ঈদে নতুন জামা-কাপড় পরতে না পারলে সারা দিন মন খারাপ থাকে। জামা না পেয়ে কাঁদলেও বাবা কোনো কথাই শোনে না- এমনটাই বলছিল চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার একলাছপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পের শিশুসন্তান মোবারক উল্যা (১০)। ২/১ দিন পরেই ঈদ। ঘরে ঘরে উৎসবের আমেজ। ধনী-গরিব সবাই যেন উৎসবের জোয়ারে ভাসছে। কিন্তু চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার কয়েকটি ভূমিহীন আশ্রয়ণ প্রকল্পবাসী ও বেড়িবাঁধে আশ্রয় নেওয়া অধিবাসীরা ঈদ আনন্দ থেকে বঞ্চিত। ঈদ এদের জীবনে বাড়তি আনন্দ বয়ে আনে না। বছরের অন্যান্য দিনের মতোই কাটায় ঈদের দিনটি। মতলব উত্তর উপজেলার কয়েকটি ভূমিহীন আশ্রয়ণ প্রকল্পের ২ সহস্রাধিক শিশু-কিশোর ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত। তাদের মাঝে নেই নতুন জামা-কাপড় পরে ঈদ উদ্যাপনের পরিকল্পনা। বিভিন্ন সময়ে নদীভাঙনের শিকার, দরিদ্র ও ভূমিহীন উপজেলার ১১টি আশ্রয়ণ প্রকল্প ও বাঁধে আশ্রয় নেয়া হতদরিদ্র পরিবারগুলোর মাঝে নেই ঈদকে ঘিরে বাড়তি কোনো আয়োজন। একসময় মেঘনার ভাঙনে সব হারিয়ে এখলাছপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঠাঁই পেয়েছে ১৩০টি পরিবার। এই ১৩০ পরিবারের এক হাজার ৩শ’রও বেশি মানুষ দীর্ঘদিন ধরে দূরবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। এছাড়াও উপজেলার বেলতলী আশ্রয়ণ প্রকল্প, দুর্গাপুর আশ্রয়ণ প্রকল্প, চরউমেদ আশ্রয়ণ প্রকল্প, ছোট চরকালিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের শিশুরাও ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত। সরজমিন এখলাছপুর, ছোট চরকালিয়া, বেলতলী ও দুর্গাপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায়, আশ্রয় নেয়া পরিবারগুলো বেশির ভাগই নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে।
এখন চাঁদপুরে মেঘনা নদীর মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল থেকে হাইমচরের চর ভৈরবী পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটারে নদীতে সব ধরনের মাছ ধরার উপর চলছে ২ মাসের (মার্চ-এপ্রিল) নিষেধাজ্ঞা। এই ৭০ কিলোমিটারের মধ্যে মতলব উত্তর উপজেলার ষটনল থেকে আমিরাবাদ পর্যন্ত ২৫ কিলোমিটার। আশ্রয়ণ প্রকল্পবাসী ও সেচ প্রকল্পের বেড়িবাঁধে আশ্রয় নেয়া উপজেলার বিভিন্ন আশ্রয়ণ প্রকল্প ও বেড়িবাঁধে আশ্রয় নেয়া মানুষদের অভাব-অনটনের সঙ্গে বেঁচে থাকার লড়াই তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। দিন এনে দিন খেতেই কষ্ট। তাদের আবার ঈদে নতুন কাপড়। পোলাউ-কোরমা ও সেমাই ভাগ্যে জোটবে কি করে? তাই শতকরা ৯০ ভাগ শিশুর অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের ঈদের জামা-কাপড় কিনে দিতে পারেনি। আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা মজিদা বেগম বলেন, তার স্বামী নদীতে মাছ ধরে যা পায় তা দিয়ে পাঁচ সন্তান নিয়ে খেয়ে-পরে কোনো রকম বেঁচে আছেন। নদীতে এখন মাছ ধরা নিষেধ, পরিবারের আহার জোগাতে পারে না, আবার সন্তানদের নতুন জামা-কাপড় দেবে কোথা থেকে। আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাস করে ইদ্রিস আলী (১৩) বলেন, কোনো ঈদেই সে নতুন জামা-কাপড় পায় না। ঈদে নতুন জামা-কাপড় পরতে না পারলে সারাদিন মন খারাপ থাকে। জামা না পেয়ে কাঁদলেও বাবা শুনেন না।
সন্তানের মন খারাপ তা যেন বাবার দেখার মতো সময়ও নেই। এখলাছপুর ইউপি চেয়ারম্যান মফিজুল ইসলাম মুন্না ঢালী জানান, আশ্রয়ণ প্রকল্পের পরিবারগুলো বেশির ভাগই জেলে হওয়ায় নদীতে দু’মাসের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় তাদের দুঃখ-কষ্ট বেশিই দেখা দেয়। তবে জেলেদের সরকারিভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে। তিনি সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ছেলে-মেয়েদের সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়ার আহ্বান জানান। মতলব উত্তর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা বিজয় কুমার দাস বলেন, আমাদের উপজেলায় ৯ হাজার ১০০ জন জেলে রয়েছে। নদীতে মাছ ধরার নিষিদ্ধ সময়ে তাদেরকে আমরা প্রতিমাসে ৪০ কেজি করে চাল দিচ্ছি।
