বেতন জটিলতার আড়ালে অ্যাকাউন্টস কর্মকর্তার ঘুষ কেলেঙ্কারি

ফন্ট সাইজ:

খাগড়াছড়িতে কৃষি ডিপ্লোমাধারী সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন প্রক্রিয়া নিয়ে জটিলতার আড়ালে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে জেলা অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, খাগড়াছড়ি জেলা অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসার অচিন্ত্য কুমার সিংহ ও তার অফিসের এসএএস সুপারিনটেনডেন্ট টুটু মারমা মিলে প্রথমে বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রায় ১৫ লাখ টাকা নিয়েছেন।

পরে আবার জনপ্রতি ২০ হাজার টাকা করে উপঢৌকন দাবি করেন। দাবি অনুযায়ী টাকা না দেয়ায় জানুয়ারি মাস থেকে সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তার বেতন বন্ধ করে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, ২০১৮ সালে সরকার কৃষি ডিপ্লোমাধারীদের ১০ম গ্রেডে উন্নীত করে। সেই অনুযায়ী জেলা অ্যাকাউন্টস অফিস ফিক্সেশনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে তারা ওই গ্রেডে বেতন-ভাতা পেয়ে আসছিলেন। তবে সমপ্রতি নানা জটিলতার অজুহাতে কৃষি ডিপ্লোমাধারীদের গ্রেড অবনমন করে বেতন কমানোর উদ্যোগ নেয় জেলা অ্যাকাউন্টস অফিস।

এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ ও জটিলতা তৈরি হয়। কর্মকর্তারা জানান, এ জটিলতা নিরসনের জন্য ঢাকায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরে কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং সমাধানের জন্য সময়ও চাওয়া হয়েছে। কিন্তু জেলা অ্যাকাউন্টস অফিস সময় না দিয়ে বেতন প্রক্রিয়া আটকে রেখেছে। এ পরিস্থিতিতে বিষয়টি সমাধানের জন্য জনপ্রতি ২০ হাজার টাকা করে উপঢৌকন দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ ওঠে।

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ৪ মাস আগে খাগড়াছড়ির ৬টি হর্টিকালচার সেন্টার, সদর কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় এবং তুলা উন্নয়ন বোর্ডের প্রায় ৩৫ জন কর্মকর্তার কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে প্রায় ১৫ লাখ টাকা নেয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই টাকা দিয়ে জেলা অ্যাকাউন্টস এন্ড ফিন্যান্স অফিসার অচিন্ত্য কুমার সিংহ তার ছেলেকে অস্ট্রেলিয়া পাঠিয়েছিলেন। তবে পরবর্তীতে নানা জটিলতার কারণে তার ছেলে দেশে ফিরে আসে। এরপর আবার নতুন করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে জনপ্রতি ২০ হাজার টাকা করে উপঢৌকন দাবি করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।

খাগড়াছড়ি সদরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নীতিভূষণ চাকমা বলেন- আমাদের বেতন প্রক্রিয়া চালু করার জন্য ৩০-৩৫ জনের কাছ থেকে প্রায় ১৫ লাখ টাকা নেয়া হয়েছিল। জেলা অ্যাকাউন্টস কর্মকর্তা মূলত তার অফিসের এসএএস সুপারিনটেনডেন্ট টুটু মারমার মাধ্যমে এসব কাজ করান। পরে আবার আমাদের কাছে জনপ্রতি ২০ হাজার টাকা করে দাবি করা হয়। আমরা টাকা না দেয়ায় জানুয়ারি থেকে আমাদের বেতন-ভাতা বন্ধ রাখা হয়েছে। বিভিন্ন তদবিরের পর বেতন পাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তবে এখনো আমরা বেতন পাইনি। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন হর্টিকালচার সেন্টারের উপ-সহকারী উদ্যান কর্মকর্তা চিংহ্লা প্রু চৌধুরী। তিনি বলেন- প্রথমে আমাদের কাছ থেকে ৩৫ হাজার টাকা করে নেয়া হয়েছিল। কয়েক মাস পর আবার ২০ হাজার টাকা করে দাবি করা হয়। আমরা দিতে অপারগতা জানালে বেতন বন্ধ করে দেয়া হয়। পরে বিভিন্ন তদবিরের মাধ্যমে আমি জানুয়ারি মাসের বেতন পেয়েছি। ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন পাইনি।

এদিকে গত ৩রা মার্চ খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীন হর্টিকালচার ও কৃষি বিভাগের বিভিন্ন কেন্দ্রে কর্মরত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও সমমানের কর্মচারীদের জানুয়ারি মাসের বেতন পরিশোধের জন্য জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নোমান হোসেন স্বাক্ষরিত একটি চিঠি জেলা অ্যাকাউন্টস অফিসে পাঠানো হয়। ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বেতন না পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটে রয়েছেন। সামনে রমজান ও ঈদুল ফিতর থাকায় দ্রুত বেতন পরিশোধের প্রয়োজন রয়েছে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে আইবাস (রইঅঝ++) সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন বলে উল্লেখ করে বকেয়া বেতন দ্রুত পরিশোধ ও ভবিষ্যতে নিয়মিত বেতন চালুর জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চাওয়া হয়।

তবে অভিযোগ রয়েছে, ওই চিঠির পরও বেতন পরিশোধ করেনি জেলা অ্যাকাউন্টস কর্মকর্তা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা একাউন্টস এন্ড ফিন্যান্স অফিসার অচিন্ত্য কুমার সিংহ বলেন-তাদের বেতন প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে কিছু ত্রুটি ছিল, এজন্য বেতন দেয়া সম্ভব হয়নি। ১৫ লাখ টাকা নেয়া এবং পরে জনপ্রতি ২০ হাজার টাকা করে দাবি করার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন-তাদের ডিডি, এডিশনাল ডিডি, কমিশনার ও জেলা পরিষদের চিফ মহোদয়ের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। আমি শুধু অফিসিয়ালি কাজ করেছি। এদিকে এসএএস সুপারিনটেনডেন্ট টুটু মারমা বলেন- আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। আপনি অফিসে এসে কথা বলেন। এরপর তিনি একাধিক ব্যক্তির মাধ্যমে এই প্রতিবেদককে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধও করিয়েছেন। খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন- অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন