৪৬ বছর আগে বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তার পিতা। সে সময় চীনের নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশে দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া কূটনীতিকরা তাদের পরিবারকে সঙ্গে নিতে পারতেন না। ফলে পিতার বাংলাদেশে থাকার সময় এখানে আসা হয়নি তার। ঢাকায় এসে পিতাকে নিয়ে এভাবেই স্মৃতিচারণ করেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিং। ঢাকা-বেইজিং রাজনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে লিউয়ের এবারের সফরটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
গতকাল ঢাকার একটি হোটেলে ‘যেখানে ইতিহাস পথ দেখায়: চীন-বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের গণ্ডি ছাড়িয়ে উদ্যোগ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেন লিউ হাইশিং। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তিনি। সেখানে চীন-বাংলাদেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। বৈঠকেই বাংলাদেশ-চীন সেন্টার ফর পার্টি অ্যান্ড স্টেট গভর্ন্যান্স স্টাডিজের উদ্বোধন করা হয়। পিতাকে নিয়ে স্মৃতিচারণের আগে দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের নানা দিক তুলে ধরেন চীনের এই নেতা। তিনি বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষার কথা ব্যক্ত করেছেন।
লিউ হাইশিংয়ের ভাষ্য, বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগের মাধ্যমে দুই দেশের সহযোগিতাকে আরও এগিয়ে নেয়া হয়েছে। আমরা আদর্শিক বিভাজন তৈরি করি না। কোনো রাজনৈতিক দল সরকারে আছে, নাকি সরকারের বাইরে, তার ভিত্তিতে আমাদের বন্ধুত্ব নির্ধারণ করি না।
প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে এক পর্যায়ে দুই দেশের সম্পর্ক গড়ে তোলার পেছনে পিতার অবদানের কথা তুলে ধরেন লিউ হাইশিং। বলেন, তার পিতা বাংলাদেশে দুই বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। কূটনীতিক হিসেবে তিনি চীন-বাংলাদেশ বন্ধুত্বের বিকাশে অবদান রেখেছেন। দুই দেশের বন্ধুত্বের প্রাসাদ নির্মাণে তিনিও একটি ইট যুক্ত করেছিলেন।
তিনি বলেন, গত পাঁচ দশকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ২ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের বেশি হয়েছে। বাংলাদেশ ছিল এশিয়ার প্রথম দেশ, যারা চীনের সঙ্গে বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতার সমঝোতা স্মারক সই করে।
দুই দেশের বন্ধুত্ব এগিয়ে নিতে তরুণ প্রজন্মের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, প্রবীণ প্রজন্ম দ্বিপক্ষীয় বন্ধুত্বের শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন তরুণ প্রজন্মকে সেই দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে বন্ধুত্ব এগিয়ে নিতে হবে। পানি পান করার সময় যারা কূপ খনন করেছেন, তাদের কথা মনে রাখার একটি প্রাচীন চীনা প্রবাদও উল্লেখ করেন তিনি।
এর আগে সকালে বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন লিউ হাইশিং। পরে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও প্রেসিডেন্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে পৃথক সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের শুভেচ্ছা পৌঁছে দেন লিউ হাইশিং। দুই দেশের ভবিষ্যৎ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন যুগের যৌথ ঘোষণা অনুযায়ী সহযোগিতার ক্ষেত্র সমপ্রসারণের প্রত্যাশা জানান। বৈঠকে বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর, আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব (আরসিইপি) এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হয়। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে চীনের সহযোগিতা কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী। জবাবে বিষয়টি চীনের প্রেসিডেন্টকে অবহিত করার আশ্বাস দেন লিউ।
এদিকে প্রেসিডেন্টের প্রেস উইং থেকে জানানো হয়, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে চীনা মন্ত্রীর সাক্ষাতে মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন, চীনা বিনিয়োগ, সবুজ জ্বালানি, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় নিয়ে আলোচনা হয়। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে চীনের সক্রিয় ভূমিকা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান প্রেসিডেন্ট।
বৈঠকে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান চীনের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্বের যে ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে তা আরও বিস্তৃত ও গতিশীল হয়েছে। দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব, পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিতে বিএনপি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি বলেন, বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। তিনি বলেন, বাংলাদেশের উৎপাদন, অবকাঠামো, জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও বস্ত্র খাতে চীনা বিনিয়োগের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর আহ্বান জানান রিজভী আহমেদ।
গোলটেবিল বৈঠকে ছিলেন বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। অনুষ্ঠানে আরও বক্তৃতা করেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ প্রমুখ।
গত মঙ্গলবার রাতে তিনদিনের সফরে ঢাকায় আসেন লিউ হাইশিং। বুধবার তিনি ঢাকায় ব্যস্ততম দিন পার করেন। সফরটি পূর্ব নির্ধারিত ছিল। ঢাকায় নিযুক্ত চীনের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সঙ্গে লিউয়ের সফর নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কথা হয়। সফরের শেষ দিন অর্থাৎ আজ সকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে লিউয়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা ছাড়ার কথা তার।
