ট্রাম্পের সহায়তা চাওয়ার মধ্যেও তীব্র হচ্ছে হামলা

ফন্ট সাইজ:

ইরান-ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কেন্দ্রে এখন বিশ্ব জ্বালানির গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি। তেহরান প্রণালিতে অবরোধ দেয়ায় তীব্র হচ্ছে জ্বালানি সংকট। খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের কপালেও চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় তিনি তার পশ্চিমা মিত্রদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোকে হুমকিও দিয়েছেন। তবে কিছুতেই কাজ হচ্ছে না। যুক্তরাজ্য ও জার্মানিসহ যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্ররা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এই যুদ্ধে তারা জড়িত হবে না। যুক্তরাজ্যের শ্রম ও অবসরবিষয়ক মন্ত্রী বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কথা শুনতে যুক্তরাজ্য বাধ্য নয়। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুদ্ধের ধাঁচ ইউরোপে ছড়িয়ে দেয়ার ট্রাম্পের কৌশল আপাতত ব্যর্থ হয়েছে। চীনকেও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ মোতায়েনের আহ্বান জানান ট্রাম্প। বেইজিংও এতে সায় দেয়নি। বিশ্লেষকরা মনে করেন হরমুজ অবরুদ্ধ হওয়ায় যে জটিলতা তৈরি হয়েছে তা মোকাবিলায় ট্রাম্পের ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়েছে। তাই তিনি এই সংকটটা মোকাবিলায় এখন চীনের সহায়তা চাচ্ছেন।

এদিকে ট্রাম্পের এই সহায়তা চাওয়ার মধ্যেও উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোতে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। সংযুক্ত আরব আমিরাতের তিনটি প্রধান বন্দর খালি করার আহ্বান জানানোর পর সেখানে হামলা চালানো হয়। ড্রোন হামলায় একটি জ্বালানি ট্যাংকে আগুন লাগার পর দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কিছু ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং এতে কেউ আহত হননি। যুদ্ধের ফলে ইরানে অন্তত এক হাজার তিনশ’ জন, লেবাননে অন্তত আটশ’ পঞ্চাশ জন এবং ইসরাইলে বারো জন নিহত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১৩ জন সামরিক সদস্য নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে গত সপ্তাহে ইরাকে একটি বিমান দুর্ঘটনায় ছয় জন মারা যান। লেবাননের আট লাখের বেশি মানুষ বাস্তুহারা হয়ে পড়েছে।

শত্রুদের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ, আরাগচির হুঁশিয়ারি: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, হরমুজ প্রণালি আমাদের শত্রুদের জন্য বন্ধ। তিনি বলেন, পনেরো দিনের যুদ্ধের পর তারা (যুক্তরাষ্ট্র) এখন হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্যদের দ্বারস্থ হয়েছে। যারা গতকাল পর্যন্ত তাদের শত্রু ছিল, আজ তাদের কাছেই তারা সহায়তা চাইছে। আরাগচি আরও বলেন, তারা অন্য দেশগুলোর কাছে সাহায্য চাইছে যাতে প্রণালিটি খোলা থাকে। আমাদের দৃষ্টিতে প্রণালি খোলা আছে, তবে এটি আমাদের শত্রুদের জন্য বন্ধ। যারা আমাদের বিরুদ্ধে এই কাপুরুষোচিত আগ্রাসন চালিয়েছে এবং তাদের মিত্রদের জন্যও বন্ধ। তিনি আরও যোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা শুরু হওয়ার মাধ্যমে এমন একটি যুদ্ধের সূচনা হয়েছে, যা শত্রুপক্ষ নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ দাবি করে শুরু করেছিল।

ইরানের তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলে বাধা দিচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র: দেশটি জানিয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ইরানের তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেয়া হয়েছে। দেশটির অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানান, বৈশ্বিক সরবরাহ বজায় রাখতে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সিএনবিসি সমপ্রচারমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট বলেন, ইরানের জাহাজগুলো ইতিমধ্যেই বেরিয়ে যেতে শুরু করেছে, এবং বিশ্বের বাকি অংশে সরবরাহ বজায় রাখতে আমরা তা ঘটতে দিয়েছি। তিনি আরও বলেন, এখন জলপথ দিয়ে আরও বেশি জাহাজ চলাচল করছে, যার মধ্যে ভারত ও চীনের জাহাজও রয়েছে। তার মতে, সামনের সময়ে এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল আরও বাড়তে শুরু করবে। বেসেন্ট আরও জানান, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ওয়াশিংটনের লক্ষ্য হলো ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা এবং ধ্বংস করা। এর মধ্যে রয়েছে তাদের নৌবাহিনী এবং সীমান্তের বাইরে শক্তি প্রদর্শনের ক্ষমতা।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে অংশ নেবে না যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও পশ্চিমা মিত্ররা: যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার বলেছেন, তার দেশকে কোনো বৃহত্তর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে দেয়া হবে না। ন্যাটোকে লক্ষ্য করে ট্রাম্পের হুমকির প্রেক্ষিতে এই জবাব দিয়েছেন স্টারমার। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, যুক্তরাজ্যসহ মিত্র দেশগুলো যদি ওই অঞ্চলে সামরিক সহায়তা না দেয়, তবে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। স্টারমার বলেন, ওই অঞ্চলে অবস্থানরত নিজেদের নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই যুক্তরাজ্যের প্রধান অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে নিজেদের ও মিত্রদের রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও নেয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বৃটেন নিজেকে কোনো বৃহত্তর সংঘাতে জড়াতে দেবে না এবং অঞ্চলে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দ্রুত সমাধানের জন্য কাজ চালিয়ে যাবে।

প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি তার সরকারের এক জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীও একই কথা বলেছেন। যুক্তরাজ্যের শ্রম ও অবসরবিষয়ক মন্ত্রী প্যাট ম্যাকফাডেন বলেছেন, ডনাল্ড ট্রাম্প ‘খুবই লেনদেন’নির্ভর প্রেসিডেন্ট। ইরান ঘিরে তার দফায় দফায় দাবিগুলোকে সেই প্রেক্ষাপট থেকেই দেখতে হবে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি অনুরোধ মেনে নিতে বাধ্য নয় যুক্তরাজ্য।

জার্মানিও সাফ জানিয়েছে দিয়েছে, তারা ট্রাম্পের যুদ্ধে অংশ নেবে না। দেশটির সরকারের এক মুখপাত্র বলেছেন, ইরানে চলমান যুদ্ধের সঙ্গে ন্যাটোর কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি জানান, জার্মানি এই যুদ্ধে অংশ নেবে না এবং সামরিক উপায়ে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার কোনো উদ্যোগেও যুক্ত হবে না। মুখপাত্র বলেন, যতদিন এই যুদ্ধ চলবে, ততদিন কোনো ধরনের অংশগ্রহণ হবে না। এমনকি সামরিক উপায়ে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার কোনো প্রচেষ্টাতেও নয়। এদিকে গ্রিসও হরমুজ প্রণালিতে কোনো সামরিক অভিযানে অংশ নেবে না বলে জানিয়েছেন দেশটির সরকারি মুখপাত্র পাভলোস মারিনাকিস।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ পাঠানোর পরিকল্পনা নেই জাপানের: জাপানও ট্রাম্পের আহ্বানে সাড়া দেয়নি। এর জবাবে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধ জাহাজ মোতায়েনের কোনো পরিকল্পনা তার দেশের নেই। সংসদে তিনি বলেন, টোকিওর কোনো পরিকল্পনা নেই (হরমুজ প্রণালিতে) নৌযান পাঠানোর। তাকাইচি বলেন, আমরা কোনো এস্কর্ট জাহাজ পাঠানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিইনি। আমরা যাচাই করছি জাপান স্বতন্ত্রভাবে কী করতে পারে এবং আইনগত সীমার মধ্যে কী করা সম্ভব।

ইরানে আরও তিন সপ্তাহ হামলার পরিকল্পনা ইসরাইলের: তেল আবিব জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে অন্তত আরও তিন সপ্তাহ যুদ্ধ চালানোর বিস্তারিত পরিকল্পনা তাদের রয়েছে। সোমবার দেশটির সামরিক বাহিনী জানায়, রাতভর ইরানের বিভিন্ন স্থানে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাদাভ শোশানি সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য আগামী তিন সপ্তাহের বিস্তারিত সামরিক পরিকল্পনা প্রস্তুত রয়েছে এবং এর বাইরেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা হয়েছে। সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের লক্ষ্য সীমিত। ইসরাইলের বিরুদ্ধে হুমকি দেয়ার সক্ষমতা দুর্বল করতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো, পারমাণবিক স্থাপনা এবং নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর আঘাত হানা। শোশানি বলেন, আমরা নিশ্চিত করতে চাই যে, এই শাসনব্যবস্থা যতটা সম্ভব দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তাদের নিরাপত্তা কাঠামোর সব সক্ষমতা আমরা ক্ষয়িষ্ণু করে দিতে পারি। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী আরও জানিয়েছে, ইরানের ভেতরে আঘাত হানার জন্য তাদের কাছে এখনো হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তু রয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন