সিরাজগঞ্জে ৩ বছরেও চালু হয়নি ট্রাকচালকদের ‘বিশ্রামাগার’

৫৬ কোটি টাকা ব্যয়

সিরাজগঞ্জে ৩ বছরেও চালু হয়নি ট্রাকচালকদের ‘বিশ্রামাগার’

ফন্ট সাইজ:

ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের পণ্যবাহী চালকদের নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে নির্মিত হয় বিশ্রামাগার। তবে এই আধুনিক বিশ্রামাগার নির্মাণ শেষে তিন বছর পেরিয়ে গেলেও আজও চালু হয়নি। ফলে ক্লান্ত ও নিদ্রাহীন অবস্থায় গাড়ি চালাতে বাধ্য হচ্ছেন চালকরা। স্থানীয়রা বলছেন, অবকাঠামো নির্মাণে ৫৬ কোটি টাকা ব্যয় হলেও সময়মতো চলু না হওয়ায় বিশ্রামাগারটি গরু-ছাগল রাখার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে সরকারের অপচয় ছাড়া কিছুই হচ্ছে না।

জানা যায়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় ২০১৯ সালে চার মহাসড়কে চারটি বিশ্রামাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। সেই প্রেক্ষিতে ২০২০ সালের ২১শে মে থেকে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের সিরাজগঞ্জের পাঁচলিয়ায় প্রায় ১৩ দশমিক ৫৬ একর জায়গায় নির্মাণকাজ শুরু হয়। ওই বছরের ১৫ই অক্টোবর সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রকল্পের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। শুরুতে প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয় ২০২২ সালের ১৪ই নভেম্বর পর্যন্ত। যার ব্যয় ছিল ৪২ কোটি ৮০ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। পরবর্তীতে আরও ১৩ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে ২০২৩ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়।

সিরাজগঞ্জ সওজ বিভাগ জানায়, শুরুতে নকশা অনুযায়ী বিশ্রামাগারটি দোতলা করার কথা ছিল। সেটা অনুযায়ী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কাজ করছিলেন। কিন্তু প্রকল্পের শেষ সময়ে আরও দুই তলা বাড়িয়ে চারতলা করার সিদ্ধান্ত নেয় প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। এটি চালু হলে পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি ও নিরাপত্তাকর্মীরা বাড়তি দুই তলা ব্যবহার করার সুযোগ পাবেন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার লিমিটেড, রানা বিল্ডার্স প্রাইভেট লিমিটেড ও মেসার্স সাগর বিল্ডার্স যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছেন।
এদিকে পণ্যবাহী গাড়িচালকদের জন্য পার্কিং সুবিধাসংবলিত বিশ্রামাগার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি নির্দেশনা প্রকাশ করেছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। বিশ্রামাগার ইজারা বা অপারেশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (ওঅ্যান্ডএম) ব্যবস্থায় পরিচালিত হবে। আবার বিভাগীয় পদ্ধতিতেও পরিচালনা করা হতে পারে। ইজারা দেয়া হলে কম-বেশি তিন বছরের চুক্তি হতে পারে। অপারেটর নিয়োগ দিলে তা হবে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে। এক্ষেত্রেও তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেয়া হব। নির্মিত এই বিশ্রামাগারে পণ্যবাহী চালক ও সহকারীরা নির্ধারিত সেবামূল্য পরিশোধ করে সেবা নিতে পারবেন। সেবাগুলোর মধ্যে রয়েছে ১০০ ট্রাক পার্কিং, দ্বিতল শয়নকক্ষে চালক ও সহকারীর রাতযাপন, গাড়ি পার্কিং, বিনোদন পয়েন্ট, ক্যানটিন, গোসলখানা, নামাজের জায়গা, প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা কক্ষ, গাড়ি মেরামতের ওয়ার্কশপ, ওয়াশজোন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎব্যবস্থা, আধুনিক স্যানিটেশন ব্যবস্থা, সবুজায়ন ও নিরাপত্তাপ্রাচীরের মধ্যে সীমিত আকারে খেলার সু-ব্যবস্থা।
রংপুরগামী ট্রাকচালক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমাদের যখন ঘুম আসে তখন রাস্তার সাইডে গাড়ি রেখে ঘুমাই। রাস্তার সাইডে রাখলে অনেক সময় মালামাল চুরি ও ডাকাত এসে ধরে। অথচ রাতে যদি বিশ্রামাগারে ঘুমের ব্যবস্থা থাকে তাহলে এমন ঝুঁকি আর থাকবে না। নিরাপদে গাড়ি চালানো যাবে। তার দাবি দ্রুত সময়ের মধ্যে বিশ্রামাগারটি চালু হলে তারা উপকৃত হবেন।

সিরাজগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সরকারি সহকারী কৌঁসুলি (এপিপি) নাসির উদ্দিন মানবজমিনকে বলেন, দিন ও রাতের ক্লান্তি নিয়েই চালকরা গাড়ি চালান, কিন্তু বিশ্রামের জন্য নেই নিরাপদ জায়গা। তাই বাধ্য হয়ে থামেন সড়কের পাশে। ঝুঁকির মুখে পড়ে মালামাল ও যানবাহন। পরিবহন চালকদের আইনের কর্মঘণ্টা একদমই মানা হয় না। যার ফলে অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে শারীরিক ক্লান্তি যেমন- ঘুম আসা, অবসন্নতার কারণে। সে জন্য বিশ্রামাগার অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে। তবে কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যানবাহন মালিকদের এবং সরকারকে সেটি মনিটর করতে হবে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সাগর বিল্ডার্সের নির্বাহী পরিচালক বাপ্পি সমদদার বলেন, করোনার কারণে দু-দফায় কয়েক মাস প্রকল্পের কাজ বন্ধ ছিল। তবুও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই কাজটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তবে কয়েকবার ডিজাইন পরিবর্তন হওয়ায় সাবস্টেশন ভবন নির্মাণও কিছুটা বিলম্ব হয়েছিল। মেসার্স সাগর বিল্ডার্সের প্রকল্প ম্যানেজার শফিকুর রহমান বলেন, বিশ্রামাগারের মূলকাজ নির্দিষ্ট সময়েই সম্পন্ন হয়েছে। তবে প্রকল্পের মেয়াদ বর্ধিত করার পর কিছু কাজ বাকি ছিল। সেগুলোও নিদিষ্ট সময়ের মধ্যেই শেষ হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সিরাজগঞ্জ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ইমরান ফারহান সুমেল মানবজমিনকে বলেন, আমাদের দেশে এইটা প্রথম। ফলে এইটা লিজ দিতে ও কীভাবে আমরা চালাবো সেটা নিয়ে একটু কনফিউশন আছে। এইগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি। আশা করা যায় দ্রুত সময়ের মধ্যেই বিশ্রামাগারটি চালু করা হবে।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন