কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে উপমহাদেশের বৃহত্তম ঈদ জামাত আয়োজনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। সংস্কার করা হয়েছে মিনার, অজুখানা। মুসল্লিদের প্রাকৃতিক কাজ-কর্ম সারার জন্য তৈরি করা হয়েছে একটি স্থায়ী ওয়াশব্লকসহ বেশকিছু অস্থায়ী টয়লেট। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এ ঈদগাহে আসা মুসল্লিদের রাত যাপন ও আপ্যায়নের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য স্থাপন করা হয়েছে অস্থায়ী স্বেচ্ছাসেবী ক্যাম্প। প্রস্তুত রাখা হয়েছে ফায়ার সার্ভিসসহ একাধিক মেডিক্যাল টিম। সব মিলিয়ে বৃহত্তম ঈদজামাতের জন্য ২৭৬ বছরের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহ্ ময়দান পুরোপুরি প্রস্তুত বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এবারও দূর-দূরান্ত থেকে আসা মুসল্লিদের সুবিধার্থে বাংলাদেশ রেলওয়ে ‘শোলাকিয়া এক্সপ্রেস’ নামে দু’টি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করেছে। ভৈরব বাজার-ময়মনসিংহ ও ময়মনসিংহ-ভৈরব বাজার রুটে বিশেষ ট্রেন দু’টি চলাচল করবে। বিশেষ ট্রেনের একটি ঈদের দিন সকাল ৬টায় ভৈরববাজার থেকে কিশোরগঞ্জের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসবে এবং সকাল ৮টায় কিশোরগঞ্জ পৌঁছুবে। জামাত শেষে ট্রেনটি দুপুর ১২টায় পুনরায় ভৈরববাজারের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে এবং বেলা ২টায় ভৈরববাজার পৌঁছুবে। অপর ট্রেনটি ঈদের দিন সকাল পৌনে ৬টায় ময়মনসিংহ থেকে কিশোরগঞ্জের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসবে এবং সকাল সাড়ে ৮টায় কিশোরগঞ্জ পৌঁছুবে। এ ট্রেনটিও জামাত শেষে দুপুর ১২টায় কিশোরগঞ্জ থেকে ছেড়ে যাবে এবং বেলা ৩টায় ময়মনসিংহ পৌঁছুবে।
সূত্র বলছে, শোলাকিয়া ঈদজামাতকে ঘিরে বিগত সময়ের মতো এবারও সুচারূ ও সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এজন্যে দফায় দফায় পুলিশ ও সরকারি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা ও সদস্যরা ঈদগাহ ময়দান পরিদর্শন করছেন। পুরো মাঠকে সিসি ক্যামেরার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন নজরদারির জন্য ড্রোন উড়বে শোলাকিয়ার আকাশে। মাঠ ও মাঠের আশপাশ এলাকায় ড্রোনে পর্যবেক্ষণ ছাড়াও ঈদগাহ ময়দানের বাইরে, ভেতরে ও প্রবেশ পথে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। ঈদগাহ্ ময়দান, আশেপাশের এলাকা এবং অলিগলিসহ মাঠ সংলগ্ন চারপাশের অন্তত দুই কিলোমিটার এলাকা নিয়ে আসা হচ্ছে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় আওতায়। মাঠে স্থাপন করা হয়েছে ছয়টি ওয়াচ টাওয়ার। এর চারটিতে পুলিশ বাহিনী ও দুইটিতে র্যাব বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নিয়ে ঈদজামাতের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা তদারকি করবেন। এরই মধ্যে মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে পুলিশ। সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শহর এবং আশপাশের এলাকায় বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি।
সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ান, আরআরএফসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেড় হাজারেরও বেশি সদস্য দিয়ে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেয়া হচ্ছে শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানকে। ১২ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বিভিন্ন পয়েন্টে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন। এছাড়া শহরের গুরুত্বপূর্ণ চেক পয়েন্টে চেকপোস্ট স্থাপন করা হচ্ছে। ঈদগাহ্ ময়দানের তিনটি প্রবেশপথে স্থাপিত আর্চওয়ে দিয়ে মুসল্লিদের ঢুকতে হবে। এছাড়া ব্যবহার করা হবে মেটাল ডিটেক্টর। নিশ্ছিদ্র এই নিরাপত্তাব্যুহ ডিঙিয়ে কোন অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির ঈদগাহ ময়দানে প্রবেশ একেবারেই অসম্ভব বলে মনে করছেন নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা।
সর্বশেষ প্রস্তুতি পরিকল্পনা নিয়ে বুধবার দুপুরে শোলাকিয়া ঈদগাহ্ ময়দানে স্থানীয় কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মাজহারুল ইসলামের উপস্থিতিতে প্রেস ব্রিফিং করেছে জেলা প্রশাসন। পুলিশ সুপার ড. এসএম ফরহাদ হোসেন বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে ঈদজামাত অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। মাঠের বাইরে, মাঠের ভেতরে ও প্রবেশ পথে সর্বোচ্চ ও সুচারূ নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। উড়ন্ত ড্রোন থেকে নজরদারি ছাড়াও প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, সুষ্ঠুভাবে ঈদজামাত আদায়ের লক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বিজিবি, র্যাব ও পুলিশ ফোর্সকে আইনগত দিকনির্দেশনা দেয়াসহ ম্যাজিস্ট্রেরিয়াল দায়িত্ব পালনের জন্য ঈদগাহ মাঠের বিভিন্ন পয়েন্ট ও এলাকায় ১২ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
গৃহীত প্রস্তুতির বিবেচনায় লাখ লাখ মুসল্লির অংশগ্রহণে এবারো উৎসবমুখর পরিবেশে সুন্দর ও সুচারুভাবে ঈদজামাত অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন ঈদগাহ মাঠ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা। তিনি জানান, শোলাকিয়ায় এবারের ১৯৯তম ঈদুল ফিতরের জামাত শুরু হবে সকাল ১০টায়। ঈদজামাত পরিচালনা করবেন শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের ইমাম মুফতি আবুল খায়ের মো. ছাইফুল্লাহ। এছাড়া বিকল্প ইমাম হিসেবে থাকবেন হয়বতনগর কামিল মাদ্রাসার প্রভাষক জুবায়ের ইব্নে আব্দুল হাই। উপমহাদেশের বৃহত্তম এই ঈদজামাত আয়োজনের সকল প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। সব মিলিয়ে বৃহত্তম ঈদজামাতের জন্য ২৭৬ বছরের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান পুরোপুরি প্রস্তুত।
