নেত্রকোণার দুর্গাপুর উপজেলায় সাংবাদিক ও সাবেক সেনাসদস্য লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির (৪৫)কে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। বৃহস্পতিবার রাত সোয়া আটটার দিকে দুর্গাপুরের শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের তেলনজিয়া এলাকায় শ্বশুরবাড়ির পাশে দোকানের সামনে এই ঘটনা ঘটে। নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের ডিটপুর সুনুই গ্রামের মহব্বত আলী ফকিরের ছেলে। তিনি একটি বেসরকারি আইপিটিভি (ইন্টারনেট প্রটোকল টেলিভিশন) চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোণা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামের একটি ফেসবুক পেজ চালাতেন। সেখানে বিভিন্ন সীমান্ত চোরাচালান, অনিয়ম ও অপরাধের বিষয়ে লেখালেখি করতেন। তার গ্রামের বাড়ি কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের ডিটপুর সুনই গ্রামে। তিনি পরিবার নিয়ে দুর্গাপুরের বিরিশিরির তেলনজিয়া এলাকায় তার শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাত আটটার দিকে লুৎফুজ্জামান শ্বশুরবাড়ির পাশে একটি দোকানে চা খেয়ে ফিরছিলেন। এ সময় দুই যুবক এসে তাকে লক্ষ্য করে পরপর কয়েকটি গুলি করে। এতে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে লুৎফুজ্জামান ঘটনাস্থলেই মারা যান। গুলির শব্দে স্থানীয় লোকজন ছুটে এলে ওই যুবকরা দৌড়ে পালিয়ে যায়। স্থানীয়রা লুৎফুজ্জামানকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
তেলনজিয়া এলাকার প্রত্যক্ষদর্শী চা দোকানি রবিন রাংছা বলেন, লুৎফুজ্জামান চা খেয়ে দোকান থেকে বের হয়ে বাসার দিকে যাচ্ছিলেন। দোকানে ভুল করে মোবাইল রেখে যাওয়ায় তিনি আবার মোবাইলটা নিতে আসেন। তিনি তখন দোকানে চায়ের কাপ পরিষ্কার করছিলেন। এ সময় দুই যুবক দোকানে এসে প্রথমে সিগারেট চায়। এরপর হঠাৎ লুৎফুজ্জামানকে কয়েকটি গুলি করে। আশপাশের মানুষ ছুটে এলে ওই দু’জন অন্ধকারে পালিয়ে যায়। এর আগে গত বছরের ১০ই নভেম্বর দুপুরে উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তরা লুৎফুজ্জামানকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। ওই ঘটনায় মামলা হলেও দোষীদের বিচার হয়নি।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমদ খান জানান, দুর্বৃত্তদের গুলিতে সাংবাদিক নিহত হওয়ার খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে যাই। সেখানে গিয়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আলিফ ফকিরকে উদ্ধার করি। দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠালে সেখানে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করে। তার মাথা, গলা, বুকসহ শরীরে মোট ৫টি গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। পরে লাশের সুরতহাল তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য নেত্রকোণা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে পাঠানো হয়। শুক্রবার দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষ মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
নেত্রকোণার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন, প্রাথমিকভাবে এটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করছে। হত্যার কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করতে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।
নিহত লুৎফুজ্জামানের বড় বোন কল্পনা আক্তার ও ভাই ছাদেক ফকির বলেন, “সাংবাদিক হিসাবে আমার ভাই সত্য প্রকাশ করতো। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতো, সীমান্তের বিভিন্ন অনিয়ম, অপরাধ তুলে ধরতো এটাই কি তার অপরাধ? এর জন্যে কি তাকে মেরে ফেলতে হবে? আপনারা তার ফেসবুক পেজ (ডিটেকটিভ আর্টিকেল) দেখে বিচার করেন সে কি অন্যায় কিছু করতো কি না।” তারা হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন। এদিকে শুক্রবার বিকালে লুৎফুজ্জামানের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছালে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরিবারের স্বজনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। পরে বাদ আসর জানাজা শেষে নিহত লুৎফুজ্জামানকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
