গাজীপুর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জে সড়কে শ্রমিকরা

পঞ্চম দিনেও সংঘর্ষ, আগুন

গাজীপুর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জে সড়কে শ্রমিকরা

ফন্ট সাইজ:

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকার দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের অবরোধে পঞ্চম দিনেও অশান্ত ছিল মিরপুর, গাজীপুর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জ। গতকাল দুপুরে মজুরি বোর্ড ডিসেম্বর থেকে নতুন মজুরি কার্যকরের ঘোষণা দেয়ার পরও সড়ক অবরোধ থেকে সরেনি পোশাক শ্রমিকরা। রাজধানীর মিরপুরে সড়কে নামার চেষ্টা করলে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেয় পুলিশ। তবে গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও লাঠিচার্জ করে।

এদিন গাজীপুরে শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। সকালে সাভারের হেমায়েতপুর, উলাইল ও আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় অবরোধকালে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেয়া হয়। সংঘর্ষে পুলিশ, শ্রমিক, সাংবাদিকসহ অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে সাভার ও আশুলিয়া অঞ্চলে শতাধিক পোশাক কারখানা ছুটি দেয়া হয়। একই সময়ে গাজীপুরে সড়কে অবস্থান নেয়ার চেষ্টা করলে সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে বিক্ষুব্ধদের ছত্রভঙ্গ করে পুলিশ। এ সময় দু’জনকে আটক করা হয়। তাৎক্ষণিক বিভিন্ন এলাকার অন্তত ৩০টি কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়াও নারায়ণগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে গার্মেন্টস শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। এ সময় চারজনকে আটক করে পুলিশ।

মিরপুরে সতর্ক অবস্থানে ছিল পুলিশ: মিরপুর এলাকায় গতকালও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে সতর্ক অবস্থানে ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশের পাশাপাশি স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি), আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), ডিএমপি’র গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি), কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা উপস্থিত ছিল। এদিন পল্লবীতে বিভিন্ন পোশাক কারখানার সামনে জড়ো হওয়া শ্রমিকদের সরিয়ে দেয় পুলিশ।

১০ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন: দুপুরে রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বরে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডিএমপি’র যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) ক্রাইম প্রিভেনশন উত্তর মো. মহিদুল ইসলাম বলেন, মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় ১০ হাজারের বেশি পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। মিরপুর-১, পল্লবী, রূপনগর, মিরপুর-১২ ও কাফরুল রোডসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তারা দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের নামে মামলা হয়েছে। তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। কাউকে আটকের আগে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের তদারকিতে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যাদের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না, নিরীহ শ্রমিক ও পথচারী, তাদের ছেড়ে দেয়া হচ্ছে।

উত্তপ্ত সাভার-আশুলিয়া, আহত অর্ধশতাধিক: সকাল থেকে সাভারের হেমায়েতপুর, উলাইল ও আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এ সময় পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেয়া হয়। সংঘর্ষে পুলিশ, শ্রমিক, সাংবাদিকসহ অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন। সকাল সোয়া ৮টার দিকে হেমায়েতপুরের পদ্মার মোড়ে স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের সামনে এবং সকাল ৯টার দিকে সাভারের উলাইল এলাকায় আল মুসলিম গ্রুপের সামনে শ্রমিকরা বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে তারা ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। এ সময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশ টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হেমায়েতপুর-সিংগাইর সড়কে বিক্ষুব্ধ একদল লোক পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।

এ সময় সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল আলম আহত হন। একই সময়ে পদ্মার মোড় এলাকায় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন স্টার নিউজের ঢাকা জেলা প্রতিনিধি আহমাদ সোহান সিরাজী, একাত্তর টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি রাইয়ান বিন আমিন, ক্যামেরাপারসন মো. উজ্জ্বল হোসেন, নিউজ টোয়েন্টিফোর টেলিভিশনের রিপোর্টার নাজমুল হুদা ও ক্যামেরাপারসন ইমদাদ হোসেন। হেমায়েতপুরের পাশাপাশি উলাইল এলাকায়ও শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। সকাল ৯টার পর শ্রমিকরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন। এতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। বেলা ১১টার দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা শ্রমিকদের সরিয়ে দিলে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। শিল্প পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, সকালে কারখানাগুলোতে উৎপাদন শুরু হলেও বহিরাগতদের ইন্ধনে কিছু শ্রমিক কাজ বন্ধ করে ভেতরে অবস্থান নেন। দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকায় কর্তৃপক্ষ কারখানাগুলোতে ছুটি ঘোষণা করে। দুপুরের দিকে শিল্প পুলিশের আওতাধীন এলাকাগুলোর পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল।

৩ শ্রমিক নেতা আটক: সাভার ও আশুলিয়ার পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনে উস্কানি ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে সহায়তার অভিযোগে তিন শ্রমিক নেতাকে আটক করেছে ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ ছাড়া, কারখানা ভাঙচুর ও কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় সাভার ও আশুলিয়া থানায় তিনটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় অজ্ঞাতনামা ২ হাজার ৩০০ জনের বেশি ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আটক তিন শ্রমিক নেতা হলেন- বাংলাদেশ ন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মো. শামীম (৪৮), জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের আশুলিয়া থানা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. আ. হালিম (৩৭) এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মনসুর আলী (৪৬)।

গাজীপুরের বেশির ভাগ শিল্পপ্রতিষ্ঠান খোলা ছিল। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কারখানা এলাকায় ও মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ, বিজিপি, এসআরপি ও আনসার বাহিনীর সদস্য মোতায়েন ছিল। তবে নগরের কয়েকটি এলাকায় সড়কে অবস্থান নিতে চাইলে সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ বিক্ষুব্ধদের ছত্রভঙ্গ করে পুলিশ। এ সময় ২ জনকে আটক করা হয়। তাৎক্ষণিক বিভিন্ন এলাকার অন্তত ৩০টি কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়।

এনসিপি’র গায়েবানা জানাজা পণ্ড: শ্রমিক আন্দোলনের সময়ে অন্য শ্রমিকদের মারধরের আহত হয়ে গাজীপুর মহানগরীর বাংলাবাজার এলাকায় পোশাক শ্রমিক তৌফিক হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় গায়েবানা জানাজার আয়োজন করতে গিয়ে পুলিশের বাধার মুখে পড়ে এনসিপি’র নেতাকর্মীরা। একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ধাওয়া ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। দুপুরে নগরীর চান্দনা চৌরাস্তায় এ ঘটনা ঘটে। পোশাক শ্রমিক তৌফিকের মৃত্যুর প্রতিবাদ জানিয়ে চৌরাস্তায় গায়েবানা জানাজার কর্মসূচি ঘোষণা করে এনসিপি’র শ্রমিক সংগঠন। দুপুরে এনসিপি’র কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক আলী নাছের খান নেতাকর্মীদের নিয়ে চান্দনা চৌরাস্তায় উপস্থিত হন। এতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ উপস্থিত হলে হট্টগোল বেধে যায়। এ সময় জানাজার নামাজ না পড়েই মোনাজাত শুরু করেন তিনি। একপর্যায়ে পুলিশ তাদের ধাওয়া দিয়ে সরিয়ে দেয়।

ফতুল্লায় পুলিশের মামলায় আসামি দেড় হাজার, গ্রেপ্তার ৬: এদিকে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনের আড়ালে সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং সংঘাত উস্কে দেয়ার অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। মামলায় ২১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও এক থেকে দেড় হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে ফতুল্লা থানার এসআই মিলন ফকির বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। এ মামলায় পুলিশ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে বুধবার দুপুরে সাতদিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠায়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- ফতুল্লার লামাপাড়া এলাকার মো. শামীম হাসান (২৮), কোতালেরবাগ বউ বাজার এলাকার মো. মামুন (২৬), রেলস্টেশন এলাকার মো. ওমর ফারুক (৩৮), রামারবাগ এলাকার ইমান ইমন (২৬), কোতালেরবাগ এলাকার শাহিন আহম্মেদ ও কায়েমপুর এলাকার আতিকুর রহমান (২৫)।

এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ’র জনসংযোগ ও প্রচার কমিটির চেয়ারম্যান মাসুদ কবির বলেন, মঙ্গলবারের তুলনায় বুধবার বন্ধ কারখানার সংখ্যা কমে এসেছে। মজুরি বোর্ডের নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা এবং তা বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রকাশের পর শ্রমিকেরা কাজে যোগ দেবেন। আমরা আশা করছি, বৃহস্পতিবার পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান আগের মতো পুরোদমে উৎপাদনে ফিরবে।