অটোরিকশায় লাশ নিলেন স্বজনরা, ভোগান্তি

ঢামেকে এম্বুলেন্স ধর্মঘট

অটোরিকশায় লাশ নিলেন স্বজনরা, ভোগান্তি

ফন্ট সাইজ:

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক)-এ বেসরকারি এম্বুলেন্স মালিক সমিতির ৩৫ ঘণ্টার ধর্মঘটে অবর্ণনীয় ভোগান্তিতে পড়েন রোগী ও স্বজনরা। মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে বুধবার বিকাল ৫টা পর্যন্ত চলে এম্বুলেন্স মালিকদের ধর্মঘট। এ সময়ে ঢামেকে এম্বুলেন্স সংকটে পড়েন রোগীরা। কোনো রোগীকে ঢামেক থেকে অন্য হাসপাতালে নেয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও পাননি এম্বুলেন্স। বাধ্য হয়ে রোগীকে অটোরিকশা কিংবা প্রাইভেট কারে করে নিয়ে যান স্বজনরা। অপরদিকে মরদেহ ঢাকার বাইরে নিতে পিকআপই ছিল তাদের শেষ ভরসা। এদিকে, এ সংকট সমাধানে এম্বুলেন্স মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন ঢামেকের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেন। আলোচনা শেষে ৭ দিনের জন্য ধর্মঘট প্রত্যাহার করে বাংলাদেশ এম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতি।

সরজমিন দেখা যায়, জরুরি বিভাগের সামনে রোগী ও স্বজনরা হন্যে হয়ে এম্বুলেন্স খুঁজছেন। কেউ ৪-৫ ঘণ্টা, কেউ ৭-৮ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও এম্বুলেন্স পাননি। বাধ্য হয়ে বিকল্প যানবাহনে রোগী ও মরদেহ নিয়ে গন্তব্যে রওনা হন। অনেকে অটোরিকশায় করে রোগীকে নিয়ে যান। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন মরদেহ নিয়ে। মরদেহ নিয়ে যাওয়ার জন্য কোনো যানবাহন পাচ্ছিলেন না স্বজনরা। বাধ্য হয়ে অনেকে অটোরিকশা ও ট্রাকে করে নিয়ে যান। আর ঢাকার বাইরে পিকআপে করে মরদেহ নিয়ে যান। বুধবার সকাল থেকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের গেট, কলেজ গেট, নতুন ভবনসহ আশপাশের এলাকায় কিছু এম্বুলেন্স দেখা যায়। কিন্তু কোনো রোগী পরিবহন করেননি এম্বুলেন্স চালক। অভিযোগ রয়েছে, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ধর্মঘটে অংশ নেয়া মালিক সমিতির এম্বুলেন্স ছাড়াও অন্য এম্বুলেন্স হাসপাতালে প্রবেশ করতে পারেনি। তবে মালিক সমিতির নেতারা জানিয়েছেন, তারা বাইরের কোনো এম্বুলেন্স প্রবেশ কিংবা পরিবহনে বাধা দেননি।

যাত্রাবাড়ী থেকে আসা মোহাম্মদ আনাম মানবজমিনকে বলেন, তিনদিন আগে আমার মা’কে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছিলাম। বুধবার সকাল সাতটার দিকে মা মারা যান। এরপর থেকে এম্বুলেন্সের জন্য চেষ্টা করছি। এখন দুপুর ১২টা বাজে। কিন্তু এখনো কিছু ব্যবস্থা করতে পারিনি। সব যানবাহন মরদেহ পরিবহন করে না। পিকআপের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তারাও ভাড়া বেশি চায়। সব পিকআপ নিতেও চায় না। খাইরুল দেওয়ান নামে আরেক স্বজন বলেন, আমার স্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। গুরুতর আহত অবস্থায় মঙ্গলবার রাত ১২টার দিকে তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসি। ডাক্তার তাকে জরুরিভাবে পঙ্গু হাসপাতালে নিতে বলেছে। কিন্তু এখানে কোনো এম্বুলেন্স পাচ্ছি না। আমরা ৯৯৯-এ কল দিয়ে সরাসরি কথা বলেছি। তারা বলছে, গাড়ি চলবে না। আমরা যাবো না। আমি প্রায় ৩ ঘণ্টা ধরে চেষ্টা করছি। কিন্তু এম্বুলেন্স পাচ্ছি না। এখন অন্য কোনোভাবে নেয়ার চেষ্টা করছি।

অপরদিকে এম্বুলেন্স মালিকরা বলছেন, তারা এম্বুলেন্সগুলো তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের ভবনের পাশে পার্কিং করে রাখতেন। কোনো নির্দেশনা ছাড়াই তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। তারা এম্বুলেন্স রাখার জন্য জায়গা পাচ্ছেন না। রাস্তায় রাখলে ট্রাফিক পুলিশ তাদের নামে মামলা দেয়। বাধ্য হয়ে তারা ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন। তারা এম্বুলেন্স রাখার জন্য উপযুক্ত জায়গার দাবি জানিয়েছেন। এম্বুলেন্স মালিক মো. ওলিউল্লাহ মানবজমিনকে বলেন, সরকারের যেকোনো প্রয়োজনে আমরা পাশে থাকি। রানা প্লাজার দুর্ঘটনার সময় আমরা বিনামূল্যে মরদেহ পরিবহন করেছি। করোনার সময়ে আমরা মরদেহ পরিবহন করেছি। যেকোনো বড় দুর্যোগে আমরা সেবা দিয়ে থাকি।

ঢামেকে আমরা যুগের পর যুগ ধরে আছি। অথচ আমাদের কোনো নির্দেশনা ছাড়াই বের করে দেয়া হয়েছে। বেসরকারি এম্বুলেন্স মালিক সমিতির সভাপতি আবুল হোসেন মানবজমিনকে বলেন, আমরা রাস্তায় এম্বুলেন্স রাখলে ট্রাফিক পুলিশ মামলা দেয়। আমাদের গাড়ি রাখার কোনো জায়গা নেই। এভাবে আমরা কীভাবে ব্যবসা করবো?
৭ দিনের জন্য ধর্মঘট স্থগিত : এদিকে এ সমস্যার সমাধান করতে এম্বুলেন্স মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন ঢামেকের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফরহাদ হোসেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে চলে আলোচনা। এ সময় পরিচালক এম্বুলেন্স মালিকদের কাছে ৭ দিনের সময় চান। এ সময়ে আলোচনা করে বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দেন। এরপর এম্বুলেন্স মালিক সমিতির নেতারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ৭ দিনের জন্য ধর্মঘট স্থগিত করেন।