যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। দলটি কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ও নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ, উভয়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়কে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম দুই বছরের শাসনের বিরুদ্ধে বড় ধরনের জনরায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল আসন হারায়। তবে এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের ব্যাপকতা ছিল নজিরবিহীন।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ইরান যুদ্ধ, ট্রাম্পের অজনপ্রিয়তা এবং ভোটারদের সমর্থন পরিবর্তন এই পরাজয়ের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বিবিসির বিশ্লেষণে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পাঁচটি কারণ তুলে ধরা হয়েছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে চাপে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতে ভোটারদের ক্ষোভও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
নির্বাচনের আগে বিবিসিকে নর্থ ক্যারোলাইনার এক ভোটার বলেন, ‘জ্বালানি, মুদি পণ্য, সবকিছুর দাম বাড়ছে।’ এ কারণে এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরিবর্তে ডেমোক্রেটদের ভোট দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান তিনি।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) বেড়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এতে ভূমিকা রেখেছে। অক্টোবরের শুরুতে দেশটিতে ডিজেলের গড় খুচরা মূল্য প্রতি গ্যালনে ৬ ডলার ৫২ সেন্টের রেকর্ড দামের কাছাকাছি পৌঁছায়।
ভোটারদের ওপর পরিচালিত জরিপে প্রায় ৭৯ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, মূল্যস্ফীতি গত এক বছরে তাদের পরিবারকে মাঝারি থেকে গুরুতর আর্থিক সংকটে ফেলেছে। তাদের মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি মনে করেন, স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি মূল্যবৃদ্ধির জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিই দায়ী।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ
যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরান যুদ্ধ। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক অভিযান শুরুর পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
এর জবাবে তেহরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়। বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে অচলাবস্থার প্রভাব পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারেও। বাড়তে থাকে পেট্রোলের দাম।
যুদ্ধটি অধিকাংশ মার্কিন নাগরিকের কাছেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে আস্থা রাখা সমর্থকদের কাছে এটি ছিল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির পরিপন্থী। কারণ, নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প নতুন যুদ্ধে জড়ানোর বিরোধিতা করেছিলেন।
ভোটারদের ওপর পরিচালিত এক জরিপে ৬৩ শতাংশ উত্তরদাতা ইরানে সামরিক অভিযান চালানোর সিদ্ধান্তকে ভুল বলে মনে করেছেন। অন্যদিকে, ৭৪ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, কংগ্রেস নির্বাচনে ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে ইরান যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ বা বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে।
নির্বাচনের পরদিন ট্রাম্প স্বীকার করেন, পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধের ভূমিকা ছিল। তবে ফক্স নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকাতে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া তার সামনে আর কোনো বিকল্প ছিল না।
ডেমোক্রেটদের সুসংগঠিত প্রচারণা
ডেমোক্রেটদের বড় জয়ের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন দলটির দক্ষ ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থীরা। বিশেষ করে ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলোতেও তারা ভোটারদের আস্থা অর্জন করেছেন।
প্রচারণায় জীবনযাত্রার ব্যয় এবং স্বাস্থ্যসেবার সুযোগকে গুরুত্ব দিয়েছেন ডেমোক্রেট প্রার্থীরা। টেক্সাসে সাবেক শিক্ষক জেমস টালেরিকো এবং কানসাসে যাজক অ্যাডাম হ্যামিলটন নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয়টিও এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যা ভোটারদের মধ্যে সাড়া ফেলেছে।
সাউথ ক্যারোলাইনায় বড় চমক দেখিয়েছেন ডেমোক্রেট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুজ। শিশু চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত এই প্রার্থী স্বাস্থ্যসেবার ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে প্রচারণা চালিয়ে ভোটারদের সমর্থন আদায় করেন।
মিশিগানে জয় পাওয়া সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা আবদুল আল-সাইদো রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব কমানো এবং সাধারণ মানুষের পকেটে অর্থ রাখার প্রতিশ্রুতিকে প্রচারণার মূল স্লোগান করেন।
জর্জিয়ায় পুনর্নির্বাচিত ডেমোক্রেট সিনেটর জন অসফও জীবনযাত্রার ব্যয় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থানকে প্রচারণার কেন্দ্রে রাখেন। ৩৯ বছর বয়সী এই নেতার জয় ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
এমনকি ডেমোক্রেটদের প্রশংসা করেছেন ট্রাম্প নিজেও। ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, ‘তারা ভালো কাজ করেছে।’
অন্যদিকে, টেক্সাসের কেন প্যাক্সটনের মতো কয়েকজন রিপাবলিকান প্রার্থীর বিরুদ্ধে দুর্বল প্রচারণা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। ভোটারদের প্রকৃত উদ্বেগ ও প্রত্যাশাকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে না পারায় তারা পিছিয়ে পড়েছেন।
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ভাটা
ভোটারদের অসন্তোষের অন্যতম দুটি বড় কারণ ছিল নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও ইরান যুদ্ধ। দুটি বিষয়ই সরাসরি ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কিত। এমনকি রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যেও তার জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করেছিল। ফলে ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে সমর্থন দেয়া কয়েকটি অঙ্গরাজ্যেও রিপাবলিকান প্রার্থীরা ঝুঁকিতে পড়ে যান।
নিজের সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে টানতে ট্রাম্প ভোটারদের উদ্দেশে বলেছিলেন, তারা যেন কল্পনা করেন, ব্যালটে তার নামও রয়েছে।
তবে এক দশকের বেশি সময় ধরে মার্কিন রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে থাকা ট্রাম্পের রাজনৈতিক আবেদনেও ভাটা পড়তে শুরু করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ক্রমবর্ধমান জনঅসন্তোষের মধ্যে রিপাবলিকানদের নির্বাচনী প্রচারণার প্রধান মুখ হিসেবে নিজেকে সামনে নিয়ে আসা শেষ পর্যন্ত দলের জন্য হিতে বিপরীত হয়েছে।
নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জনমত জরিপেও দেখা যায়, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক চান, ট্রাম্প যেন নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির মতো তাদের দৈনন্দিন সমস্যাগুলোতে বেশি মনোযোগ দেন।
তবে নির্বাচনের আগের দিন সোমবার ওয়াশিংটন ডিসিতে শেষ নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্প নিজের বক্তব্যের বড় একটি অংশ ব্যয় করেন তার পেছনে থাকা বিতর্কিত রিফ্লেক্টিং পুল সংস্কার প্রকল্প নিয়ে কথা বলতে।
হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সমর্থন হারানো
দুই বছর আগে হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের একটি অংশের সমর্থন পেয়ে বড় জয় নিশ্চিত করেছিলেন ট্রাম্প। তবে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সেই প্রবণতা উল্টে গেছে।
টেক্সাস-মেক্সিকো সীমান্তবর্তী হিস্পানিক অধ্যুষিত তিনটি কংগ্রেসনাল আসনেই জয় পেয়েছেন ডেমোক্রেট প্রার্থীরা।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তুলনায় হিস্পানিক সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্টিগুলোতে রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থীদের সমর্থন ২২ শতাংশের বেশি কমেছে। দেশটির বড় জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ভোটের হিসাবে এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি বলে জানিয়েছেন সংবাদমাধ্যমটির তথ্য বিশ্লেষক জেফ অ্যাডেলসন।
অভিবাসনবিরোধী কঠোর অভিযান নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষের মধ্যেই এই পরিবর্তন এসেছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা আইসের (আইসিই) কার্যক্রম সম্পর্কে ৫৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিকের নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে।
এদিকে কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্টিগুলোতেও সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্রেটদের দিকে ভোটারদের ঝোঁক বেড়েছে।
মিসিসিপিতে সিনেট নির্বাচনও ছিল হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। অঙ্গরাজ্যটিতে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারের হার প্রায় ৩৭ শতাংশ, যা যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। সেখানে স্কট কোলম জয়ী হলে ১৯৮২ সালের পর প্রথমবারের মতো কোনো ডেমোক্রেট মিসিসিপি থেকে সিনেটর নির্বাচিত হবেন।
বিবিসির বিশ্লেষণ
যে পাঁচ কারণে ধরাশায়ী রিপাবলিকানরা
মানবজমিন ডেস্ক
বিশ্বজমিন
১ ঘন্টা আগে
৪ নভেম্বর (বুধবার), ২০২৬, ১১ঃ৩২ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
