মার্কিন নীতিতে বড় পরিবর্তন দেখছি না

শাহাব এনাম খানের বিশ্লেষণ

মার্কিন নীতিতে বড় পরিবর্তন দেখছি না

ফন্ট সাইজ:

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির জয় হলেও বৈশ্বিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. শাহাব এনাম খান। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের কর্তৃত্ব এখনো বহাল থাকবে। ফলে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্রেটদের হাতে গেলেও বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কে তেমন কোনো পরিবর্তন আসবে না। ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের ক্ষেত্রেও অভিন্ন মত দিয়েছেন এই বিশ্লেষক। তার মতে, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্য কিংবা শুল্কনীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা নেই। কেবল ইরান ও চীনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে মার্কিন অর্থনীতিতে যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় প্রশাসনের নীতি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন হতে পারে।

মানবজমিনের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান। মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্রেটদের জয়কে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির বিরুদ্ধে সরাসরি জনরায় হিসেবে দেখছেন না তিনি। তার মতে, এই নির্বাচনের ফলাফলে মার্কিন জনগণের অর্থনৈতিক অসন্তোষের প্রতিফলন ঘটেছে। একই সঙ্গে দেশটির ক্ষমতার ভারসাম্য ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করার পক্ষেও জনগণের একটি বার্তা রয়েছে।

শাহাব এনাম বলেন, ডেমোক্রেটদের এই জয় অপ্রত্যাশিত ছিল না। এর পেছনে দু’টি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রথমত, ইরান যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। যুদ্ধের আগে ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে অর্থনীতি মোটামুটি স্থিতিশীলতার দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু যুদ্ধের পর মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি তেলের দাম এবং নিত্যদিনের ব্যয় মার্কিন জনগণের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। এর মধ্যদিয়ে জনগণ বর্তমান অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা নিয়ে তাদের অসন্তোষের বার্তা দিয়েছে।

দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নটিও এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন তিনি। এই ভোটের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে বলে মনে করছেন না শাহাব এনাম। কারণ রিপাবলিকানরাও ভোট পেয়েছে। বরং সিনেট, প্রতিনিধি পরিষদ ও প্রেসিডেন্টের মধ্যে ক্ষমতার যে বিন্যাস রয়েছে, সেই ভারসাম্যের প্রতি মার্কিন জনগণের আস্থার প্রতিফলন ঘটেছে।

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে শাহাব এনাম বলেন, আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। তবে ইরান ও চীনকে কেন্দ্র করে মার্কিন নীতিতে পরিবর্তন এলে তার পরোক্ষ প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়তে পারে।

দুই দেশের বিদ্যমান বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও চুক্তির ক্ষেত্রেও ডেমোক্রেটদের জয় বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো বিশেষ সুযোগ তৈরি করবে না বলে মনে করেন এই বিশ্লেষক। তার মতে, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ও নির্বাহী বিভাগের ওপর প্রেসিডেন্টের কর্তৃত্ব রয়েছে। পাশাপাশি প্রেসিডেন্টের ভেটো দেয়ার ক্ষমতাও রয়েছে। ফলে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন হলেও পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সহজ হবে না।

চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ওপর ওয়াশিংটনের চাপ বাড়ার আশঙ্কাও নাকচ করেছেন শাহাব এনাম। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামো অনুযায়ী পররাষ্ট্রনীতি মূলত কেন্দ্রীয় বা ফেডারেল সরকারের আওতাধীন এবং এ ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের গুরুত্বপূর্ণ কর্তৃত্ব রয়েছে। ফলে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে ট্রাম্প প্রশাসন তার বৈদেশিক নীতি পরিবর্তন করবে কিংবা ডেমোক্রেটরা আলাদাভাবে বাংলাদেশের ওপর চীনকেন্দ্রিক কোনো চাপ তৈরির উদ্যোগ নেবে বলে মনে করেন না তিনি।

শাহাব এনামের মতে, ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক টানাপড়েনের ক্ষেত্রেও বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। তবে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলের পর ট্রাম্প আরও আগ্রাসী হয়ে উঠবেন, নাকি ডেমোক্রেটদের সঙ্গে সমঝোতা করে চলতে বাধ্য হবেন-এমন প্রশ্নে শাহাব এনাম বলেন, ডেমোক্রেটদের সঙ্গে কাজ করার কথা ট্রাম্প নিজেই ঘোষণা করেছেন। এই নির্বাচনের ফলাফল ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি বড় বার্তা। রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাজাতে হবে তাকে। কারণ নির্বাচনের ফলাফলের মধ্যদিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একটি চেক অ্যান্ড ব্যালান্স তৈরি হয়েছে। ফলে আগের তুলনায় ট্রাম্প ও রিপাবলিকানরা ডেমোক্রেটদের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে বেশি সম্পৃক্ত হবেন বলে মনে করেন তিনি।