স্বাধীনতার পর থেকে দেশে কতো সরকারের পরিবর্তন হয়েছে, বদলে গেছে বহু জনপ্রতিনিধি ও ক্ষমতার মসনদ। কিন্তু মানিকগঞ্জের শিবালয় ও ঘিওর উপজেলার বুতুনী-শোলধারা খেয়াঘাটের খিরাই নদীর উপর থাকা নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোটির ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। যুগের পর যুগ ধরে দুই পাড়ের হাজার হাজার মানুষের যাতায়াতের প্রধান এই ভরসাটি এখন তাদের কাছে আক্ষরিক অর্থেই ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংসদ নির্বাচন এলে রাজনীতিকদের আশ্বাসের বাণী ফোটে সাধারণ মানুষের দুয়ারে। বুতুনী-শোলধারার সহজ-সরল মানুষগুলোও নতুন স্বপ্নের আশায় বুক বাঁধে, কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেয়। কিন্তু ভোট শেষেই প্রতিনিধিরা বসেন মসনদে, আর খোঁজ রাখেন না সেই জরাজীর্ণ বাঁশের সাঁকোর। সরজমিন শোলধারা-বুতুনী খেয়াঘাটে গিয়ে দেখা যায়, এক করুণ চিত্র।
জরাজীর্ণ বাঁশ আর কাঠের টুকরো দিয়ে কোনোমতে খাড়া করে রাখা হয়েছে সাঁকোটি। ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকোটি দিয়েই প্রতিদিন চরম আতঙ্ক বুকে নিয়ে পারাপার হচ্ছেন শিবালয়, ঘিওর, হরিরামপুর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নসহ জেলার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বেশ কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দা। পথচারীদের মধ্যে রয়েছেন দৈনন্দিন কাজের তাগিদে বের হওয়া বিভিন্ন পেশার মানুষ ও স্কুল-কলেজের কোমলমতি শিক্ষার্থী। কেউ পায়ে হেঁটে, আবার কেউ মোটরসাইকেল, ভ্যান কিংবা রিকশা নিয়ে পার হন নড়বড়ে সাঁকো। অসাবধানতায় মাঝেমধ্যেই সাঁকো থেকে নদীতে পড়ে যাওয়ার মতো দুর্ঘটনার শিকার হতে হয় সাধারণ মানুষ ও যানবাহন চালকদের। সাঁকোটি টিকিয়ে রাখার পেছনে রয়েছে অমর চন্দ্র দাস ও তার পরিবারের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম। খেয়াঘাটের পাটনি অমর চন্দ্র দাস আক্ষেপের সুরে বলেন, আমার বাপ-দাদার আমল থেকেই আমরা এই খেয়াঘাটটি রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছি। বাঁশ-কাঠ দিয়ে কোনোমতে সাঁকো বানিয়ে মানুষ পারাপারের ব্যবস্থা করি। মানুষের সহায়তায় পাওয়া টাকায় সংসার চললেও আমরা মনেপ্রাণে চাই এখানে একটা পাকা সেতু তৈরি হোক। স্থানীয় নদীতীরের বাসিন্দা মমতা হালদার তার উদ্বেগের কথা জানিয়ে বলেন, ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে এই ভাঙাচোরা বাঁশের সাঁকো পার হতে বুক কেঁপে ওঠে।
হাত ফসকে একটু নিচে পড়ে গেলেই বড় বিপদ। সাঁকো পার হয়ে জেলা শহরে যাতায়াত করা পাটগ্রামের পান্নু মোল্লা জানান, প্রতিদিন কয়েকবার এই পথ পার হতে গিয়ে টাকা আর সময়-দুটোরই যেমন অপচয় হয়, তেমনি প্রতিটা পদক্ষেপে থাকে দুর্ঘটনার ভয়। এ বিষয়ে বানিয়াজুরী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস আর আনসারী বিল্টু বলেন, ঘিওর ও শিবালয় উপজেলার সীমান্তবর্তী বুতুনী-শোলধারা ঘাটের এই সাঁকোটি এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম। তবে ইউনিয়ন পরিষদের সীমিত বাজেটে এত বড় ও ব্যয়বহুল প্রকল্প বাস্তবায়ন করা অসম্ভব। এটি একমাত্র সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বিশেষ উদ্যোগেই সম্ভব। তবুও আশা করছি, সংশ্লিষ্ট মহলের সহযোগিতায় এখানে একটি পাকা সেতু নির্মিত হলে এলাকাবাসীর দুর্ভোগের অবসান ঘটবে।
