেল টাওয়ার। ১৮৮৯ সালে নির্মিত এই লোহার টাওয়ারটি প্রথমে অনেকেই পছন্দ করেননি। আজ এটিই শহরের প্রাণ। ৩২৪ মিটার উচ্চতার চূড়ায় উঠতে উঠতে মনে হচ্ছিল-আমি যেন ইতিহাসের সিঁড়ি বেয়ে উঠছি। উপরে পৌঁছে নিচে তাকাতেই মনে হলো, পুরো প্যারিস যেন এক খোলা চিত্রকর্ম। সোনালি আলোয় ঝলমল করছে ছাদের সারি, গির্জার চূড়া, সেতুর নকশা। সন্ধ্যা নামতেই টাওয়ার ঝলসে উঠলো হাজারো আলোর ঝর্ণায়। এক তরুণ হাঁটু গেড়ে প্রিয়তমাকে প্রস্তাব দিলো। চারপাশে হাততালি। এই দৃশ্য হয়তো প্রতিদিনই ঘটে, কিন্তু প্রত্যেকবারই তা নতুন। তবে বাস্তবতাও আছেÑএই টাওয়ারের ২ কি.মি. ব্যাসার্ধে থাকুন অতিরিক্ত সতর্ক। পকেটমারদের তৎপরতা এখানে বেশি।
সেইন নদী: প্রেম, কবিতা আর তালাবদ্ধ প্রতিশ্রুতি
প্যারিসকে জড়িয়ে রেখেছে সেইন নদী। নদীর ধারে হাঁটলে বোঝা যায় কেন শত শত কবি-সাহিত্যিক এখানে বসে লিখেছেন প্রেমের পঙ্ক্তি। সন্ধ্যার নৌভ্রমণে উঠলাম। বাতাসে ঠান্ডা ছোঁয়া। দুই পাড়ে আলোকিত স্থাপত্য। সেতুগুলোর রেলিংয়ে ঝুলছে অসংখ্য ‘লাভ লক’Ñযুগলের নাম লেখা তালা। ভালোবাসাকে চিরস্থায়ী করার এই প্রতীকী প্রচেষ্টা এখন নিয়ন্ত্রিত, কারণ অতিরিক্ত ওজন সেতুর ক্ষতি করছিল। নদীর ধারে হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো-এ শহর শুধু স্থাপত্য নয়, অনুভূতিরও রাজধানী।
ল্যুভর: শিল্পের মহাসমুদ্র
ল্যুভর কেবল একটি জাদুঘর নয়, একটি সভ্যতার আর্কাইভ। ১৭৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশাল সংগ্রহশালা সাড়ে ৬ লাখ বর্গফুট জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। প্রবেশদ্বারের কাঁচের পিরামিডের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়Ñপুরনো আর নতুনের এক অসাধারণ মেলবন্ধন।
ভেতরে ঢুকে সময়ের ধারণা হারিয়ে যায়। প্রাগৈতিহাসিক নিদর্শন থেকে রেনেসাঁ শিল্পÑসব একসঙ্গে। আর সেই বহুল প্রতীক্ষিত মুহূর্তÑ লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির অমর সৃষ্টি মোনালিসার সামনে দাঁড়ানো।
ছবিটি ছোট, কিন্তু তার চারপাশে মানুষের ভিড় বিশাল। তার হাসি আজও রহস্যময়। মনে হয়Ñসে কি জানে আমরা সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছি?
ভার্সাই সিটি এবং মাইকেল মধূসুদন
ফরাসি শহর ভার্সাইয়ে রাজপ্রাসাদ দেখার টান নয়Ñটান ছিল আমাদের কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত-এর দুঃখভরা পদচিহ্ন খুঁজে পাওয়ার। ১৮৬৩ থেকে ১৮৬৫-শহরের ১২ নম্বর Rue de lÕÉtang (তৎকালীন Rue des Chantiers)-এর ছোট্ট দোতলা বাসায় তিনি কাটিয়েছেন জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিনগুলো। অর্থাভাবে স্ত্রীর অলংকার, বইপত্র পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে; পাওনাদারের চাপ, বকেয়া ভাড়া, এমনকি জেলে যাওয়ার আশঙ্কাও ঘনিয়ে এসেছিল। তবু অনাহার-অর্ধাহারের মধ্যেও থেমে থাকেনি তাঁর সৃজনশীলতাÑএখানেই রচিত হয় ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী’র মতো অনন্য সৃষ্টি।
দূর কলকাতা থেকে সাহায্যের প্রতীক্ষায় তিনি প্রতিদিন চিঠি লিখতেন দয়ার সাগর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর-এর কাছে। অবশেষে বিদ্যাসাগরের সহায়তায় তিনি বিপদমুক্ত হন। পরে সচ্ছলতা ফিরলে পরিবারকে নিয়ে ওঠেন রাজপ্রাসাদসংলগ্ন বনেদি পাড়ায়, বিখ্যাত Bassin de Neptune-এর মুখোমুখি ফ্ল্যাটে। দুঃখের অতল থেকে স্বপ্নের পুনরারম্ভ-ভার্সাই শহর তাই শুধু ইতিহাসের নয়, আমাদের কবির অমর সহিষ্ণুতারও স্মারক।
নটর ডেম: পাথরে খোদাই করা প্রার্থনা
৮০০ বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নটরডেম ক্যাথেড্রাল। এটি নির্মাণে লেগেছিল প্রায় ২০০ বছর। লম্বায় ১৩০ মিটার, উচ্চতায় ৬৯ মিটার-গথিক স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও তার পুনর্জন্মের গল্প এখনো চলছে। ভেতরে ঢুকলে আলো-ছায়ার খেলা আর রঙিন কাঁচের জানালায় ইতিহাস কথা বলে। এখানে সংরক্ষিত রয়েছে ফ্রান্সের বহু ঐতিহাসিক নিদর্শন। মনে পড়ে যায় নেপোলিয়নের যুগ, যুদ্ধের কাহিনী, ক্ষমতার উত্থান-পতন।
রাতের প্যারিস যেন আলোর শহর
এক সময় প্যারিসকে বলা হতো “লা ভিল লুমিয়ের”-আলোর শহর। আজও সেই পরিচয় অম্লান। রাত বাড়লে শহর যেন নতুন পোশাক পরে। নিয়ন আলো, লাল-নীল আলোকছটা, ক্যাফের বাইরে বসে থাকা মানুষÑসব মিলিয়ে এক জীবন্ত চিত্রপট। চাঁদ উঠলে সেইন নদীর জলে তার প্রতিফলন- দেখলে মনে হবে, আপনি কোনো সিনেমার দৃশ্যে আছেন।
ফ্যাশনের রাজধানী
প্যারিস কেবল প্রেম বা শিল্প নয়, ফ্যাশনেরও রাজধানী। ‘প্যারিস ফ্যাশন উইক’ বিশ্ব জুড়ে ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্টগুলোর একটি। বিশ্বখ্যাত ডিজাইনার, আন্তর্জাতিক মডেলÑসবাই এই মঞ্চে আসতে চান। রাস্তায় হাঁটলেই বোঝা যায়Ñএখানে ফ্যাশন শুধু পোশাক নয়, জীবনযাপন।
খাবারে বাঙালিয়ানা
বিদেশে গিয়ে হঠাৎ ইলিশ-ভাত বা বিরিয়ানির কথা মনে পড়তেই পারে। সেক্ষেত্রে চলে যান Gare du Nord এলাকার দিকে বা  Quatre Chemins অঞ্চলে। এখানে বাঙালি, ভারতীয়, শ্রীলঙ্কান রেস্টুরেন্ট মিলবে। মেট্রো ধরে সহজেই পৌঁছানো যায়। ভ্রমণের ক্লান্তিতে পরিচিত স্বাদের খাবার যেন বাড়ির গন্ধ এনে দেয়।
ফরাসি বাগেট ও কোয়াসো
ফ্রান্সে ঘুরতে এসে ফরাসি বাগেট আর কোয়াসো না খাওয়া যেন ভ্রমণেরই এক অপূর্ণতা। প্যারিসের অলিগলি, ছোট্ট ক্যাফে কিংবা রাস্তার ধারের বুলঁজারিগুলোতে সকালবেলার যে সুবাস ভেসে বেড়ায়, তার বড় অংশ জুড়ে থাকে সদ্য বেক করা বাগেট আর মাখন-ঘ্রাণে ভরা কোয়াসো। বাইরে মুচমুচে, ভেতরে নরম বাগেটের এক টুকরো ছিঁড়ে মুখে দিলেই বোঝা যায় কেন এটি ফরাসি জীবনের প্রতীক। আর স্তরে স্তরে গড়া সোনালি কোয়াসোÑএক কাপ কফির সঙ্গে যেন স্বর্গীয় মিলন।
ভ্রমণে কেবল দর্শনীয় স্থান দেখাই সব নয়; সেই দেশের স্বাদ-গন্ধও অনুভব করা জরুরি। ফ্রান্সে এসে তাই ল্যুভর বা আইফেল টাওয়ার দেখার পাশাপাশি এক সকালে স্থানীয় বেকারিতে ঢুকে উষ্ণ বাগেট আর কোয়াসো চেখে দেখা চাই-ই। কারণ এই সরল খাবার দু’টির মধ্যেই লুকিয়ে আছে ফরাসি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর দৈনন্দিন জীবনের সহজ সৌন্দর্য।
চলাচল ও বাজেট টিপস
কয়েক মাস আগে হোটেল বুকিং দিলে খরচ কম। উইকেন্ডে ভাড়া বেশি-সম্ভব হলে সপ্তাহের মাঝামাঝি থাকুন। নেভিগো পাস নিলে গণপরিবহনে সুবিধা। কম খরচে অন্য শহরে যেতে বাস সার্ভিস ব্যবহার করা যায়।
রোমান্টিকতার বাইরে
প্যারিস কি শুধু প্রেমের শহর? না। এটি প্রতিবাদের শহর, শিল্পের শহর, বিপ্লবের শহর। দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতি যেন সামাজিক বক্তব্য। ক্যাফের আড্ডায় রাজনীতি, দর্শন, সাহিত্য।
এ শহর আপনাকে ভাবতে শেখাবে। ভালোবাসতে শেখাবে। আবার সতর্কও করবে। শেষ রাতে আবার গেলাম সেইন নদীর ধারে। দূরে আইফেল টাওয়ার ঝলমল করছে। বাতাসে হালকা শীত।
মনে পড়ে যায় কবির সেই পঙ্ক্তিÑ“অর্ধেক নগরী তুমি, অর্ধেক কল্পনা।”
প্যারিসকে ছেড়ে যাওয়া মানে কেবল একটি শহর ছাড়া নয়Ñএকটি অনুভূতি, একটি আলো, একটি অসমাপ্ত গল্প রেখে যাওয়া।
বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন কে না দেখে? যদি কখনো সুযোগ আসে, প্যারিসকে শুধু চোখে নয়Ñমনে দেখবেন। কারণ এই শহর দেখা যায় না, অনুভব করতে হয়।
প্যারিসÑপ্রেমের, শিল্পের, আলোর এবং জীবনের শহর।
লেখক: সাংবাদিক ও লেখক




কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন