পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর বিধানসভা এবং সংসদে ব্যাপক বিদ্রোহের মুখে পড়ে তৃণমূল কংগ্রেসের একচ্ছত্র নেত্রী এবং পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন একা হয়ে পড়েছেন। তার দলে এখন মাত্র হাতেগোনা কয়েকজন নেতা রয়েছেন।
সোমবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তার ভাইপো অভিষেক দিল্লিতে থাকা সত্ত্বেও লোকসভায় দলের মধ্যেকার বিদ্রোহ নিয়ে মুখ খোলেন নি। জানা গেছে, মমতা কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর কাছে গিয়েছেন।
তবে মঙ্গলবার সংবাদ বৈঠকে বিদ্রোহীদের আক্রমণ করে মুখ খুলেছেন মমতা অনুগত সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। সঙ্গে ছিলেন সাংসদ কীর্তি আজাদ।
দলের মধ্যে বিদ্রোহ প্রসঙ্গে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় মঙ্গলবার বলেন, “ওরা (বিদ্রোহী সাংসদরা) ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে গিয়েছিলেন, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও সেখানে গিয়েছিলেন, এর মানে হলো ওরা বিজেপিতে যোগ দিয়েছে। ওরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাদ দিয়ে নরেন্দ্র মোদিকে নেতা বানিয়েছে।”
সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, “আমি প্রত্যেক সাংসদকে তাদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীদের মুখোমুখি হতে এবং সেখানকার মানুষ কী বলেন তা শুনতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। গণতন্ত্র চলে গেছে, পশ্চিমবঙ্গে এখন স্বৈরতন্ত্র চলছে।” বিদ্রোহীদের সাংসদ পদ ছেড়ে দেয়ার জন্যও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন তিনি। এ প্রসঙ্গে রাজ্যসভার সাংসদ পদে ইস্তফা দেয়া বিদ্রোহী সুখেন্দু শেখর রায়ের কথাও উল্লেখ করেন কল্যাণ। সোমবারই সুখেন্দু শেখর রাজ্যসভা সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসও ছেড়ে দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
মমতা অনুগামী সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও কীর্তি আজাদ দলের বিদ্রোহী সাংসদদের তীব্র আক্রমণ করে তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক নৈতিকতার অভাব, বিজেপি’র সঙ্গে আঁতাত বজায় রাখা এবং দলীয় কর্মীরা যখন হয়রানি ও রাজনৈতিক আক্রমণের শিকার হচ্ছেন, ঠিক সেই সময়ে তাদের পরিত্যাগ করার অভিযোগ তুলেছেন তারা। কল্যাণের আক্রমণের জবাব দিয়েছেন বিদ্রোহী শিবিরের অন্যতম ‘মুখ’ কাকলি ঘোষ দস্তিদারও।
বিদ্রোহী নেতাদের এনডিএ-তে যোগ দেয়ার পদক্ষেপে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতীয় জনতা পার্টিকে কটাক্ষ করেছেন। তিনি বলেন, “আপনাদের (বিজেপি) কাছে মুখ্যমন্ত্রী, ইডি, সিবিআই এবং অন্যান্য ক্ষমতা আছে, কিন্তু আমার আছে ‘মা, মাটি, মানুষ’, আমার দল, আমার দলের কর্মীরা এবং পশ্চিমবঙ্গের মানুষ।” বিদ্রোহী হওয়া তারকা সাংসদদেরও নিশানা করে তিনি বলেন, “ফিল্মস্টাররা সব ভিনদেশি তারা। এদের ধারণা হলো, যেহেতু পাবলিক আমাদের দেখে দৌড়ে আসে, সংসদে সবাই আমাদের পেছন পেছন দৌড়ে যাবে।
উল্লেখ্য, সোমবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের জন্য বিজেপি’র পর্যবেক্ষক ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতে দুই ঘণ্টা ধরে বিদ্রোহী তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদদের বৈঠক যখন চলছে, তার প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে দলীয় প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টাল ইনক্লুসিভ অ্যালায়েন্স (ইন্ডিয়া)’র বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
গত সপ্তাহে দলের মোট ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৯ জন প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করে বিধানসভায় প্রধান বিরোধী দল হওয়ার দাবি জানান। এর ফলে, দলটি বিভাজিত হয়ে পড়ে। দেখা গেছে, সংকটগ্রস্ত দলটির নেতৃত্ব যখন শুক্রবার চেয়ারপারসন মমতার বাসভবনে একটি সভা ডেকেছিল তখন বিধায়কদের মধ্যে মাত্র আটজন এবং সাংসদদের মধ্যে ছয়জন উপস্থিত ছিলেন। সাংসদরা হলেন- দোলা সেন, মালা রায়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, ডেরেক ও’ব্রায়েন এবং সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। আর বিধায়করা হলেন- বীণা মণ্ডল, অসীমা পাত্র, মদন মিত্র, কুনাল ঘোষ, ফিরহাদ হাকিম, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অশোক কুমার দেব। তবে সোমবার ফিরহাদ হাকিম বিদ্রোহী শিবিরকে সমর্থন জানাতে বিদ্রোহী দলনেতা ঋতব্রতর সঙ্গে বৈঠকও করেন। ঋতব্রত দাবি করেছেন, আমাদের (বিদ্রোহীদের) দিকে পাল্লা ক্রমশ ভারী হচ্ছে।
এদিকে বিদ্রোহী তৃণমূল কংগ্রেস নেতাদের দাবি- দুর্নীতি থেকে শুরু করে দলনেত্রীর নাগাল না পাওয়া পর্যন্ত, বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য সমস্যা জমে উঠেছিল এবং এমন এক অসন্তোষ তৈরি করেছিল যা এখন মমতার নেতৃত্বাধীন দলটিকে তাড়া করে ফিরছে।
চারবারের সাংসদ ও বিদ্রোহীদের অন্যতম মুখ শতাব্দী রায়, যিনি ২০০৯ সাল থেকে মমতার পাশে রয়েছেন, দাবি করেছেন, সাবেক মুখ্যমন্ত্রী- যিনি ‘দিদি’ নামে জনপ্রিয়-সমপ্রতি “বদলে গেছেন”, এই পরিবর্তনটি তিনি ভালোভাবে নেননি।
এনডিটিভিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি মন্তব্য করেন, “গত কয়েক বছরে তিনি অনেক বদলে গেছেন। তার সঙ্গে আমার একটি আবেগপূর্ণ সম্পর্ক আছে, কিন্তু আমার কাছে কাজটাই আসল, আর তাই আমি তাকে ছাড়ার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
বিদ্রোহী শিবিরের অন্যরা তার উদ্বেগের প্রতিধ্বনি করে বলেছে, মমতার সরকারের মন্ত্রীরাও সাংসদদের সময় দিতেন না এবং তাদের অনুরোধ উপেক্ষা করতেন। সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করা হতো না এবং গত কয়েক বছরে যখনই তারা কথা বলার চেষ্টা করেছেন, তাদের চুপ করে বসে থাকতে বলা হয়েছে।
রায় আরও বলেন যে, মানুষ প্রায়ই জিজ্ঞাসা করে কেন তারা আগে এই বিষয়গুলোতে চুপ ছিলেন এবং কেবল যখন দল সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় আছে, তখনই কেন বিষয়টি উত্থাপন করছেন। তিনি বলেন, “এর কারণ হলো, এখন সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। তৃণমূল ক্ষমতায় থাকাকালীন কী হয়েছিল তা আমরা দেখেছি। আমি এখনকার পরিস্থিতি বুঝতে পারছি, কিন্তু আমাকে এটা আমার নির্বাচনী এলাকার মানুষের জন্য করতে হবে।”
