পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে এবার টানা ৭ দিনের সরকারি ছুটি শুরু হয়েছে মঙ্গলবার থেকে। ঈদের ছুটিকে সামনে রেখে ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের বরণে প্রস্তুত হয়ে উঠেছে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন নগরী শ্রীমঙ্গল। আগত পর্যটকদের জন্য উপজেলার পাঁচতারকা হোটেল-রিসোর্ট ও গেস্ট হাউসগুলোতে ঘোষণা করা হয়েছে নানা আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা। পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশ, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নেয়া হয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি। হোটেল-রিসোর্টগুলোতেও চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। অনেক জায়গায় আগাম বুকিং প্রায় পূর্ণ। পর্যটকদের আকর্ষণ করতে রাখা হয়েছে বিশেষ প্যাকেজ, ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং সাংস্কৃতিক আয়োজন। দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র শ্রীমঙ্গলে ইতিমধ্যে পর্যটকদের আগ্রহ বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে শহরের বাইরে অবস্থিত বিভিন্ন রিসোর্ট ও কটেজে আগাম বুকিংয়ের চাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ঈদের ছুটিতে প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটাতে দেশ জুড়ে ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে শ্রীমঙ্গল হয়ে উঠছে অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য। পর্যটন সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, শহরের বাইরে রাধানগর গ্রাম এলাকায় থাকা প্রায় অর্ধশত রিসোর্ট ও কটেজে ২২ থেকে ২৪ তারিখ- এই তিনদিনের জন্য প্রায় ৯০ শতাংশ বুকিং ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। মূলত এই তিনদিনকেই ঈদভ্রমণের ‘পিক টাইম’ হিসেবে ধরা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, ঈদকে ঘিরে বাকি দিনগুলোতেও ধীরে ধীরে বুকিং বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত শতভাগ রুম বুকড হয়ে যাবে।
অন্যদিকে শহরের ভেতরের হোটেলগুলোতে এখনো তেমন চাপ তৈরি হয়নি। অধিকাংশ হোটেলেই এখনো প্রায় ৫০ শতাংশ বা তারও কম রুম বুকিং হয়েছে বলে জানা গেছে। পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে পর্যটকদের বড় একটি অংশ শহরের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটাতে চান। এ কারণে তারা শহরের হোটেলের পরিবর্তে শহরের বাইরে অবস্থিত রিসোর্ট ও কটেজে থাকতে বেশি আগ্রহী। এছাড়া এসব রিসোর্ট ও কটেজে কক্ষসংখ্যা তুলনামূলক কম থাকায় আগাম বুকিং দ্রুত পূর্ণ হয়ে যায়। তবে ঈদ যত ঘনিয়ে আসবে, ততই শহরের হোটেলগুলোতেও বুকিং বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। শ্রীমঙ্গলের চারদিকে সবুজের সমারোহে সজ্জিত সারি সারি চা-বাগানের নয়নাভিরাম দৃশ্য মুগ্ধ করে পর্যটকদের। পাশাপাশি দার্জিলিং টিলা, বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই), টি মিউজিয়াম, বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন, হাইল হাওর, মৎস্য অভয়াশ্রম, বাইক্কা বিল, নীলকণ্ঠ সাত রঙের চা কেবিন, চা-কন্যা ভাস্কর্য, বধ্যভূমি-৭১, লাল পাহাড়, শঙ্কর টিলা, গরম টিলা, ভাড়াউড়া লেক, ওয়ার সিমেট্রি, হরিণছড়া গলফ মাঠ, নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী পল্লীগুলো পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। পাশাপাশি শ্রীমঙ্গলের পার্শ্ববর্তী কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক, নুরজাহান চা-বাগান সীমান্তবর্তী ধলই চা বাগানে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ পর্যটকদের বিমোহিত করে।
চামুং রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড ইকো ক্যাফের স্বত্বাধিকারী তাপস দাশ বলেন, আসন্ন পবিত্র ঈদকে সামনে রেখে পর্যটকদের আগমনকে কেন্দ্র করে ‘চামুং রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড ইকো ক্যাফেতে আমরা বিশেষ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। ঈদের ছুটিতে যারা শ্রীমঙ্গল ভ্রমণে আসবেন, তাদের জন্য মূলত স্থানীয় ও আদিবাসী খাবারের বিশেষ আয়োজন রাখা হয়েছে, যাতে তারা এ অঞ্চলের স্বাদ ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন। তিনি বলেন, অতিথিদের আরামদায়ক ও সুন্দর অভিজ্ঞতা দেয়ার জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং রেস্টুরেন্টের সাজসজ্জার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আমাদের পুরো টিম সর্বাত্মকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে, যাতে ঈদের ছুটিতে আগত পর্যটকেরা একটি ভালো ও স্মরণীয় অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরতে পারেন। বালিশিরা রিসোর্টের পরিচালক (পরিচালনা ও প্রশাসন) জাহানারা আক্তার বলেন, পর্যটকদের স্বাগত জানাতে আমরা রিসোর্ট ও রেস্টুরেন্ট সুন্দরভাবে সাজিয়েছি এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ঈদের দিন থেকে আমাদের প্রায় ৮০ শতাংশ বুকিং হয়ে থাকে। আশা করছি, গতবারের তুলনায় এবার আরও বেশি পর্যটক আসবেন এবং ব্যবসাও ভালো হবে। আগামী ২১ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত ইতিমধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ বুকিং সম্পন্ন হয়েছে।
গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফের জেনারেল ম্যানেজার আরমান খান বলেন, বরাবরের মতো এবারো ঈদকে ঘিরে রিসোর্টটিতে বেশ ভালো বুকিং হয়েছে। ঈদের সময়ে সাধারণত বিদেশি পর্যটক খুব একটা আসেন না; তবে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকদের আগমন বেশি থাকে। সব মিলিয়ে বর্তমানে আমাদের বুকিং প্রায় শতভাগ পূর্ণ হয়ে গেছে। শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্টের মালিক সেলিম আহমেদ বলেন, ঈদুল ফিতরের ছুটিকে সামনে রেখে শ্রীমঙ্গলে মোটামুটি ভালো পর্যটক সমাগমের আশা করা যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বুকিং সম্পন্ন হয়েছে। সাধারণত ঈদের দিন পর্যটকরা খুব বেশি আসেন না; তবে ঈদের একদিন পর থেকেই পর্যটকদের আগমন বাড়তে শুরু করে। ট্যুরিস্ট পুলিশ শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ জোনের ওসি মো. কামরুল হোসেন চৌধুরী বলেন, ঈদ উপলক্ষে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছি। বিভিন্ন পর্যটন স্পটে আমাদের টহল ব্যবস্থা সার্বক্ষণিকভাবে চালু থাকবে। জেলা পুলিশের সমন্বয়ে উপজেলা প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ, র?্যাব ও বিজিবি যৌথভাবে নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করবে। যাতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পর্যটকেরা নির্বিঘ্নে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারেন, সে বিষয়ে আমাদের সর্বোচ্চ নজর রয়েছে।
