ছোটবেলার সেই ঈদ আনন্দ এখনো খুঁজে ফিরি

ছোটবেলার সেই ঈদ আনন্দ এখনো খুঁজে ফিরি

ফন্ট সাইজ:

প্রত্যেক ধর্ম মতের অনুসারীদের নানা আনন্দ উৎসব থাকে। সেই আনন্দ আয়োজন তারা নানাভাবে উদ্‌যাপন করে থাকেন। ধর্মীয় উৎসবের নির্মল আনন্দ মানুষের জীবনে স্মৃতি হয়ে থাকে। ইসলাম ধর্মে অকারণ আনন্দ উৎসবের কোনো স্থান নেই। তাই বলে ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা আনন্দ উৎসব থেকে বঞ্চিত- তা কিন্তু নয়। তারাও নানা আনন্দ আয়োজনে মিলিত হয়।

ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জন্য যে দু’টি সর্বজনীন আনন্দ-উপলক্ষ রয়েছে তার মধ্যে ঈদুল ফিতর অন্যতম। তবে যেকোনো বিচারেই মুসলমানদের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মীয় আনন্দ উৎসব হচ্ছে ঈদুল ফিতর। ঈদুল ফিতরের এক মাস কঠোর সিয়াম সাধনার পর রোজা ভঙ্গের আনন্দই হচ্ছে ঈদুল ফিতর। প্রতিটি ধর্মপ্রাণ মুসলমান নর-নারী ঈদুল ফিতরের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকে। ইসলাম ধর্মের ৫টি মৌলিক স্তম্ভের অন্যতম হচ্ছে পবিত্র রমজান মাস। রমজান মাসে ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ এক মাস কঠোর সিয়াম সাধনার মাধ্যমে সংযম সাধনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। রোজা মানুষকে অনুধাবন করায় না খেয়ে থাকা বা ক্ষুধার্তের কষ্ট কতোটা গভীর। একজন মানুষ যদি সঠিকভাবে এক মাস রোজা পালন করেন তাহলে তার পক্ষে দরিদ্র মানুষের ক্ষুধার কষ্ট অনুধাবন করা সম্ভব হয়। মহান আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের একটি চমৎকার ব্যবস্থা বা পদ্ধতি হচ্ছে রোজা। নাগালের মধ্যে প্রচুর খাদ্যের সমারোহ থাকলেও রোজাদার ব্যক্তি তা স্পর্শ করেন না। আল্লাহর ভয়ে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও একজন মানুষ সারা দিন কোনো খাবার বা পানীয় গ্রহণ করেন না। দরিদ্র এবং ক্ষুধার্ত মানুষের না খেয়ে থাকার কষ্ট অনুধাবনের জন্য এর চেয়ে ভালো উপায় আর কী হতে পারে।

ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে প্রতিটি মুসলিম নর-নারীর নানা ধরনের আনন্দময় স্মৃতি থাকে। আমার জীবনেও ঈদকে ঘিরে আনন্দ-বেদনার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। অবসর সময়ে এসব ঈদ স্মৃতি আমাকে আন্দোলিত করে। জীবনে নানাভাবে ঈদ আনন্দ উপভোগ করেছি, কিন্তু ছোটবেলায় ঈদের যে আনন্দ পেয়েছি তা আর কখনো পাইনি। ছোটবেলার ঈদ আনন্দের কথা মনে হলে এখনো স্মৃতি কাতর হয়ে পড়ি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে ১৯৪২ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর ফেনীর অদূরে ধোনসাহদ্দা গ্রামে আমার জন্ম। তৎকালীন মহকুমা শহর ফেনীতে যখন বোমা নিক্ষিপ্ত হয় তখন আমার বয়স দুই বছরের বেশি হবে না। সেই সময় বোমার আঘাত থেকে আমাকে রক্ষা করার জন্য মা ও দাদি আমাকে নিয়ে বেশ কয়েকবার খাটের নিচে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। একথা আমি বহুবার শুনেছি। সাত ভাই-বোনের মধ্যে আমি ছিলাম সবার বড়। বাবা ছিলেন আইনজীবী, মা গৃহিণী। বাবা ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন মানুষ। তিনি আমাদের সবাইকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন কিন্তু তার ভালোবাসার প্রকাশ ঘটতো খুবই কম। আমরা বাবাকে সমীহ করে চলতাম। আমার জীবনে বাবাকে মাত্র তিনবার কাঁদতে দেখেছি। প্রথমবার বাবাকে কাঁদতে দেখি ১৯৬০ সালে, যে দিন আমার দাদি মারা যান। দ্বিতীয়বার ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য যখন সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে গমন করি। সেই সময় আমাকে বিদায় জানানোর সময় বাবা কেঁদেছিলেন। তৃতীয়বার দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমি যখন ৫ই জানুয়ারি (১৯৭২) ফেনীতে ফিরে আসি তখন আমাকে জড়িয়ে ধরে বাবা অঝোরে কেঁদেছিলেন। বাবা ছিলেন অত্যন্ত বলিষ্ঠ চরিত্রের একজন মানুষ। কোনো অন্যায়কে তিনি প্রশ্রয় দেননি, নিজেও কখনো করেননি। তিনি সব সময় মানুষের কল্যাণ চিন্তা করতেন। এলাকার মানুষ বাবাকে খুব শ্রদ্ধা করতেন ও ভালোবাসতেন। আমার বাবা এলাকার বিভিন্ন জনহিতকর কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আবার বাবা-মা দু’জনই খুব ধর্মপ্রাণ মানুষ ছিলেন; তবে ধর্মান্ধ ছিলেন না। তারা ছিলেন উদার মানসিকতার মানুষ। বাবা-মা আমাদের সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করার কথা বলতেন।

আমাদের গ্রামটি বেশ বড় এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর ছিল। সারিবদ্ধ বসতবাড়ি, বিস্তৃত ধান ক্ষেত, ফসলের জমি এবং ছোট-বড় পুকুর-জলাশয় নিয়ে আমাদের গ্রামটি এখনো কালের সাক্ষী হয়ে আছে। গ্রামের দক্ষিণ-পূর্বদিকে একটি নদী ছিল। শৈশবে এটাই ছিল আমার দেখা প্রথম নদী। আমার শৈশব কেটেছে এই গ্রামে এবং ফেনী শহরে। গ্রামীণ রীতি অনুযায়ী, আমার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় বাড়িতে গৃহশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে। এরপর তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার মাধ্যমে আমার আনুষ্ঠানিক শিক্ষা জীবন শুরু হয়। স্কুলটি ফেনী শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ছিল। ১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসে আমি ফেনী হাই স্কুল সংলগ্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর আমরা ফেনী শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করি। কিন্তু আমার দাদি স্বামীর ভিটে ছেড়ে ফেনী শহরে আসতে কোনোভাবেই রাজি ছিলেন না। তাই তিনি গ্রামের বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। আমরা সময় এবং সুযোগ পেলেই গ্রামের বাড়িতে দাদির কাছে ছুটে যেতাম। মেঠো পথ পাড়ি দিয়ে অত্যন্ত কষ্ট করে গ্রামের বাড়িতে যেতে হতো। কিন্তু বাড়িতে যাবার পর দাদির আদর-আপ্যায়নে পথের সব ক্লান্তি মুহূর্তের মধ্যেই ভুলে যেতাম। গ্রামের যারা অবস্থাপন্ন এবং শহরে কর্মসংস্থান করেন তারা এক পর্যায়ে শহরে বসবাস শুরু করেন। তবে শহরে বাস করলেও গ্রামের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ কখনোই বিচ্ছিন্ন হতো না। শহরে বসবাস করলেও তাদের আয়ের বড় অংশই আসতো গ্রাম থেকে। যারা শহরে বাস করতেন তারা গ্রামের বিত্তবান পরিবার হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন। কৃষি খামার থেকে তাদের খাবার এবং অন্যান্য উপকরণের জোগান আসতো। আমাদের বাসা থেকে ফেনী কলেজ ও হাই স্কুলের দূরত্ব ছিল সিকি মাইলের মতো। এটুকু দূরত্ব আমরা পায়ে হেঁটেই যাতায়াত করতাম। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষা শেষ করার পর ফেনী হাই স্কুলের প্রাইমারি সেকশন বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আমরা যারা চতুর্থ শ্রেণি থেকে ৫ম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছিলাম তাদের পার্শ্ববর্তী পিটিআই স্কুলে ভর্তি হতে হলো। পঞ্চম শ্রেণি শেষ করে আমি আবারো ফিরে এলাম আমার প্রিয় ফেনী হাই স্কুলে।

আমার পিতামহ সুজাত আলী চৌধুরী একটি তালুকের মালিক হয়েছিলেন। প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট দিনে অর্থাৎ ৩০ চৈত্র প্রজারা বকেয়া খাজনা পরিশোধ করতেন। খাজনা প্রদানের জন্য প্রজারা আমাদের বাড়িতে আসতেন। ভারত বিভক্ত হওয়ার পর ১৯৫০ সালে ‘তধসরফধৎর অনড়ষরঃরড়হ অপঃ ড়ভ ১৯৫০’ এর আওতায় জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে আমাদের তালুকও চলে যায়। আমরা যদিও এ জন্য ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলাম, কিন্তু তালুকদারি চলে যাবার পর আমাদের আয়ের একটি বড় উৎস বন্ধ হয়ে যায়। জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ হওয়ার পর রায়তগণ জমির মালিকে পরিণত হয়। এটা ছিল স্বাধীন পাকিস্তানে ভূমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের সংস্কার। ১৯৫০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ হলেও পশ্চিম পাকিস্তানে কিন্তু জমিদারি প্রথা বহাল থাকে। পশ্চিম পাকিস্তানের জমিদারগণ ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী। তাই সরকার পশ্চিম পাকিস্তানে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ করার সাহস পায়নি। পূর্ব পাকিস্তানে যারা জমিদার ছিলেন তাদের অধিকাংশই ছিলেন হিন্দু। দেশ ভাগের পর তারা ভারতে চলে যান। আর এই অঞ্চলে যারা মুসলমান জমিদার ছিলেন তারা তুলনামূলকভাবে দুর্বল ছিলেন। ফলে আমাদের এখানে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ করা খুব একটা কঠিন হয়নি।

যখন জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয় তখন আমি ছিলাম খুবই ছোট। জমিদারির জটিল বিষয়গুলো বুঝার সময় তখনো আমার হয়নি। জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের পর একদিন আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমাদের বাড়িতে আর পুণ্যাহ (খাজনা প্রদানের অনুষ্ঠান) হয় না কেন? বাবা বলেছিলেন, জমিদারি উঠে গেছে। এখানে একটি ব্যক্তিগত বিষয় উল্লেখ করতে চাই। আমি তিনটি শাসনামল প্রত্যক্ষ করেছি। জন্মগতভাবে আমি বৃটিশ নাগরিক। তারপর ভারত বিভক্ত হলে পাকিস্তানের নাগরিকত্ব পাই। সর্বশেষ ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করি। মাতৃভূমির স্বাধীনতা আন্দোলনে আমি কিছুটা হলেও অবদান রাখতে পেরেছি। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা।

গ্রামীণ জীবনে আমাদের সময় কেটেছে অনেকটাই নিরানন্দ পরিবেশে। আমাদের মতো রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে কোনো ধরনের সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ ছিল না। পারিবারিকভাবে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের প্রতি জোর দেয়া হতো। বিশেষ করে রোজা রাখা এবং নিয়মিত নামাজ আদায়ের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হতো। বাবা আমাদের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালনের জন্য উপদেশ দিতেন কিন্তু কখনোই এ ব্যাপারে জোরাজুরি করতেন না। আমার স্বাস্থ্য খারাপ ছিল বলে আমাকে রোজা রাখার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা হতো। এ নিয়ে আমার দুঃখের অন্ত ছিল না। কারণ আমার সমবয়সীরা রোজা রাখতো কিন্তু আমাকে রোজা রাখতে দেয়া হতো না। পারিবারিক পরিবেশে আমরা সুনীতি চর্চা করতাম। পরবর্তী জীবনে সেগুলোর প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করেছি। কতোটুকু সফল হয়েছি তা বলতে পারবো না। তবে আমার মাঝে যদি কোনো সৎ গুণ থাকে তার বেশির ভাগই পরিবার থেকেই অর্জন করা।

পারিবারিকভাবে আমরা ইসলামী রীতি-নীতি মেনে চলার চেষ্টা করতাম। আমার মনে আছে, খুব ছোটবেলায় আমাদের গ্রামের মসজিদে ঈদের নামাজ হতো। এলাকার লোকজন দল বেঁধে ঈদের নামাজ আদায় করতে যেতেন। ১৯৫২ সালে আমি যখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি তখন প্রথমবার বাবার হাত ধরে ঈদের নামাজ আদায় করার জন্য গমন করি। এই স্মৃতি আমার মনে এখনো জাগ্রত আছে। তার আগে আমি ঈদের নামাজ আদায় করার জন্য গিয়েছি কিনা তা মনে করতে পারি না। তখন আমি ফেনী শহরে আমাদের বাড়িতে অবস্থান করছিলাম। প্রথম ঈদের নামাজ আদায়ের অনুভূতি সম্পর্কে আমি কোনো মন্তব্য করতে পারবো না। কারণ সেই সময় আমি ঈদ কি তা খুব একটা বুঝতাম না। আমার কাছে ঈদ ছিল শুধু আনন্দের উপলক্ষ মাত্র। তবে এটা আমার মনে আছে প্রথমবার ঈদের নামাজ পড়তে গিয়ে আমি বেশ আনন্দিত হয়েছিলাম।

ছোটবেলায় ঈদের আনন্দ ছিল অন্যরকম। প্রত্যেক বাড়িতে ভালো ভালো রান্না হতো। সবাই খুব আনন্দ করে সেসব খাবার খেতো। আর একটি বিষয় আমার মনে বেশ দাগ কেটে আছে, তাহলো ঈদের আগের দিন ছোট ছোট বাচ্চারা দল বেঁধে ঈদের চাঁদ দেখার আনন্দ উপভোগ করা। যে আগে চাঁদ দেখতে পেতো সে যেনো রাজ্য জয় করার মতো আনন্দ পেতো। ঈদের চাঁদ দেখার পর থেকে ঈদের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেতো। বাড়ির সবার জন্য ঈদের উপহার হিসেবে নতুন জামা-জুতা কেনা হতো। আমরা ঈদের জামা-কাপড় লুকিয়ে রাখতাম। ঈদের দিন সকালবেলা গোসল করে নতুন জামা-কাপড় পরিধান করে বড়দের সঙ্গে ঈদের জামাতে গমন করতাম। মহিলারা গৃহে অবস্থান করে নানা ধরনের রান্নার আয়োজন করতেন। ঈদের সময় বিভিন্ন এলাকায় বাচ্চাদের ‘সালামি’ দেয়ার রীতি প্রচলিত আছে। যদিও আমাদের এলাকায় ব্যাপকভাবে ঈদের সালামি প্রদানের রীতি প্রচলিত ছিল না। কোনো কোনো পরিবারে ঈদের সালামি দেয়া হতো। আমি সালামি পেয়েছি সে কথা এখনো স্পষ্ট মনে আছে। কিন্তু সালামি বাবদ কতো পেয়েছিলাম তা সঠিকভাবে মনে নেই। তবে কাগজের নোট যে পাইনি তা বেশ ভালোভাবেই মনে আছে।

ঈদের দিন সকালবেলা বাবা খুব তাড়া দিতেন দ্রুত তৈরি হয়ে নামাজ আদায়ের জন্য ঈদের মাঠে যাবার জন্য। মিজান ময়দান বলে আমাদের শহরে একটি বড় মাঠ ছিল, সেখানে প্রতি বছর ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হতো। আমরা সেখানে ঈদের জামাতে অংশ নিতাম। ফেনী শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিগণ জামাতে অংশ নিতেন। আমার মনে আছে, ফেনী আলিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ওয়ায়দুল হক সাহেব ঈদের জামাতে ইমামতি করতেন। মিজান ময়দানে প্রতি বছর বিশাল ঈদের জামাত হতো। মোনাজাত হতো খুব দীর্ঘ সময় ধরে। মোনাজাতে মুসলিম উম্মার জন্য দোয়া করা হতো। ঈদের আনুষ্ঠানিকতা আমার মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে। ঈদের দিন সব পরিবারেই সাধ্যানুসারে ভালো খাবার রান্না করা হতো। আমরা আত্মীয়-স্বজনের বাসায় বেড়াতে যেতাম। অন্যেরাও আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসতো। সব মিলিয়ে ঈদের দিন এক আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি হতো। তৃতীয় শ্রেণিতে থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সময় আমি প্রতি বছরই বাবার সঙ্গে ঈদের জামাতে যেতাম। এখন আমি সাধারণত বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করি। আমার ছেলে এবং বাড়ির ম্যানেজার জামাতে আমার সঙ্গী হয়ে থাকে।

ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের ব্যাপারে আমি বরাবরই উদার। এই উদারতা পারিবারিক সূত্রেই পেয়েছি। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের ক্ষেত্রে পারিবারিক উদারতা পরবর্তী জীবনে আমার চলার পথে বিরাট অবদান রেখেছে। কিছু কিছু আচরণ বিদ্যালয়ে শেখা যায় না। এগুলো পরিবার থেকেই শিখে আসতে হয়। আমার মধ্যে যদি উদার মানসিকতা থেকে থাকে তা আমার পরিবার থেকেই হয়েছে। আমার বাবা-মা খুবই উদার প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। তাদের সেই উদারতা হয়তো কিছুটা আমার মাঝেও সঞ্চারিত হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালিন সময়ের একটি স্মৃতি আমি এখানে প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করতে চাই। তখন আমি এবং আমার মতো আরও অনেকে প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। সেই সময় ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালনের বিষয় আমাদের মাঝে খুব একটা উৎসাহ ছিল না। একবার ঈদের দিনে আমার এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে তাকে আমি পাইনি। জানতে পারলাম সে ঈদের নামাজ আদায় করতে গেছে। আমি ফিরে আসার সময় নিউমার্কেটের কাছে এসে তার দেখা পাই। আমি জানতে চাইলাম আপনি কোন জামাতে গিয়েছিলেন? তিনি উত্তর দিলেন, আমি এখানকার জামাতে ছিলাম। অর্থাৎ তিনি জামাতে যান নি। নিউমার্কেট এলাকাতেই হাঁটাহাঁটি করেছেন। তার বাড়িতে সবাই জানে সে ঈদের জামাতে গেছে। আসলে সে গিয়েছিল নিউমার্কেট এলাকায়। তিনি বলেন, ঈদ অনুষ্ঠান তার নিকট খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ যে দেশের মানুষ খেতে পায় না, ঘরে ঘরে হাহাকার, সে দেশে ঈদ পালন করে কি লাভ?

আমি যদি আমার ঈদ আনন্দ বা অভিজ্ঞতার কথা বলতে চাই তাহলে বাহরাইনের কথা না বললেই নয়। আমি ২০০৩ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বাহরাইনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করি। এই সময়ে আমি ঈদ উদ্‌যাপনের যে অভিজ্ঞতা অর্জন করি তা চিরদিন আমার স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থাকবে। বাহরাইনে রাষ্ট্রদূত থাকা অবস্থায় দূতাবাসের উদ্যোগে প্রতি বছর ঈদে বিশেষ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। সংবর্ধনা অনুষ্ঠান দু’পর্বে বিভক্ত থাকতো। প্রথম পর্বে ভিআইপিদের আপ্যায়িত করা হতো। বাহরাইনে অবস্থিত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতগণ ঈদের দিন আমন্ত্রিত হয়ে রাষ্ট্রদূতের বাড়িতে আসতেন। তাদের জন্য বিভিন্ন রকম খাবারের ব্যবস্থা করা হতো। দ্বিতীয় পর্ব সবার জন্য উন্মুক্ত থাকতো।

বাহরাইনে কর্মরত বাংলাদেশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাতে যোগদান করতেন। তখন এক অনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি হতো। রাষ্ট্রদূতের বাসভবন যেনো মিনি বাংলাদেশে পরিণত হয়েছে। বাহরাইন একটি মুসলিম রাষ্ট্র। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ ঈদ উদ্‌যাপন করেছি বাহরাইনে। দুই ঈদেই রাষ্ট্রদূতের বাড়ি ঈদ উদ্‌যাপনের জন্য উন্মুক্ত থাকতো, যাকে ওপেন হাউজ বলা হতো। ওপেন হাউজের সময় বাহরাইনে কর্মরত যে কোনো বাংলাদেশি সেখানে প্রবেশ করে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে পারতো। ঈদের দিন দীর্ঘ সময় ওপেন হাউজে অতিথি সমাগম ঘটতো। এভাবে ঈদ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ইতিবাচক ইমেজ তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
ঈদ শুধু একটি আনন্দ অনুষ্ঠান মাত্র নয়। ঈদের তাৎপর্য অনেক গভীরে। ঈদ আমাদের মানবতার শিক্ষা দেয়। ধর্মীয় বিবেচনায় বিত্তবান-বিত্তহীনের মধ্যে কোনো ব্যবধান নেই। সবার অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি মানবিক সমাজ গঠন করাই ঈদের মূল উদ্দেশ্য। সকল ভেদাভেদ ভুলে এক সঙ্গে মানবিক সমাজ গঠনের পথে এগিয়ে যেতে হবে এটাই ঈদের প্রকৃত শিক্ষা।


লেখক: সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন