প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রই সুশাসনের শেষ কথা নয়। প্রয়োজন আলোচনামূলক গণতন্ত্রের। যাতে দৃশ্যমান হবে দেবো-নেবো, মিলিব-মেলাবো: আলাপের গণতন্ত্রের দিশা। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের গতি এমন বহুত্ববাদী ও অন্তর্ভূক্তিমূলক পথে যত দ্রুত এগিয়ে যাবে, ততই সুশাসনের সৌধ মজবুত হবে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, মানবসভ্যতার এক অনন্য কাব্যিক আহ্বান—“দেবো আর নেবো, মিলিবো মেলাবো”—শুধু একটি পঙ্ক্তি নয়; এটি একটি সভ্যতাগত নৈতিকতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই আহ্বানের মধ্য দিয়ে আমাদের শিখিয়েছেন পারস্পরিকতা, বিনিময় ও সংহতির এক বিশ্বজনীন দর্শন। আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায়, এই চেতনা নতুন করে ফিরে দেখার দাবি রাখে।
একইসঙ্গে সদ্য প্রয়াত জার্মান দার্শনিক ইউর্গেন হাবারমাস আমাদের গভীরভাবে স্মরণ করিয়ে দেন—গণতন্ত্রকে যদি আমরা কেবল ব্যালট বাক্সে সীমাবদ্ধ করি, তবে তার প্রাণশক্তিকে সংকুচিত করি। সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সরকার গঠন অবশ্যই গণতন্ত্রের একটি অপরিহার্য উপাদান, কিন্তু সেটিই এর চূড়ান্ত রূপ নয়। প্রকৃত গণতন্ত্র হলো এক চলমান, জীবন্ত ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া, যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে আলাপ, যুক্তি এবং সমঝোতার সংস্কৃতি।
হেবারমাসের আলোচনামূলক গণতন্ত্র (deliberative democracy) ধারণা অনুযায়ী, নাগরিকরা কেবল ভোটার হিসেবে নয়, বরং যুক্তিনির্ভর মতপ্রকাশকারী সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে ভূমিকা রাখে। এখানে সিদ্ধান্ত কেবল সংখ্যার জোরে নয়, বরং যুক্তির শক্তিতে গড়ে ওঠে। মানুষ তাদের নিজস্ব মতামত তুলে ধরে, অন্যের যুক্তি মনোযোগ দিয়ে শোনে এবং এই পারস্পরিক বিনিময়ের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে একটি যৌথ উপলব্ধি বা ঐকমত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করে।
এই প্রক্রিয়ায় ‘সংলাপ’ কেবল আনুষ্ঠানিক আলোচনা নয়, এটি একটি নৈতিক চর্চা—যেখানে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা এবং সত্য অনুসন্ধানের আন্তরিকতা অপরিহার্য। হেবারমাস যে “public sphere” বা জনপরিসরের কথা বলেন, তা এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে নাগরিকরা মুক্তভাবে মতবিনিময় করতে পারে, ক্ষমতার ভয় বা চাপ ছাড়াই যুক্তি উপস্থাপন করতে পারে। এই জনপরিসরই গণতন্ত্রের প্রকৃত প্রাণকেন্দ্র।
অতএব, গণতন্ত্র কেবল একটি নির্দিষ্ট দিনের ভোটগ্রহণে সীমাবদ্ধ নয় বা কাউকে সরকারে বসিয়ে দিলেই শেষ হয় না, বরং এটি প্রতিদিনের কথোপকথনে, বিতর্কে, মতবিনিময়ে এবং সমঝোতার চর্চায় বিকশিত হয়। এখানে ঐকমত্য কোনো চাপিয়ে দেওয়া ফল নয়, বরং একটি ধীর, জটিল এবং মানবিক প্রক্রিয়ার অর্জন—যেখানে “আমি” এবং “অন্য” মিলিত হয়ে “আমরা”-তে রূপান্তরিত হয়।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে গণতন্ত্র কেবল একটি যান্ত্রিক রাজনৈতিক পদ্ধতি হয় না, বরং একটি সাংস্কৃতিক ও নৈতিক অনুশীলনে চলমান থাকে—যেখানে মানুষের কণ্ঠ, যুক্তি এবং পারস্পরিক শ্রবণই গড়ে তোলে ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই সামাজিক ব্যবস্থা। এবং গণতন্ত্র পরিসর পায় ভোটের বাইরের নিত্যদিনের আলাপের ভিতরে।
দেখা গেছে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রায়ই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায়—কে জিতবে, কে হারবে। কে ক্ষমতায় যাবে আর কে যাবে না, এই বৃত্তে। কিন্তু হেবারমাসের ভাষায়, গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে “deliberative democracy”-তে—অর্থাৎ আলোচনামূলক গণতন্ত্রে। এখানে নাগরিকরা শুধু একদিনের ভোটার নয়; তারা প্রতিদিনের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী।
তারা যুক্তি দেয়। তারা প্রশ্ন তোলে। তারা মতবিনিময়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছায়।
এই প্রক্রিয়ায় “দেবো আর নেবো” হয়ে ওঠে গণতান্ত্রিক আচরণের ভিত্তি—আমি আমার মত দেবো, অন্যের মত গ্রহণ করবো এবং সংলাপের মাধ্যমে একটি সমন্বিত অবস্থানে পৌঁছাবো। এভাবেই ‘মিলিবো মেলাবো’ বহুত্ববাদের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে।
বাংলাদেশ একটি বহুমাত্রিক সমাজ—ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক মতাদর্শের বৈচিত্র্যে ভরপুর। এই বাস্তবতায় “মিলিবো মেলাবো” কেবল একটি নৈতিক আহ্বান নয়; এটি টিকে থাকার শর্ত। গণতন্ত্রকে সৃজনশীল, সজিব এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিজয়ী ও জীবন্ত রাখার পূর্ব শর্ত।
কারণ, বহুত্ববাদী গণতন্ত্র মানে—ভিন্নমতকে সহ্য করা নয়, বরং স্বীকৃতি দেওয়া। বিরোধিতাকে দমন নয়, বরং সংলাপে অন্তর্ভুক্ত করা। সংখ্যাগরিষ্ঠতার আধিপত্য নয়, বরং অংশগ্রহণমূলক ঐক্য। রবীন্দ্রনাথের “মেলাবো” এখানে সক্রিয় রাজনৈতিক দায়িত্বে রূপ নেয়—বিভক্ত সমাজকে সংযুক্ত করে। দ্বন্দ্বকে সংলাপে রূপান্তর করে। রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে আস্থার সেতু গড়ে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় গণতান্ত্রিক সংকট ও সম্ভাবনার আলোকে আলোচনামূলক গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া অন্য পথ নেই। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আজ যে সংকটগুলো স্পষ্ট—বিরোধী মতের প্রতি অসহিষ্ণুতা, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং গণমাধ্যম ও জনপরিসরের সংকোচন। এসবই মূলত সংলাপের অভাবের লক্ষণ। এখানে হেবারমাসের “public sphere” ধারণা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক—একটি মুক্ত জনপরিসর, যেখানে নাগরিকরা নির্ভয়ে মত প্রকাশ করতে পারে এবং যুক্তির ভিত্তিতে বিতর্ক করতে পারে। এমন পরিস্থিতি জরুরি ভিত্তিতে উদ্ভব হওয়া দরকার।
বাংলাদেশে যদি এই জনপরিসর শক্তিশালী করা যায়—বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজে সক্রিয় ও সরব করা যায়, তাহলে “মিলিবো মেলাবো” বাস্তব রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে। দেবো-নেবোর নৈতিকতা তখন ক্ষমতার বিকল্প ভাষা খুঁজে পেয়ে সমন্বয়ের ভিত্তি রচনা করতে পারবে। এমন রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-নৈতিকতা গণতন্ত্রকে নতুন ও বহুমুখী অর্থ দেয়—যাতে ক্ষমতা নয়, সেবা। আধিপত্য নয়, অংশীদারিত্ব। প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, সহাবস্থান।
বাংলাদেশের জন্য তাই আলাপের রাজনীতি জরুরি এবং ঐক্যের পরিসর সকলের জন্যেই কল্যাণকর ও প্রত্যাশিত। আজকের বাংলাদেশে প্রয়োজন একটি নতুন রাজনৈতিক কল্পনা—যেখানে গণতন্ত্র মানে শুধু নির্বাচন নয়,
বরং একটি চলমান সংলাপ, যেখানে ভিন্নতা মানে বিভাজন নয়,
বরং সমৃদ্ধি। রবীন্দ্রনাথের “দেবো আর নেবো, মিলিবো মেলাবো”
এবং হেবারমাসের আলোচনামূলক গণতন্ত্র—এই দুইয়ের সম্মিলন আমাদের সামনে এক নতুন পথ খুলে দেয়।
এটি এমন এক পথ—যেখানে নাগরিকরা শুধু শাসিত নয়, বরং সহ-নির্মাতা;
যেখানে রাষ্ট্র শুধু ক্ষমতার কাঠামো নয়, বরং সংলাপের মঞ্চ এবং যেখানে গণতন্ত্র কেবল ব্যালট বাক্সে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষের হৃদয়, বুদ্ধি ও প্রতিদিনের কথোপকথনে বিকশিত, সজিব ও শক্তিশালী হতে পারবে।
লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)
আলোচনামূলক গণতন্ত্রের প্রত্যাশা
ড. মাহফুজ পারভেজ
মত-মতান্তর
২ মাস আগে
১৯ মার্চ (বৃহস্পতিবার), ২০২৬, ৯ঃ১২ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
