ফুটবলের সবুজ গালিচা পেরিয়ে লিওনেল মেসির নাম এবার পৌঁছে যাচ্ছে আন্দিজ পর্বতমালার দুর্গম পাহাড়ি উপত্যকায়। পেরুর আন্দিজে সম্পূর্ণ নতুন এক প্রজাতির উদ্ভিদের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। আর্জেন্টিনার জার্সির সঙ্গে মিল থাকা এই ফুলের অনন্য রূপ আর বিশ্বজয়ী মহাতারকার প্রতি ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ উদ্ভিদটির নাম রাখা হয়েছে ‘সালভিয়া মেসি’।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক জার্নাল ‘ফাইটোটাকেসা’তে এই আবিষ্কারের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রকাশিত হয়েছে। এই অভিনব আবিষ্কার শুধু বৈজ্ঞানিক জগতেই নয়, আলোড়ন তুলেছে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যেও। এ আবিষ্কারের পেছনের গল্পটি বেশ রোমাঞ্চকর। আর্জেন্টাইন দৈনিক লা নাসিওনার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গবেষণার শুরুটা কোনো ঠান্ডা ল্যাবরেটরিতে হয়নি, বরং হয়েছে ইন্টারনেটের ভার্চুয়াল দুনিয়ায়। আর্জেন্টিনার প্রখ্যাত কৃষিবিদ ও রয়্যাল হর্টিকালচারাল সোসাইটি অব লন্ডনের পুরস্কারপ্রাপ্ত উদ্ভিদ প্রজননবিদ রোল্যান্ডো উরিয়ার হাত ধরে উঠে আসে আবিষ্কারটি। তিনি প্রকৃতিপ্রেমীদের শেয়ার করা ছবি ঘাঁটতে গিয়ে পেরুর পাহাড়ি অঞ্চলের একটি অদ্ভুত গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ দেখতে পান। তার অভিজ্ঞ চোখ বুঝতে পারে, বইয়ের পাতায় নথিভুক্ত কোনো পরিচিত প্রজাতির সঙ্গে এর মিল নেই। এরপর তিনি পেরুর খ্যাতনামা উদ্ভিদবিজ্ঞানী পাউল গনজালেস আর্সে এবং বায়োলোজিস্ট জিন কাপচা রামোসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
তিন গবেষকের এই দলটি মিলে ঐতিহাসিক আর্কাইভ ঘাঁটেন ও বৈজ্ঞানিক সংগ্রহশালার নমুনা পরীক্ষা করেন। পরে দেশটির দুর্গম পাহাড়ি ঢালে একাধিক বছরের অভিযান পরিচালনা করেন তারা। অবশেষে তাদের দীর্ঘ গবেষণা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণে প্রমাণিত হয় যে, এটি দেড় মিটার পর্যন্ত লম্বা এমন এক ঝোপঝাড় জাতীয় উদ্ভিদ, যা এর আগে পৃথিবীর কেউ কখনো আবিষ্কার বা নামকরণ করেননি। কেন মেসির নামে নামকরণ
বিজ্ঞানসম্মত নিয়মানুযায়ী, কোনো বিশেষ ব্যক্তির অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে লাতিন ব্যাকরণের নিয়ম মেনে নামের শেষে ডাবল ‘আই’ যুক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে উদ্ভিদটিকে ‘মেসির নিজস্ব উদ্ভিদ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে এই নামকরণের পেছনে জড়িয়ে আছে এক চমৎকার নান্দনিক সংযোগ। উদ্ভিদটির পাপড়িতে সাদা এবং হালকা আসমানী বা নীল রঙের এক অপূর্ব মিশ্রণ রয়েছে, যা হুবহু আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী জার্সির রঙের কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রকৃতি যেন নিজের খেয়ালে আন্দিজের বুকে তৈরি করেছে আর্জেন্টিনার এক জীবন্ত পোস্টকার্ড। গবেষক দলের সদস্য পল গঞ্জালেস আর্সে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রকৃতির এই রূপ যেন জাদুকরী এক কাকতালীয় ব্যাপার। এর রঙ দেখে প্রথম মুহূর্ত থেকেই আমাদের মনে লিওনেল মেসির কথা ভেসে ওঠে।’
অস্তিত্বের সংকট ও সংরক্ষণের তাগিদ
পেরুর আন্দিজ পর্বতমালার প্রায় ২০০০ থেকে ২৪০০ মিটার উচ্চতায় ঘাসবন ও পাথুরে ঢালগুলোতে জন্ম নেয় এই বিরল প্রজাতিটি। অত্যন্ত সীমিত এলাকায় এই উদ্ভিদটির আবাসস্থল হওয়ায় জলবায়ুর পরিবর্তন এবং বুনো আগুনের কারণে এর অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে। গবেষকরা প্রাথমিক মূল্যায়নে প্রজাতিটিকে ‘বিপন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বিজ্ঞানীদের মতে, ‘সালভিয়া মেসি’ আবিষ্কার কেবল আঞ্চলিক গর্ব বা ফুটবল তারকার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নয়। এটি আন্দিজের গভীর অরণ্যে লুকিয়ে থাকা অসংখ্য অজানা প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার এক জোরালো বার্তাও বটে। ফুটবল মাঠে জাদুকরি পায়ের মহাতারকার নামাঙ্কিত এই ফুলটি এখন পাহাড়ের বুক চিরে টিকে থাকার এক নীরব লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। পেরুর স্থানীয় মানুষ এই আবিষ্কার নিয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত। তারা মনে করেন, এতে বিশ্বজুড়ে দেশটির পর্যটনও বাড়বে। তবে এই অমূল্য সম্পদ রক্ষা করা এখন বড় দায়িত্ব।
