র‌্যাব বিলুপ্তি চেয়ে প্রধানমন্ত্রীকে আন্তর্জাতিক ৯ সংগঠনের চিঠি

র‌্যাব বিলুপ্তি চেয়ে প্রধানমন্ত্রীকে আন্তর্জাতিক ৯ সংগঠনের চিঠি

ফন্ট সাইজ:

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) বিলুপ্তি চেয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চিঠি দিয়েছে ৯টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন। চিঠিটি আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকেও দেয়া হয়েছে। সোমবার হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) এর ওয়েবসাইটে চিঠিটি প্রকাশ করা হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে- অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, আর্টিকেল ১৯, কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস, সিভিকাস, এফআইডিএইচ, ফোর্টিফাই রাইটস, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, রবার্ট অ্যান্ড ইথেল কেনেডি হিউম্যান রাইটস ও টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট। চিঠিতে নির্বিচারে বা বেআইনিভাবে আটক বন্ধ করার পাশাপাশি অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তার দল বিএনপি সরকারের সামনে নানা গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এই সময়টিকে মানবাধিকার সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের সুযোগ হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার শাসনামলে জোরপূর্বক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ নানা ধরনের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিল। তার পতনের পর এসব ঘটনার অনেকটা কমে এলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্বিচারে আটক এবং সাংবাদিক, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ওপর হামলা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।

মানবাধিকারের পাশাপাশি রোহিঙ্গা সুরক্ষার ক্ষেত্রেও সরকারকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন করারও আহ্বান জানানো হয়েছে। চিঠিতে মানবাধিকার সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপ ও আইনগত সংস্কারের জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট সুপারিশও দেয়া হয়েছে। সুপারিশগুলো হলো:

মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা: সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টের মতো ডিজিটাল নিরাপত্তা সংক্রান্ত পুরনো আইনগুলোর অধীনে থাকা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলাগুলো খারিজ করা। সাংবাদিক, শিল্পী ও লেখকদের ওপর হামলা বন্ধ করা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় মিডিয়া রিফর্ম কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা।
অতীত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার ও জবাবদিহিতা: চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে হওয়া হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত করা। পাশাপাশি গত কয়েক দশকের গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করা এবং গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) বিচারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা এবং মৃত্যুদণ্ড বাতিল করা।
নিরাপত্তা বাহিনী সংস্কার: র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) বিলুপ্ত করা অথবা এর আমূল পরিবর্তন করা। বেসামরিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনীর ব্যবহার বন্ধ করা। প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) কাজকে কেবল সামরিক গোয়েন্দা তথ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা।

সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের সুরক্ষা: হিন্দু, আহমদিয়া এবং অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া। পার্বত্য চট্টগ্রাম (সিএইচটি) শান্তিচুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা। তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়া জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও আইনি অধিকারগুলো বাস্তবায়ন করা।
নারী ও শিশুদের অধিকার: বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বিদ্যমান আইনের ফাঁকফোকর (বিশেষ করে ধারা ১৯) বন্ধ করা। রাজনীতি ও সম্পত্তিতে নারীদের সমান অধিকার নিশ্চিত করা।
রোহিঙ্গা শরণার্থী: রোহিঙ্গাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মিয়ানমারে ফেরত না পাঠানো। ভাসানচর ক্যাম্প বন্ধ করে শরণার্থীদের মূল ভূখণ্ডে আসার সুযোগ দেয়া এবং তাদের শিক্ষা ও কাজের সুযোগ তৈরি করা।
আইন সংস্কার ও শ্রম অধিকার: বিশেষ ক্ষমতা আইন (১৯৭৪) এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মতো দমনমূলক আইনগুলো সংশোধন বা বাতিল করা। শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার নিশ্চিত করা এবং পোশাক শ্রমিকদের জন্য উপযুক্ত ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার: শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাড়িয়ে জিডিপি’র অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দ করা। একটি সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক ডেপুটি ডিরেক্টর মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, তারেক রহমান পরিবর্তনের জন্য একটি বিশাল ম্যান্ডেট পেয়েছেন, যার মধ্যে এমন অনেক বাংলাদেশি রয়েছেন যারা একটি স্বৈরাচারী সরকারকে উৎখাত করতে নিজেদের জীবন বাজি রেখেছিলেন। এই সরকারের সাফল্য নির্ভর করবে অর্থবহ সংস্কারের ওপর, যাতে স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারে এবং আইনের শাসন ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার মতো অধিকারগুলো রক্ষা করতে পারে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন