আগামী ডিসেম্বরে সৌদি আরবের রিয়াদে অনুষ্ঠিত হবে এশিয়ান ইনডোর অ্যান্ড মার্শাল আর্ট গেমস। ২০২৭ সালের ৩ থেকে ১১ই এপ্রিল পাকিস্তানের তিন শহরে হওয়ার কথা ১৪তম সাউথ এশিয়ান গেমস (এসএ গেমস)। অথচ গুরুত্বপূর্ণ এই দুটি আসর সামনে রেখে বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোসিয়েশনের (বিওএ) তেমন কোনো তৎপরতা নেই। এশিয়ান গেমসে চরম ব্যর্থতার পরও সংস্থাটির টনক নড়েনি। ফেডারেশনগুলোকে প্রস্তুতি শুরুর নির্দেশনাও দেয়নি বিওএ। এমন পরিস্থিতিতে এসএ গেমসে আরও হতাশাজনক ফলের শঙ্কায় ক্রীড়া ফেডারেশনগুলো। অনেকেই তাকিয়ে আছে বিওএর নির্দেশনার দিকে। কিন্তু খোদ অলিম্পিক সংস্থাটিই এখন নেতৃত্বের সংকটে। বিওএর নির্বাহী কমিটি থেকে পদত্যাগের হিড়িক পড়েছে। গত তিন দিনে সহ-সভাপতি, উপমহাসচিবসহ নয়জন কর্মকর্তা পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। সামনে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ৩৭ সদস্যের নির্বাহী কমিটি থেকে একের পর এক সদস্য সরে দাঁড়ালে একসময় কোরাম সংকট দেখা দিতে পারে। তাতে বিওএর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাও প্রশ্নের মুখে পড়বে। এমন পরিস্থিতিতে মহাসচিব জোবায়েদুর রহমান রানার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিজের নেতৃত্ব টিকিয়ে রাখা।
এসএ গেমসের প্রস্তুতি নিয়ে রানার নেতৃত্বাধীন বিওএর ওপর আস্থা রাখতে পারছে না অনেক ফেডারেশন। এর পেছনে রয়েছে গত এশিয়ান গেমসে অংশ নেওয়া বেশির ভাগ ফেডারেশনের বরাদ্দ না পাওয়ার অভিযোগ। গেমস চলাকালে প্রশিক্ষণ বাবদ যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় বিওএকে ১০ কোটি টাকা দিলেও প্রতিশ্রুত অর্থ এখনো হাতে পায়নি অনেক ফেডারেশন। অথচ অতীতে বড় কোনো গেমসের আগে সরকারের অর্থছাড়ের অপেক্ষায় না থেকে বিওএ নিজস্ব তহবিল থেকে ফেডারেশনগুলোকে অর্থ দিত। পরে সরকারের বরাদ্দ এলে তা সমন্বয় করা হতো। এবার এশিয়ান গেমসের আগে সেই উদ্যোগও নেয়নি সংস্থাটি। গত বছরের ৩০ নভেম্বর বিওএর মহাসচিব নির্বাচিত হন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত সার্চ কমিটির আহ্বায়ক জোবায়েদুর রহমান রানা। ওই কমিটির সদস্য ছিলেন ইমরোজ আহমেদ। সে সময় বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশনের কমিটি গঠনের সুযোগ পেয়েছিল সার্চ কমিটি। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজেদের পছন্দের লোকজনকে বিভিন্ন ফেডারেশনে বসানোর অভিযোগ উঠেছিল রানা ও ইমরোজের বিরুদ্ধে। আলোচিত ওই কমিটির আহ্বায়ক রানা পরে বিওএ’র মহাসচিব নির্বাচিত হন, আর সদস্য ইমরোজ আহমেদ হন সহ-সভাপতি।
অভিযোগ রয়েছে, এরপর থেকে এই দুই কর্মকর্তা নিজেদের ইচ্ছামতো বিওএ পরিচালনা করেছেন। বড় ক্রীড়া আসরগুলোতে বারবার শেফ দ্য মিশনের দায়িত্ব পালন করেছেন ইমরোজ আহমেদ। গত ১৮ই জুলাই জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ একসঙ্গে ২৭টি ফেডারেশনের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনলে বিওএর নির্বাহী কমিটিতে থাকা অনেকের অবস্থানও দুর্বল হয়ে পড়ে। নিজ নিজ ফেডারেশন থেকে অপসারিত হওয়ার পর বিওএর বর্তমান কমিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। নিজেদের গঠন করা ফেডারেশন কমিটিগুলো এক দিনে বদলে দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হন রানা-ইমরোজ। এ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে সরকারের সমালোচনাও করেন তারা। ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা ফেডারেশন থেকে সরে যাওয়ায় রানা ও ইমরোজের সাংগঠনিক অবস্থানও চাপে পড়ে। এর মধ্যেই জাপানের নাগোয়ায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের হতাশাজনক পারফরম্যান্স বিওএর নেতৃত্বকে আরও সমালোচনার মুখে ফেলে। ২৬০ সদস্যের বিশাল বহর নিয়ে অংশ নিয়েও বাংলাদেশ ফিরেছে মাত্র একটি ব্রোঞ্জ পদক নিয়ে। প্রস্তুতির জন্য সময়মতো অর্থ বরাদ্দ না দেওয়াকে এই ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এশিয়ান গেমস চলাকালে ক্রীড়াবিদদের আবাসন ব্যবস্থাপনা নিয়েও সমালোচনার মুখে পড়তে হয় বিওএকে। জাপানে অবস্থান করা মহাসচিব রানা ও শেফ দ্য মিশন ইমরোজের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রস্তুতি থেকে শুরু করে আবাসন-বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যর্থতার অভিযোগের মধ্যেই এবার নির্বাহী কমিটির সদস্যদের পদত্যাগের ঘটনা বিওএর নেতৃত্বকে নতুন সংকটে ফেলেছে।
মঙ্গলবার পদত্যাগ করেন বিওএর সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সভানেত্রী সারওয়াত সিরাজ শুক্লা। একই দিন পদত্যাগপত্র জমা দেন দুই নির্বাহী সদস্য-ঢাকা বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার প্রতিনিধি রুম্মন বিন ওয়ালী সাব্বির এবং বাংলাদেশ জিমন্যাস্টিকস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান। বুধবার ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন উপমহাসচিব ও বাংলাদেশ বক্সিং ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এমএ কুদ্দুস খান। একই দিন সরে দাঁড়ান নির্বাহী সদস্য ও বাংলাদেশ হ্যান্ডবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আহমেদ এবং বাংলাদেশ রোইং ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম। বৃহস্পতিবার পদত্যাগপত্র জমা দেন সহ-সভাপতি মেজর জেনারেল নাঈম আশফাক চৌধুরী (অব.), নির্বাহী সদস্য ফারহাদ জেসমিন লিটি ও আবদুল্লাহ হেল বাকি। সব মিলিয়ে তিন দিনে পদত্যাগ করেছেন নয়জন। আগামীকাল আরও কয়েকজন পদত্যাগ করতে পারেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। যদিও পদত্যাগপত্রে ব্যক্তিগত কারণের কথা উল্লেখ করছেন কর্মকর্তারা, ক্রীড়াঙ্গনে আলোচনা রয়েছে-বিওএর শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর অনাস্থা থেকেই তাঁদের এই সিদ্ধান্ত।
বিশেষ করে মহাসচিব জোবায়েদুর রহমান রানা ও সহ-সভাপতি ইমরোজ আহমেদের নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষের কথা শোনা যাচ্ছে। একদিকে আসন্ন আন্তর্জাতিক গেমসের প্রস্তুতি নিয়ে অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে নির্বাহী কমিটি থেকে একের পর এক পদত্যাগ-সব মিলিয়ে বিওএ এখন কঠিন সময় পার করছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই সংকট কাটিয়ে সংস্থাটি আদৌ ফেডারেশনগুলোর আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে কি না। নাকি নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও সাংগঠনিক অস্থিরতার প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের পরবর্তী গেমস প্রস্তুতিতেও।
