সুনামগঞ্জের তাহিরপুর সড়কের চলমান প্রকল্পের কাজ নিয়ে মুখোমুখি স্থানীয় এমপি নুরুল ইসলাম নুরুল ও ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম। ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম স্থানীয় এমপি ও তার লোকজনের বিরুদ্ধে কোটি টাকার চাঁদা দাবির অভিযোগ তুলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ একাধিক দপ্তরে আবেদন করেছেন। এ অভিযোগ দায়েরের পর এমপি’র লোকজনের নেতৃত্বে প্রকল্পে কর্ম শ্রমিকদের ওপর হামলার অভিযোগ করা হয়েছে। এদিকে গতকাল সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে ওই প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছেন এমপি নুরুল ইসলাম। এ সময় সেখানে তিনি প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখতে অনুরোধ করেন। ঠিকাদার তার বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির যে অভিযোগ করেছেন সেটিরও তদন্ত দাবি করেন। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর রোডের বিশ্বম্ভরপুর কলেজের সামনে ব্রিজসহ সড়ক উঁচুকরণের কাজ করছেন প্রকল্পের সাব-ঠিকাদার ইসলাম ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী শফিকুল ইসলাম।
এ ছাড়া তিনি ওই রুটের তাহিরপুর অংশেও আরও ৮৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্পে সাব-ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছেন। তার মূল বাড়ি তাহিরপুরে। ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, কয়েক মাস আগে বিশ্বম্ভরপুরের কলেজ গেটের ব্রিজ নির্মাণ ও সড়ক উঁচুকরণের কাজ তিনি আরেকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে টেন্ডারের মাধ্যমে পান। প্রায় দুই মাস আগে সুনামগঞ্জ পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হাসান নাঈম তার কাছে প্রকল্পটি হস্তান্তরের অনুরোধ জানান। ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম তার এ প্রস্তাবে রাজি না হওয়ার কারণে চলমান প্রকল্পগুলো নিয়ে একের পর এক নাটকীয় ঘটনা ঘটছে।
মঙ্গলবার তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপি বরাবর দেয়া আবেদনে দাবি করেন, নুরুল ইসলাম নুরুল এমপি ও তার সহযোগীরা বিভিন্ন সময়ে তার কাছে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেছেন। দাবিকৃত চাঁদার টাকা দেয়ার জন্য তারা বিভিন্ন সময় চাপ দিচ্ছেন ও হুমকি প্রদর্শন করছেন। টাকা পরিশোধ না করলে তাকে গুম করে হত্যা করার হুমকিও দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগে জানান তিনি। শফিকুল জানান, একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তি হওয়ার পরও গত ১৭ই সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জ পৌরসভায় নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছে সে মামলায় তাকে ৫১ নম্বর আসামি করা হয়েছে।
চাঁদার টাকা না দেয়ার কারণে তাকে হয়রানি ও মিথ্যা মামলায় জড়াতে এমপি’র নির্দেশে সুনামগঞ্জ জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল হাসান রাজু তাকে ওই মামলায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এরপর তার সিলেটের বাসায় পুলিশ নিয়ে অভিযান চালানো হয়েছে। বাসায় ব্যাপক তল্লাশি ছাড়াও তার স্ত্রীকে হুমকি প্রদান করা হয়েছে। অভিযোগে ঠিদাকার আরও জানান, গত ২০শে সেপ্টেম্বর দুপুরে মুক্তিরখলা-১ ব্রিজের নির্মাণকাজে বাধা প্রদান করে কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়। গতকাল বিকালে ঠিকাদারের নিয়োজিত সাইট ম্যানেজার শফিক আহমদ অভিযোগ করেছেন, মঙ্গলবার বিকালে এমপি ও তার লোকজন বিশ্বম্ভরপুর থেকে সুনামগঞ্জে ফেরার পথে প্রকল্পের কাজের সময় তার দুই কর্মচারী কবির ও মনির আহমদকে মারধর করেন। এ ঘটনায় তারা আহত হলে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এদিকে গতকাল দুপুরে সুনামগঞ্জ ও সড়ক জনপথ বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে ওই প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে যান এমপি নুরুল ইসলাম নুরুল। এ সময় তিনি বলেন, জনগণের কাজ আদায় করতে গিয়ে যদি অন্যান্য এমপিদের মতো স্ক্যান্ডাল রটিয়ে আমাকে দমানোর চেষ্টা করা হয় এটি হবে ভুল ধারণা। আমার এলাকা সুনামগঞ্জ সদর ও বিশ্বম্ভরপুরের প্রতিটি কাজ সঠিকভাবে আমরা আদায় করে নেবো। এমপি বলেন, মঙ্গলবার সওজের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ আমরা এলাকায় আসবো সেটি ঠিকাদারকে জানানো হয়েছিল। আমরা প্রকল্পস্থলে এলেও ঠিকাদার আসেননি। এ সময় তিনি উপস্থিত সওজ কর্মকর্তাদের কাছে কাজ বন্ধ রাখার আহ্বান জানান। তিনি দাবি করেন, ঠিকাদার নিজের দোষ আড়াল করতে মাফিয়া চক্রের মতো এই গেইমটা করছে।
তিনি ঠিকাদারকে ‘ডেভিল’ বলে আখ্যায়িত করেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ দেয়া হয়েছে সেটি যেন সুষ্ঠুভাবে তদন্ত হয়। আর তদন্তে যেটা সঠিক হবে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। ঠিকাদারের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের বিষয়টি প্রশাসনের কাজ বলে দাবি করেন এমপি। এদিকে, প্রকল্প নিয়ে এমপি ও ঠিকাদারের মুখোমুখি অবস্থানে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তারা। সিলেট সওজের বিভাগীয় কর্মকর্তা সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, স্থানীয় এমপি অভিযোগ এনেছেন দেয়াল হেলে পড়েছে। সে কাজ চলমান আছে। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেবো। তিনি বলেন, কাজের গুণগত মান বজায় রাখতে সওজ কর্তৃপক্ষ সব ঠিকাদারকে বলে আসছে। নিম্নমানের কাজ যাতে না করা হয় সেজন্য সতর্কও করা হয়েছে।
